‘গরিবের ডাক্তারখ্যাত’ আহমেদ মাহী বুলবুলের (৩৯) বাসা থেকে বের হয়ে বাসে ওঠার গন্তব্য ও তার রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকার স্থানের দূরত্ব প্রায় দেড় কিলোমিটার। এই পথের হিসাব মিলছে না। এ পথে থাকা ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার ফুটেজও সংগ্রহ করতে পারেনি পুলিশ। যেখানে বুলবুলকে পাওয়া গেছে সেখানে তার যাওয়ার কথা ছিল না এমন দাবি তার স্ত্রীর।
চার আসামিকে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ এ হত্যাকান্ড স্রেফ ছিনতাইয়ের ঘটনা দাবি করলেও বুলবুলের পরিবার তা মানতে নারাজ। তাদের বলছেন, দন্ত চিকিৎসক বুলবুল ঠিকাদারি কাজের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ঘটনার দিন ১২ কোটি টাকার একটি কাজের ব্যাপারে যাচ্ছিলেন। তাই এ হত্যাকা-ে অন্য কারও হাত থাকতে পারে। আরও ভালো করে তদন্ত করা উচিত। তারা আরও বলছেন, কোনোভাবেই যেন এ ঘটনা ধামাচাপা না পড়ে যায়। দোষীদের প্রত্যেকের বিচার চান তারা।
গত ২৭ মার্চ ভোরে রাজধানীর মিরপুরের কাজীপাড়ায় চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডটি তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। গত ৩০ মার্চ সকালে গ্রেপ্তার চার আসামি রায়হান, রাসেল, হৃদয় ও সোলাইমান চার দিনের রিমান্ডে রয়েছে। গতকাল রিমান্ডের দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ছাড়া হত্যার পেছনে অন্য কোনো ক্লু পায়নি ডিবি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছুরিকাঘাতকারী রিপন গতকাল পর্যন্তও গ্রেপ্তার হয়নি।
বুলবুল হত্যার ঘটনায় চার ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তারের পর গত ৩০ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর ডিবি দাবি করে, ঘটনার দিন ভোর আনুমানিক সোয়া ৫টায় ডা. বুলবুল রাজধানী মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার আনন্দবাজার এলাকার বাসা থেকে নোয়াখালী যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হন। শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডের দিকে রিকশায় যাওয়ার সময় ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টায় পশ্চিম কাজীপাড়ার বেগম রোকেয়া সরণির নাভানা ফার্নিচার শোরুমের সামনে পৌঁছলে কিছু দুষ্কৃতকারী রিকশার গতিরোধ করে। তারা বুলবুলের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। বাধা দিলে দুষ্কৃতকারীরা তাকে ছুরি মেরে মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় বুলবুলকে প্রথমে স্থানীয় আল হেলাল ও পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
তবে বুলবুলের স্ত্রী শাম্মী আক্তার এবং বুলবুলের ঠিকাদারি কাজের সহযোগী রংমিস্ত্রি সোহরাবের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন ভোরে মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার বাসা থেকে বের হয়ে বুলবুলের প্রথমে যাওয়ার কথা ছিল ফার্মগেটে। সেখান থেকে সোহরাবকে সঙ্গে নিয়ে নোয়াখালীর উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী পশ্চিম শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে ফার্মগেটে বাসে অথবা অন্য কোনো যানবাহনে উঠে যাওয়ার কথা বুলবুলের। কিন্তু তার রক্তাক্ত দেহ পাওয়া গেছে উল্টো দিকে দেড় কিলোমিটার দূরে পশ্চিম কাজীপাড়া বাসস্ট্যান্ডে।
দেশ রূপান্তরের সরেজমিনে দেখা গেছে, মিরপুরের পশ্চিম শেওড়াপাড়ার আনন্দ বাজার এলাকায় ১১৮/এফ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে থাকতেন বুলবুল। বাসা থেকে বের হয়ে এক কিলোমটিরের মধ্যে মেট্রোরেলে প্রকল্পের ৩০৫ নম্বর পিলার লাগোয়া পশ্চিম শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ড (বেগম রোকেয়া সরণি সড়ক)। সেখান থেকে ফার্মগেট যেদিকে তার ঠিক উল্টো দিকে পশ্চিম কাজীপাড়ার বাসস্ট্যান্ডের ২৭৮ নম্বর পিলারের পাশে পড়ে ছিল বুলবুলের রক্তাক্ত দেহ।
বুলবুলের স্ত্রী শাম্মী আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশ ছিনতাই দাবি করলেও তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাচ্ছি না। আমার কথা হচ্ছে পাঁচজন মিলে একটি লোককে ধরলে তারা চাকুটা ঠেকিয়ে বলতে পারত যা আছে দিয়ে দেন। তাহলে তার কাছে যা ছিল সব দিয়ে দিত। তার কাছে তো লাখ লাখ টাকা বা দামি গাড়ি ছিল না যে, সেটার জন্য মেরে ফেলবে। তা ছাড়া পাঁচজন মিলে একজনকে ধরলে সে আবার ধস্তাধস্তি কীভাবে করে। সে বুঝবে না পাঁচজন লোকের কাছ থেকে কীভাবে বের হয়ে আসবে। সে তো এমনিতেই আত্মসমর্পণ করে দেবে। পাঁচজন লোক মিলে কি তার পকেট থেকে টাকা ও ফোন নিতে পারল না। তারা চাকু মারার সময় পেল, কিন্তু ওগুলো নিতে পারল না আমার কাছে এ প্রশ্ন থেকেই যায়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার কাছে আরেকটা বিষয় ক্লিয়ার (পরিষ্কার) না। সেটা হচ্ছে সে যেহেতু ফার্মগেট যাচ্ছিল। আসলে ওরা তাকে ঠিক কোন জায়গাতে ধরছিল। যেখানে ওকে পাওয়া গেছে সেখানে তো যাওয়ার কথা না। ফার্মগেট গেলে তো সামনের দিকে যাবে। কিন্তু উল্টো দিকে কেন গেল। এ ছাড়া আরেকটি প্রশ্ন হচ্ছে, বুলবুলকে উদ্ধারকারী বিহঙ্গ বাসের চালক কী দেখেছে ওই স্থানেই তার ওপর হামলা হয়েছে। নাকি সেখানে ফেলে গেছে।’
গতকাল ডিবির মিরপুর জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মামলাটি ডিবিতে এসেছে। আমরা গ্রেপ্তার চারজনকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছি। নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ছুরিকাঘাতকারী পলাতক রিপনকে খোঁজা হচ্ছে। দ্রুতই তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।’ বুলবুলের বাসা থেকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সিসি টিভি ফুটেজ পাওয়া গিয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
