আমার জন্ম স্বাধীনতার পরে, ১৯৭২ সালে। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়টা ক্রিকেটে কেমন কেটেছে তা খুব দেখিনি, ছোট ছিলাম। আমাদের ক্রিকেট ইতিহাস কিন্তু অনেক পুরনো। আমরা আরও আগে থেকে ক্রিকেট খেলতাম। কিন্তু আমি ক্রিকেটের সঙ্গে বেড়ে উঠে জানতে পেরেছি স্বাধীনতার আগে সেকালের পূর্ব পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা যে যত ভালোই খেলুক না কেন জাতীয় দল বলতে আমরা যা বুঝি সেই পরিচয়টা কারও কখনো হতো না বা আমাদের এদিকের ক্রিকেটাররা সেই সুযোগটা পেতেন না। আমরা সব সময়ই অবহেলিত হতাম। মূল স্রোতে এলে কখনোই পূর্ব পাকিস্তানের ক্রিকেটারদের সুযোগ দেওয়া হতো না, যেমন টেস্ট ক্রিকেট খেলা। ওই সময় তো ক্রিকেট মানেই ছিল টেস্ট। এমন না যে আগে আমাদের এখানে ভালো ক্রিকেটার ছিলেন না, কিন্তু তাদের ভালো খেলে তেমন লাভ হতো না। একজন ক্রিকেটারের স্বপ্ন কী থাকে? জাতীয় দলে খেলা। সেই সুযোগটা আমাদের এখানকার ক্রিকেটাররা পেতেন না তখন।
এ বিষয়গুলো যখন জানলাম, উপলব্ধি করলাম আমি যে জাতীয় দলে খেলেছি, আমি যে টেস্ট ক্রিকেটার, এই ব্যাপারটা বাংলাদেশ যদি না হতো আমার ভাগ্যও আগের ক্রিকেটারদের মতোই হতো। মানে আমার আত্মপরিচয়টা হতো না। আমরা তো জানি যে টেস্টই হলো আসল ক্রিকেট। এই ফরম্যাটে খেলাই একজন ক্রিকেটারের আসল পরিচিতি। স্বাধীনতা না এলে আমি নিজেকে টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে পরিচয় দিতে পারতাম না। হয়তো ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়াও সম্ভব হতো না। খেলার প্রতি আগ্রহটাই থাকত না। ক্রিকেটার না হয়ে অন্য কোনো পেশায় জড়িয়ে পড়তাম আর কি।
নিজের দেশের হয়ে খেলা, নিজ দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা বা দেশের হয় কোনো ম্যাচ জেতা আসলে এই অনুভূতির মতো আর কিছু হতে পারে না। নিজের আলাদা পরিচয় হওয়া... আমি জানি এই জিনিসটা যখন পূর্ব পাকিস্তান ছিল তখন ক্রিকেটারদের মনে আসত না। কারণ তারা তো সুযোগই পেতেন না। এই যে নিজের কিছু হওয়া, এই দেশটা আমার, এই দলটা আমার, এই জয়টা আমার, এই হারটাও আমার এই নিজের হওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়াতেই এসেছে বা হয়েছে। আগে কিন্তু ছিল না। আমরা এখন যেমন অনেক কিছু শুনে-পড়ে জেনেছি স্বাধীনতার আগের ক্রিকেটাররা কতটা ত্যাগ-কষ্ট করেছেন, কতটা অবহেলিত হয়েছেন। আমি সব সময় মন থেকে তাদের শ্রদ্ধা করি। আমাদের এখন যা হয়েছে, সম্মান হয়েছে সবকিছু তাদের ওই ত্যাগের কারণেই হয়েছে।
ক্রিকেটই বলি আর সামগ্রিক ক্রীড়াঙ্গন বলি সবখানে এই জাতীয় পরিচয়টা এসেছে রাজনীতিতে বাঙালির বিজয়ের কারণে। সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতা, যার একটি কথায় পুরো দেশের সবাই জীবন দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। আমরা তো মুক্তিযুদ্ধে একটা পেশাদার-ট্রেইনড আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা তো অস্ত্র ধরতেও জানতেন না। তো তাদের সবার আত্মত্যাগে, বঙ্গবন্ধুর মতো একজন নেতা থাকায় আমদের স্বাধীনতা এসেছে।
চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের পর আমরা সবাই মাঠ প্রদক্ষিণ করছিলাম। ওই সময় দেশের পতাকাটা ছিল আমার হাতে। আসলে বাংলাদেশের হয়ে কোনো ম্যাচ জেতা... এর থেকে ভালো অনুভূতি হতে পারে না। আনন্দের ও তৃপ্তিদায়ক ব্যাপার হলো টেস্ট জিতে পতাকা হাতে পুরো স্টেডিয়াম দৌড়ানো। দেশের প্রতিনিধি হওয়ার এই আনন্দের কাছে বাকি সবকিছু তুচ্ছ। আমরা দল হিসেবে ওই সময় তো সব ম্যাচ জিততে পারতাম না। কিন্তু যখন জিততাম... হয় না মানুষ কোনো একটা কিছুর জন্য বাঁচে। আমরা ক্রিকেটাররা দেশের হয়ে ওই আনন্দের মুহূর্তের জন্যই বাঁচি।
আরেকটা বিষয়, আমরা যখন মাঠে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাই। তখন আমাদের গায়ে কাঁটা দেয় শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যায়। আমরা তো এমনিতেও একটু আবেগপ্রবণ জাতি, তো অনুভূতিটা অনেক বেশি হয়। এই জিনিসটা সম্পূর্ণ অন্যরকম এর সঙ্গে আসলে কোনো কিছুর তুলনা চলে না।
আমার একটা সুযোগ হয়েছিল নেপালে সবশেষ এসএ গেমসে অংশগ্রহণ করার। আমরা ক্রিকেটাররা তো খুব বেশি এ রকম গেমসে অংশ নিতে পারি না। সেখানে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমরা পুরো স্টেডিয়াম বাংলাদেশের পতাকার সঙ্গে মার্চপাস্ট করেছি। এটা ওই জিনিসটাই যে আমার দেশ, আমরা এ দেশের খেলোয়াড়। আমরা পৃথিবীর কত দেশে গিয়েছি, কত সুন্দর জায়গা দেখেছি কিন্তু ৫-৭ দিন পর ঠিকই মনে হয়, নাহ আমার দেশই ভালো। এ দেশটা তো আমার না, এই সৌন্দর্য তো আমার না, সেদিক থেকে আমার দেশটাই ভালো। আমাদের দেশে হয়তো অনেক সমস্যা কিন্তু এটা আমার দেশ। এটা আমার পরিচয়।
আমি আসলে গর্বিত বাংলাদেশি মনে করি নিজেকে, যে দেশেই যাই, যখন কেউ আমাকে প্রশ্ন করে তুমি কোথাকার? আমি খুব গর্ব নিয়েই বলি ‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ’। আমি এই জায়গাটাকে খুব আলাদা মনে করি। একবার তো এক ছেলের ওপর মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কারণ সে বাঙালি অথচ উর্দুতে কথা বলছে। ঘটনাটা পাকিস্তানে, সে বাংলা কথা ভুলে গিয়েছে। আমার এত বিরক্ত লাগল যে তাকে রুম থেকেই বের করে দিই। সে আসলে একজন ফ্যান ছিল, আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। কিন্তু বাঙালি ছেলে বাংলা ভাষাটাই ভুলে যাবে এটা আমার ভালো লাগেনি।
আরেকটা বিষয় হলো, বিদেশের মাঠে বাংলাদেশি সমর্থক বা পতাকা। আমাদের দেশের মানুষ একটু অন্যরকম। আরও তো অনেক দেশ আছে ক্রিকেট খেলে। কিন্তু তাদের মধ্যে কিন্তু বাংলাদেশিদের মতো এত মায়া-আবেগ নেই। আমরা যেকোনো ট্যুরে যেতাম ওখানকার মানুষরা দেখা গেছে সারা দিনের কাজে ফেলে আমাদের খেলা দেখতে বসে আছে, দেখা করতে বসে আছে। আমরা তো আগে এত জিততাম না, একটা বাউন্ডারি মারলেও তারা খুশি, একটা ফিফটিতে তারা খুশি। এমনও লোক আসত, টিম হোটেলে এসে বসে থাকত নিজের কাজ ফেলে সারা দিন আমাদের নিয়ে ঘুরবে বলে। তো এটা একমাত্র সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশ ও ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা থেকেই।
লেখক : ক্রিকেটার, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক
