দুই দশক আগে পর্যটন, ক্রিকেট, বন্দর ইত্যাদি ছিল শ্রীলঙ্কার ব্র্যান্ড। সমান্তরালভাবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এলটিটিইর লড়াই ছিল শ্রীলঙ্কার রোজকার ঘটনা। তবে তখনো দেশটি ছিল সমৃদ্ধ। দুই দশক বাদে এখন শ্রীলঙ্কা দেউলিয়া হওয়ার পথে। দেশটিতে খাবারের অনিশ্চয়তার সঙ্গে যোগ হয়েছে নানা সংকট। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
বিপর্যয়কর পরিস্থিতি
বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংকটের কথা শোনা গেলেও ‘কাগজের অভাবে দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বন্ধের মতো’ বিরল ঘটনার কথা আগে শোনা যায়নি। সম্প্রতি এশিয়ার দ্বীপ দেশ শ্রীলঙ্কা এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু কাগজ নয়, শ্রীলঙ্কায় চলছে জ্বালানি তেলসহ শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ভয়াবহ সংকট। তেলের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছে মানুষ। বাড়ছে শিশুখাদ্যের দাম। ঋণে জর্জরিত অর্থনীতি। জ্বালানি তেলের সংকটে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ ঠেকাতে মাঠে নামানো হয়েছে সেনাবাহিনী। কয়েকদিন ধরে বিশ্ব মিডিয়ায় শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে নানা বিশ্লেষণ উঠে আসছে। দেশটিতে এখন শুধু হাহাকার।
মূলত বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট বেসামাল করে তুলেছে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিকে। দেশটি বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত। পরিস্থিতি এমন অবস্থায় ঠেকেছে যে, তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারছে না। ফলে কাগজ, শিশুখাদ্য ও জ্বালানিসহ প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির মতো বৈদেশিক মুদ্রা তাদের কাছে নেই।
বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে পর্যটন খাত ও প্রবাসী আয় ধাক্কা খাওয়ায় দেশটির ইতিহাসে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন দেশের ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না তারা। এরই মধ্যে সংকট কাটাতে শ্রীলঙ্কা চলতি মাসের শুরুর দিকে মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুপি বিনিময়ের ক্ষেত্রে ভাসমান মুদ্রানীতি গ্রহণ করলে পণ্য আমদানির খরচ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়ে যায়। এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি সাধারণ মানুষ। বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় সংকটে আকস্মিক নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের স্বল্পতা দেখা দেয়। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) দ্বারস্থ হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে শ্রীলঙ্কা। ইতিমধ্যে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়ে ভারত কলম্বোর পাশে দাঁড়িয়েছে, চীনও পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে। তবে বেইজিংয়ের সহায়তা এখনো শ্রীলঙ্কা পায়নি।
ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার এক বছর পর ১৯৪৮ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। স্বাধীনতার পর থেকে কখনো এতটা দুরবস্থায় পড়েনি দেশটি। দীর্ঘ ২৬ বছর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ ছিল, তখনো তাদের অর্থনীতি এতটা ভঙ্গুর দশায় পড়েনি। এরই মাঝে ১৫ মার্চ রাজধানী কলম্বোতে হাজার হাজার মানুষ সরকারবিরোধী সমাবেশ করেছে। শুধু রাজপথ নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে সরব সাধারণ মানুষ। দেশটির প্রধান তিনটি ভাষায় সামাজিক মাধ্যমে মানুষ এ পরিণতির জন্য রাজাপাকসে ও তার সরকারকে দায়ী করছে।
শুরু যেভাবে
৩ বছর আগে ২০১৯ সালের এপ্রিলে ইস্টার সানডের দিন বোমা হামলার পর শ্রীলঙ্কায় পর্যটকের সংখ্যা ১৮ শতাংশ কমে যায়। করোনা মহামারী শুরুর আগে শ্রীলঙ্কায় সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসত চীন থেকে। কিন্তু করোনা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ কঠোর থাকায় চীন থেকে পর্যটক আসতে পারেনি। অন্যদেশ থেকেও পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে যায়, ফলে দেশটির পর্যটন খাতে বিপর্যয় দেখা দেয়। প্রায় দুই বছর করোনার থাবা গ্রাস করে রাখে পুরো পর্যটন খাত। করোনা শেষ হতে না হতে ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে দেশটির ওপর। রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত আগত পর্যটকের সংখ্যা ২৫ শতাংশ ছিল। কিন্তু রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, যেমন সুইফট থেকে বাদ পড়ার প্রভাব পড়েছে। যারা ওই অঞ্চল থেকে শ্রীলঙ্কায় গেছেন অনেকেই তাদের কার্ড ডলারে ব্যবহার করতে পারছেন না। যোগ হয়েছে নতুন ঝামেলা।
নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংবলিত সমুদ্র সৈকত, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শ্রীলঙ্কাকে সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। দেশটির পর্যটন খাত হলো বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের তৃতীয় বৃহত্তম উৎস। শ্রীলঙ্কার এমন বেহাল দশার জন্য শুধু করোনা আর মানুষের বেড়াতে আসা বন্ধ থাকাই একমাত্র কারণ নয়। করোনায় শ্রীলঙ্কার আশপাশের সব দেশকেই অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, কিন্তু কেউ তাদের মতো বেসামাল হয়নি। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক নৈরাজ্যের উৎসে রয়েছে পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি। ফলে প্রশাসনিক জবাবদিহিহীনতা ও আর্থিক অনিয়ম চলে আসছে অনেক আগে থেকেই, লম্বা সময় এভাবে চলার প্রভাব পড়েছে এখনকার অর্থনীতিতে। মূলত শাসক পরিবারের মনের খেয়ালে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্তের দায় শোধ করতে হচ্ছে শ্রীলঙ্কাবাসীকে।
দেশটির শাসনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসা ২০ জনের বেশি এক পরিবারের সদস্য। মন্ত্রিসভায় আছেন ‘রাজাপাকসে’ পরিবারের পাঁচজন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, সেচমন্ত্রী ও যুবমন্ত্রী। প্রথম চারজন ভাই। তাদের মধ্যে সেজ ভাই, দেশটির প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসের সাংবিধানিক ক্ষমতা রাজতন্ত্রের রাজার মতো। এ পরিবারের ৯ সদস্য আছেন ২২৫ আসনের পার্লামেন্টে। গণতান্ত্রিক যুগে এমন একপেশে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির উদাহরণ খুব একটা দেখা যায় না। অতীতে শ্রীলঙ্কা রাজত্ব করেছেন ‘সেনানায়েক’, ‘বন্দরনায়েক’রা। এখন চলছে রাজাপাকসেদের যুগ। সেই রাজাপাকসে পরিবারের ২০-২৫ জন্য সদস্যের হাতে শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় বাজেটের ৭৫ ভাগ খরচ হয়েছে গত কয়েক বছর। সুতরাং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের রাজনৈতিক দায় এ বংশের ওপর বর্তায় অনেকখানি, এটা সহজ হিসাব।
তারা আয়-ব্যয়ের প্রয়োজনীয় হিসাব ছাড়াই বিশাল বিশাল বন্দর, রাস্তা, ভবন বানিয়ে জনগণকে মোহাচ্ছন্ন রাখার কৌশল গ্রহণ করেছিল। বিবেচনাহীন এমন উন্নয়ননীতির শিকার শ্রীলঙ্কা। যে নীতি অনুসরণ করছে দক্ষিণ এশিয়ার আরও অনেক দেশ। সেটা অবশ্য ভিন্ন প্রসঙ্গ।
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প ও ঋণ
গত ১৫ বছরে শ্রীলঙ্কা বেশ কিছু মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, রাস্তা এবং আরও নানা ধরনের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর কাজ শেষ হতে সময় লাগবে ২৫ বছর এবং বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে শ্রীলঙ্কা ঋণ নিয়েছে। বিপুল অর্থ খরচ করা হলেও অনেক প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়নি। কিছু প্রকল্প শ্রীলঙ্কার জন্য ‘গলার কাঁটা’য় পরিণত হয়েছে। এর অন্যতম হলো- হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর ও বিমানবন্দর।
অন্যদিকে গত ১৫ বছর ধরে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন উৎস থেকে দেদার ঋণ নিয়েছে শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন সরকার। কিন্তু এই অর্থ কীভাবে পরিশোধ করা হবে সে ব্যাপারে খুব একটা চিন্তাভাবনা করেনি। এখন সব চেপেছে একসঙ্গে।
কর কমানো
২০১৯ সালের নভেম্বর মাসে ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে দেশটিতে ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ ধরনের পদক্ষেপে অনেক বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। ভ্যাট প্রদানের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে আট শতাংশে আনা হয়। ভ্যাট-ট্যাক্স কমানোর মূল কারণ ছিল অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা। দুই হাজার নয় সালে শ্রীলঙ্কায় গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে (বর্তমান প্রেসিডেন্টের ভাই) একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর ফলে তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতিতে গতি এসেছিল। সে আলোকেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসেও একই পদক্ষেপ নেন। কিন্তু এর কয়েকমাসের মধ্যেই বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী শুরু হয়। অন্যদিকে আয়কর এবং ভ্যাট কমানোর ফলে সরকারের রাজস্ব আয় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। আবার করোনা মহামারীর কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে সরকারকে ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতাও মেনে চলতে হয়। সবমিলিয়ে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয় অর্থনীতির ওপর।
অর্গানিক চাষে বিপর্যয়
২০১৯ সালে ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া দেশে অর্গানিক কৃষি চালু করেন। সেজন্য কৃষিক্ষেত্রে রাসায়নিক সার এবং কীটনাশক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এর অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কায় সার আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে কৃষিক্ষেত্রে। এতে চালের উৎপাদন ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। একসময় চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ শ্রীলঙ্কা বাধ্য হয় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের চাল আমদানি করতে। চালের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। অর্গানিক কৃষির নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশটির চা উৎপাদনের ক্ষেত্রেও। চা রপ্তানি করে শ্রীলঙ্কা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। সেখানেও বড় ধাক্কা লাগে।
কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে আনার জন্য সরকার ২০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেয়। দেশজুড়ে একই সঙ্গে খাদ্যঘাটতিও প্রকট আকার ধারণ করে। মূলত অর্গানিক কৃষি চালু করার আগে বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা করা হয়নি। এতে উল্টো ফল হয়, উৎপাদন কমে যাওয়ায় গ্রামের কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং খাদ্য আমদানির জন্য আরও বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়।
সংকট সামাল দেওয়ার চেষ্টা
বর্তমান সংকট সামাল দিতে শ্রীলঙ্কার প্রয়োজন বৈদেশিক মুদ্রা। সেজন্য অনেকের দ্বারস্থ হচ্ছে দেশটি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ-এর সঙ্গে আলোচনা করছে কলম্বো। আইএমএফ-এর কাছ থেকে ঋণ পেতে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে দেশটি। বর্তমানে মার্কিন এক ডলারের বিপরীতে শ্রীলঙ্কার ২৩০ রুপি।
তবে যেভাবে শ্রীলঙ্কার ওপর ঋণের স্তূপ হয়েছে, সেখান থেকে সহসা দেশটি বেরিয়ে আসতে পারবে বলে মনে হয় না। এজন্য দরকার মধ্যম এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ। সেই সঙ্গে দেশটির রপ্তানি বাড়ানো। রপ্তানি বাড়াতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য আনা দরকার। এজন্য প্রয়োজন বৈদেশিক বিনিয়োগ। কারণ শ্রীলঙ্কার ব্যবসা ছোট এবং তাদের পক্ষে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। এছাড়া মধ্যমেয়াদে দেশটির রাজস্ব ও বাজেট ব্যবস্থাপনা ভালো করার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমাতে হবে।
ক্ষোভ বাড়ছে
দিন দিন সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভ বাড়ছে। চলমান পরিস্থিতিতে টিকতে না পেরে অনেক শ্রীলঙ্কান অন্য দেশে কাজে যেতে চাইছেন। নতুন পাসপোর্ট পেতে দেশটির অভিবাসন বিভাগের সামনে মানুষের ভিড় বাড়ছে। কেউ যাচ্ছেন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি পরিবার ভারতে পাড়ি জমিয়েছে। অনেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যেতে চাইছেন গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে হলেও। মানুষ সবই করতে চাইছে সবই পেটের দায়ে, জীবনের তাগিদে।
শ্রীলঙ্কার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে একটি স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম (এলটিটিই) প্রায় ২৬ বছর সশস্ত্র লড়াই করে। এলটিটিই নেতা প্রভাকরণের মৃত্যুর মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ হয়। এই যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব রাজাপাকসের। এলটিটি দমনে রাজাপাকসের নির্মমতার কথা সর্বজনবিদিত। গৃহযুদ্বের পর তিনি আরও ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। কিন্তু সেভাবে যোগ্য বিরোধী দল হয়ে উঠতে পারেনি কোনো দল। এ কারণে চলমান অর্থনৈতিক বিপর্যয় চরম ও চূড়ান্ত অবস্থায় না পৌঁছলে মানুষ সেভাবে রাস্তায় নামবে না। কিছু কিছু বিক্ষোভ ইতিমধ্যে হয়েছে, সেটার পরিমাণ বাড়তে পারে। তবে এর ভেতর দিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের সম্ভাবনা কম। কারণ, দেশটিতে রাজনীতির ধারা খুব দুর্বল। তা ছাড়া পরিবর্তন চিন্তা ও প্রচারমাধ্যমের স্বাধীনতা দমিয়ে রাখতে প্রয়োগ করা হয় কঠোর আইন। জনগণকে ভয় দেখানোর জন্য রাজাপাকসের জন্য কঠোর হওয়া নতুন কিছু নয়। তার পরও সংকটগ্রস্ত মানুষ প্রতিবাদ করছে, বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা। যা কোনো দেশের জন্য কল্যাণজনক নয়।
রাজাপাকসের ভুল নীতি
রাজাপাকসের ভূরাজনৈতিক সুবিধা হলো চীন-ভারত উভয়ে শ্রীলঙ্কার পাশে দাঁড়াতে আগ্রহী। এই আগ্রহের ‘অনৈতিক’ সুবিধা গ্রহণ করেছেন রাজাপাকসে। এই দুই দেশের বৈরিতা সর্বজনবিদিত হলেও কলম্বো সমান্তরালভাবে দুই দেশের কাছ থেকেই ঋণ ও সহায়তা নিয়েছে। উভয় দেশ বিনিময়ে কলম্বোর কাছ থেকে প্রকাশ্যে না হলেও গোপনে নানান সুবিধা এবং প্রশ্নহীন আনুগত্য আশা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চীনের দেওয়া ঋণের পরিমাণ ও সুদ হয়ে উঠেছে কলম্বোর জন্য গলার ফাঁস। এই ‘গেরো’ খোলার মতো একক সামর্থ্য ভারতের নেই। ভারত বড়জোর তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তায় হাত বাড়াতে পারে, যা ইতিমধ্যে বাড়িয়েছে। তাতে শ্রীলঙ্কার সংকট কাটছে না, আবার চীন সেভাবে হ্যাঁ-না কোনোটাই বলছে না। কলম্বো চীনকে এড়াতেও পারছে না। এমতাবস্থায় রাজাপাকসের জন্য একটা বিকল্প হতে পারত যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ।
কিন্তু শ্রীলঙ্কার শাসকদের মদদ দিতে পশ্চিমের আগ্রহ কম। একে তো চীনের উপস্থিতিতে পশ্চিমারা সেখানে পা রাখতে অনাগ্রহী। অন্যদিকে তাদের প্রত্যাশা, কলম্বোয় তামিল নীতির পরিবর্তন। জাফনাসহ উত্তরাঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া এবং তামিলবিরোধী যুদ্ধে যেসব গণহত্যা হয়েছে, তার বিচার করা। রাজাপাকসেদের ঘনিষ্ঠ অনেক সামরিক কর্মকর্তা তামিল নিধনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন। এছাড়া ওয়াশিংটনের চাপে ভারত-চীনকে এড়িয়ে রাজাপাকসেরা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন বলে মনে হয় না। সুতরাং সহসাই শ্রীলঙ্কা বিপর্যয়ের চক্র থেকে বেরুতে পারবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।
