পদ বাণিজ্যে পকেট কমিটি

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০২২, ০২:৫০ এএম

দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে গত মার্চ মাস থেকে জোরেশোরে মাঠে নেমেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। চলছে জেলা-উপজেলা সম্মেলন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি জেলা ও উপজেলা সম্মেলন শেষ করেছে দলটি। তবে ক্ষোভ-বিক্ষোভ প্রশমনের যে উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে তা আদতে হচ্ছে না। বরং অভিযোগ উঠেছে ‘পকেট কমিটি’ ও ‘পদ বাণিজ্যের’। ফলে সংগঠন শক্তিশালী নয়, দুর্বলই থেকে যাচ্ছে বলে দাবি করছেন বিভিন্ন এলাকার তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

তারা অভিযোগ করছেন, কমিটি বাণিজ্য করার মধ্য দিয়ে অনুপ্রবেশ ও হাইব্রিড হিসেবে পরিচিতদের দলে পাকাপোক্ত করার পথ সুগম করা হচ্ছে।

নওগাঁ জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতার ছেলে মাহবুব সেতু ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘সাজ সাজ রবে অনেক জেলা-উপজেলায় কাউন্সিল হচ্ছে। প্রথম অধিবেশনের পর মন্ত্রী-এমপির বাসায় বসে কমিটি সাইন হয়। এরপর সম্মেলনস্থলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে যখন কমিটি ঘোষণা হচ্ছে তখন কোনো কোনো নেতা ধাওয়াও খাচ্ছেন।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘এই কাউন্সিল করে লাভ কী? পকেট থেকে বের করে কমিটি ঘোষণা ও পদ বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে নেতা বানিয়ে আওয়ামী লীগেরই ক্ষতি করছেন নেতারা।’ তার ভাষ্য, ‘ত্যাগীরাও একসময় বেঁকে বসবেন।’

সেতু দেশ রূপান্তরকে ফোনে বলেন, ‘আমি ক্ষোভ থেকে এই ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছি। আমার বাবা ৪০ বছর রাজনীতি করেন। কিন্তু ত্যাগের মূল্যায়ন কই পান।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পদ বাণিজ্যের অভিযোগ পুরোপুরি সত্যি নয়। দুই-একটি অভিযোগ সত্যি হতে পারে। পকেট কমিটির ব্যাপারটিও একেবারে ঠিক নয়। দুয়েক জায়গায় হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘আমি সর্বশেষ ২৪ মার্চ কক্সবাজার পৌর আওয়ামী লীগের সম্মেলন করি। সেখানে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন সর্বসম্মতভাবে।’

তৃণমূল নেতাদের অভিযোগ, কেন্দ্র থেকে নেতা আসছেন। কিন্তু ওইসব নেতা স্থানীয় প্রভাবশালী সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রীর বাসায় গিয়ে আলোচনা করে পকেটে করে একটি কাগজ নিয়ে আসেন। সম্মেলনস্থলে এসে পকেট থেকে ওই কাগজ বের করে নাম ঘোষণা করে চলে যান। এভাবে দলকে শক্তিশালী করা হয় নাকি আরও দুর্বল করা হয় প্রশ্ন করেন তারা।

তৃণমূলের নেতাকর্মীরা শুধু অভিযোগ করেই ক্ষান্ত হচ্ছেন না তারা রীতিমতো ক্ষোভ-বিক্ষোভ জানাচ্ছেন। নেতাকর্মীদের বাধার মুখে পড়ে বেশ কয়েকটি উপজেলায় সম্মেলন স্থগিত করার ঘটনাও ঘটেছে।

গাইবান্ধা জেলার সাঘাটা ও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সম্মেলনের তারিখ তিন দফা ঘোষণা করেও সম্মেলন সম্পন্ন করতে পারেননি নেতারা।

জানতে চাইলে সাঘাটা উপজেলার সাধারণ সম্পাদক শামছুল আরেফিন টিটু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের জেলায় ফুলছড়ি, সাদুল্লাপুর, পলাশবাড়ী ও গাইবান্ধা সদর উপজেলার সম্মেলন হয়েছে গত মার্চ মাসে। সেসব উপজেলায় তৃণমূলের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। অভিযোগ আছে যে, ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় নেতারা এখানে এসে প্রভাবশালী নেতার বাসায় বা কার্যালয়ে বসে কাগজে লিখে পকেটে ভরে নাম নিয়ে এসে সম্মেলনস্থলে ঘোষণা করেন। এর নাম কি সম্মেলন?’

এ ধরনের চর্চা বন্ধ না হলে সাঘাটা উপজেলায় সম্মেলন করা যাবে না মন্তব্য করে শামছুল আরেফিন বলেন, ‘ফুলছড়ি উপজেলায় নতুন সাধারণ সম্পাদক বানানো হয়েছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যকে। এটা নিয়ে সমালোচনা ও অসন্তুষ্টি রয়েছে ওই উপজেলার তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে।’

অন্য আরও একাধিক উপজেলায় নেতাকর্মীরা শুধু অভিযোগ জানানো বা ক্ষোভ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, তারা সংঘর্ষ ও হট্টগোলে জড়িয়েছেন। গত ২১ মার্চ রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় আওয়ামী লীগের সম্মেলনে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন পাঁচজন। গত ২২ মার্চ টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। একইদিন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলা আওয়ামী লীগের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনে কাউন্সিলরদের মতামত ছাড়াই নতুন কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠে।

পাঁচবিবি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক উপ-দপ্তর সম্পাদক মোজাম্মেল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা গোপন ভোটের মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করার অপেক্ষায় ছিলাম। আমাদের মতামত ছাড়াই দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন সভাপতি পদে আবু বক্কর সিদ্দিক ও সাধারণ সম্পাদক পদে জিহাদ ম-লের নাম ঘোষণা করেছেন। এ কারণে যোগ্য ব্যক্তি সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়নি। টাকার বিনিময়ে কমিটি হয়েছে। আমরা এ কমিটি মানি না।’ পাঁচবিবিতে উপজেলা আওয়ামী লীগ ধ্বংসের চক্রান্ত চলছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

পাঁচবিবি উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে প্রধান অতিথি এসএম কামাল হোসেন সভাপতি পদে আবু বক্কর সিদ্দিক মন্ডল ও সাধারণ সম্পাদক পদে কুসুম্বা ইউনিয়নের নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান জিহাদ মন্ডলের নাম ঘোষণা করেন। তখন সম্মেলনস্থলে থাকা সভাপতি পদপ্রত্যাশী পৌর মেয়র হাবিবুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদকের পদপ্রত্যাশী আবু সাঈদ আল মাহবুব চন্দনের কর্মী-সমর্থকরা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নাম বাতিলের দাবি জানান। এসএম কামাল হোসেনকে মঞ্চ থেকে নিচে নামতে বাধা দেন। উত্তেজিত নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলেই স্লোগান দিতে থাকেন ‘টাকার বিনিময়ে কমিটি মানি না, মানব না’।

গত ৪ মার্চ ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। ওই সম্মেলনে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন ওই এলাকার সংসদ সদস্য মোসলেম উদ্দিনের মেয়ে সেলিমা বেগম। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে পকেট কমিটি করা হয়েছে বলে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা মূল্যায়ন পাননি।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি বড় রাজনৈতিক দল। এখানে সব পর্যায়ের নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সুতরাং দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া কোথাও সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য কমিটি করা সম্ভব নয়।’ তিনি বলেন, ‘যারা নেতা নির্বাচিত হতে পারবেন না, সংগত কারণেই তিনি বা তার সমর্থকরা নেতিবাচক প্রশ্নের জন্ম দেবেন।’

স্বপন বলেন, ‘অভিযোগ উত্থাপিত হলেই সব যেমন সত্য নয়, আবার কাজ করতে গিয়ে কিছু ভুলভ্রান্তি হবে না সেটিও সত্য নয়। সব মিলিয়ে বড় দল সবাইকে কোনো না কোনোভাবে নিয়েই এগিয়ে যায়।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, ‘এসব অভিযোগের আংশিক সত্যতা রয়েছে, পুরো নয়।’ তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে পদ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নেতাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত