শর ভাবে, ছুটে চলি, আমি তো স্বাধীন
ধনুকটা একঠাঁই বদ্ধ চিরদিন।
ধনু এসে বলে, শর, জান না সে কথা
আমারি অধীন জেনো তব স্বাধীনতা।
স্বাধীনতা, কণিকা/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
স্বাধীনতা বিষয়ে পরিচিত একটা প্যারাডক্স দিয়ে লেখাটা শুরু করলাম। স্বাধীনতা এমনই দ্বিধাদীর্ণ ব্যাপার। মানুষ কি কখনো স্বাধীন হতে পারে? আদৌ? যে সভ্যতা মানুষ গড়ে তুলেছে, তাতে তার নিজেরই স্বাধীন হওয়ার সম্ভাবনা নাই বললেই চলে। রাবীন্দ্রিক ভাবনায় ‘য়ুরোপে স্বাধীনতাকে যে স্থান দেয়, আমরা মুক্তিকে সেই স্থান দিই। আত্মার স্বাধীনতা ছাড়া অন্য স্বাধীনতার মাহাত্ম্য আমরা মানি না।’
সেই আত্মার স্বাধীনতা কার্যত দেশ-রাষ্ট্র গঠনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তার আকাক্সক্ষা জাগরূক থাকে। অনন্তকাল। মানুষের জীবন বা বেঁচে থাকা সেই আকাক্সক্ষার অসীমতার মধ্যে।
বাঙালি একটি জাতি হিসেবে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। এটি তার রাজনৈতিক মুক্তি। কিন্তু ‘রিপুর বন্ধন’, এবং ‘আত্মার মুক্তি’ ঘটানোর সাধন করতে না পারলে সেই স্বাধীনতার মানবিক কোনো অর্জন আদৌ ঘটে না। এটাই রাবীন্দ্রিক ভাবনার মর্ম। তবু আমরা ভাবতে আনন্দ পাই আমরা স্বাধীন। স্বাধীন আমাদের দেশ। তবু আমরা স্বাধীনতা শব্দটা বারবারই উচ্চারণ করি। আমাদের সামাজিক জীবনে যতটা, তার চেয়ে এই শব্দ বেশি প্রায়োগিক আমাদের রাজনৈতিক জীবনে। মানুষ হিসেবে আমরা তো রাজনৈতিক। যখন থেকে রাষ্ট্র মেনে নিয়েছি, তখন থেকেই বুঝে না বুঝে আমরা রাজনৈতিক।
আর রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্রের জন্য স্বাধীনতা আবশ্যিক একটা শব্দ। আমাদের এই রাষ্ট্রও সেই স্বাধীনতা অর্জন করেছে। তাই আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। একের পর এক পরাশক্তি এসে আমাদের রাষ্ট্রগত স্বাধীনতা লুট করতে চেয়েছে। শোষণ করেছে। শাসন করেছে। আমরাও তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছি, লড়াই করেছি।
দৈশিক বা রাষ্ট্রিক স্বাধীনতার অনুভব আগ্রাসী। ব্যক্তিকে তা গ্রাস করে। ব্যক্তি থেকে সামষ্টিক হয়ে ওঠে। তখনই সমাজের নানান ক্ষেত্রে একটা পরিবর্তন আসে। শিল্পে বাণিজ্যে চিন্তায় চেতনায়। স্বাধীনতার সেই অনুভব আমাদের সমস্ত কিছুকে নিজের মতো করে দেখার শক্তি জোগাল। আমাদের ‘সৃজনশীল’ মানুষেরা নতুন করে ‘দেশজ’ শিল্পের জমিন উদ্ধারের ব্রত নিলেন।
সমস্ত ঔপনিবেশিকতার চর্চার যে জায়গাগুলো নগরে কেন্দ্রে জগদ্দল পাথরের মতো বসে থাকে, নাগরিকতার কৈবল্য নিয়ে, সেসবকে অস্বীকার করে নিজেদের অকৃত্রিম প্রাকৃত (প্রকৃতিঘনিষ্ঠ) জীবনের দিকে ফেরার টান অনুভূত হলো। তারই সূত্র ধরে নাটকে সাহিত্যে সিনেমায় চিত্রকলায় নৃত্যে সংগীতে বাংলাদেশ নতুন রূপে আসতে শুরু করল। নতুন দেশ, স্বাধীন দেশ এই ব্যাপ্ত অনুভব নিজের চেনা জগৎটাকে যেন নানান ইশারায় আন্দোলিত ও নবায়িত করে ফেলল। তাই প্রান্তের বিকেন্দ্রের বিশাল জমিনজুড়ে দাপিয়ে বেড়াল আত্ম-আবিষ্কারের ঘোড়া। তার খুরে খুরে ধূলি উড়ল ধূলি নয় স্বর্ণবিচ্ছুরণ যেন।
স্বাধীন দেশেও বৈষম্য আছে, শাসন-শোষণ আছে, পীড়ন আছে, তবু আছে এক ভৌগোলিক-রাষ্ট্রনৈতিক ঐক্যের বোধ। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছিলেন ‘সম্মিলিত জাতীয় হৃদয়’। সেই ঐক্যবোধ অনেককে অনেকভাবে উদ্বুদ্ধ করেছে নতুন নতুন সৃষ্টিতে। নতুন ভাষায় নতুন আঙ্গিকে নাটক হয়েছে, তরুণরা নিজেদের স্বরে গাহনে গান বেঁধেছে, সাহিত্যে নতুন নতুন প্রকরণ এসেছে, নতুন গল্প-বলার-রীতিতে সিনেমা হয়েছে।
তবু স্বাধীন রাষ্ট্রে কখনোই মানুষ স্বাধীন হতে পারেনি চিন্তায়-ভাবনায়। নানান সময়ে নানান শাসনে রাষ্ট্র তার খড়গ তুলেছে, তবু শিল্পীরা নিজেদের মতো করে নিজের উচ্চারণ চোরাগোপ্তা কণ্ঠস্বরের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করেই চলেছে।
আমাদের থিয়েটারে বা নাটকে প্রাণের প্রাচুর্য এলো। ধর্ম বা নীতি নৈতিকতার বাণী কিংবা আদর্শ কপচানো বিষয়ের আগল ভেঙে নাটকে দেশ-গাঁও সব একাকার হয়ে গেল। মধ্যবিত্তের জীবনের আটপৌরে গড়নগুলোও আর ধোপে টিকল না। একেবারে প্রান্তের জীবনের কষা রুক্ষ ভাঙা-গড়ার গল্পগুলো নিজেদের আঙ্গিকে বলার চেষ্টা শুরু হলো। দেশীয় নাট্য-আঙ্গিক খোঁজার নানান গবেষণা শুরু হয়ে গেল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুধু পারফরমেন্স বা পরিবেশনার তত্ত্ব ও প্রয়োগ নিয়ে বিভাগ খোলা হলো।
সিনেমায় প্রধান হয়ে উঠল সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের সংকটগুলোকে প্রেমের অসিলায় ফুটিয়ে তোলার গল্প। সেন্সরের কোপে অনেক সিনেমা ভোগান্তিতে পড়েছে, তবু আমাদের স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা-ভাঙা-গড়া-প্রেম-যৌনতা অবদমন সবকিছু অবলীলায় সিনেমাতেও এসেছে। এলো নতুন দেশকালে বিন্যস্ত মধ্যবিত্তের টানাপড়েনও।
চিত্রকলায় মানুষের শক্তির প্রকাশ দেখতে পাওয়া গেল। রঙে রেখায় জীবনের উদ্দামতা প্রকাশ পেল। পাশাপাশি বিমূর্ততা। সবকিছু শেষতক নানান অবয়বে নিজেদেরই জীবনের ভূগোলের যাপিত বাস্তবতার কথা বলা নিজেদের শিল্পপরিচয়ের আঁচড়ে আঁচড়ে।
স্বাধীনতা পরবর্তী আমাদের গানে বহুল বিচিত্র প্রকাশ ঘটেছে। লোকজ বা গাঁও-গেরামের গানের ধারাগুলোকে নতুন করে আপনার করে নিল মধ্যবিত্ত এবং শহরের উপভোক্তা শ্রেণি।
স্বাধীন ভূখ-ের রাজনৈতিক অনুভব আমাদের হৃদয়ের বিশালতা দিয়েছে। আর আমাদের দেশের জনসংস্কৃতির একটা ঐক্য আছে। আমরা একে অপরের আত্মীয়। আমাদের জীবনানুভূতির সংবেদনের যে ঐক্য ভৌগোলিক এবং সামাজিক সহাবস্থানের কারণে গড়ে উঠেছে, তার পূর্ণ উন্মোচন এখনো ঘটেনি ঠিক, তবু সেই ঐক্যের ভেতরকার তাগিদই এখনো এই দেশে মানুষের প্রাণের শক্তি।
ভেবেছিলাম শুধু ইতিবাচক বিষয় নিয়েই লিখব। কিন্তু মনের ভেতর উসকে দেওয়া নঞর্থক ব্যাপারগুলো এড়ানো যায় না। ভাষার জাতীয়তাবাদের পরম্পর বিকাশের মধ্য দিয়ে যে নতুন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হলো, সেখানে অপরাপর ভাষার মানুষরা কেমন থাকবে? থাকল? এসব প্রশ্নের স্বস্তিকর উত্তর এলো না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাবলির কোনো সুরাহা হয়নি। সমতলের অপরাপর জাতিসত্তার মানুষরাও অনেকাংশে পায়নি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। এখনো লঘু নৃ নানা নামে তাদের পরিচয়, তাদের সংকটাপন্ন সামাজিক সত্তা। এসব জনগোষ্ঠীর মানুষ বহুদূরের শাসক (শোষক)দের ভয় পেয়েছিল। তারা মুক্তির লড়াইয়ে শামিল হয়েছিল বাঙালির সঙ্গে। কিন্তু নিকটজন যদি পরের মতো আচরণ করে তবে তো তাদের বিপত্তি বটে।
তবু এই রাজনৈতিক বিবমিষার মধ্যেই স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে এইসব জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সাংস্কৃতিক তৎপরতার নানামুখী প্রকাশ পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে নাটকের দল তৈরি হয়েছে, গানের দল তৈরি হয়েছে। নিজেদের মোটিফ নিয়ে চিত্রশিল্পেও এগিয়ে গেছে শিল্পীরা। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও চাকমা মারমা গারো ত্রিপুরা মণিপুরি নানান ভাষায় সাহিত্যচর্চা সবেগে এগিয়ে চলেছে। সেখানে যেমন প্রকৃতিঘনিষ্ঠ জীবনের সরল-সুন্দর প্রকাশ পাওয়া যায়, তেমনি আছে জীবনের বঞ্চনার রূপও। মণিপুরি জনগোষ্ঠী তাদের কৃত্যমূলক সংস্কৃতির ধারায় নানান লীলা-পালার ধ্রুপদী পরিবেশনা জারি রেখেছে।
দীর্ঘকাল ধাপে ধাপে নানান পরাশক্তির সঙ্গে লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধ এই ভূখ-ের মানুষের ভেতর স্বাধীনতার যে চূড়ান্ত আকাক্সক্ষা তৈরি করেছিল, যুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তার আপাত রাজনৈতিক অর্জন এলেও বৃদ্ধিবৃত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক চর্চায় ঔপনিবেশিক প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। তাই স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে আমাদের রাজনীতি, রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, সমাজ অনেক কিছুতেই সেই কাক্সিক্ষত পুনর্গঠন ঘটানো সম্ভব হয়নি।
তবু একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, স্বাধীনতা বাংলাদেশের শিল্পসংস্কৃতির জমিনে অবারিত সোনালি হেমন্ত এনে দিয়েছে। এসব শস্যের ঘ্রাণ ক্রমশ ঘনিয়ে আসা নৈরাশ্যের আঁধারেও নতুন সৃষ্টির আকাক্সক্ষাকে উসকে দেয়।
লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক ও নাট্যকার
