র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার চাইবে ঢাকা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০২২, ০৫:২২ এএম

বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ সোমবার ওয়াশিংটনে দুই দেশের মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে। দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ‘সোফাসেট ফরম্যাটে’ বৈঠকটি হবে। এ বৈঠকে দুই দেশের মধ্যকার বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা হবে বলে দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রের দাবি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে অস্ত্র কেনাকাটাবিষয়ক চুক্তি অ্যাকুজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট (আকসা) ও অস্ত্রবিষয়ক গোপন তথ্য বিনিময় ও সুরক্ষা চুক্তি জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিসোমিয়া) স্বাক্ষরে আগ্রহী যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে বাংলাদেশকে ‘জিসোমিয়া’ চুক্তির খসড়া হস্তান্তর করেছে তারা। আর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।

গত শনিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্থনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে ওয়াশিংটনের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। আজ ওয়াশিংটন সময় দুপুর ১টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা) দুই মন্ত্রীর মধ্যে ‘সোফাসেট ফরম্যাটে’ বৈঠকটি হবে। আনুষ্ঠানিকভাবে দুই পাশে প্রতিনিধিদলের বৈঠক থেকে ‘সোফাসেট ফরম্যাট’ কিছুটা ভিন্ন। এখানে দুই পক্ষ পাশাপাশি বসে অন্তরঙ্গভাবে আলোচনা করে। এর দুদিন পর আগামী বুধবার ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নিরাপত্তা সংলাপ হবে। এরপর ১৪ মে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইতে হবে উভয় দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সংলাপ। এর আগে ১১ মে ঢাকায় হবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যবিষয়ক সংলাপ।

পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এ সফরের ইতিবাচক দিক তুলে ধরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী বছরগুলোতে সম্পর্ক কোথায় নিয়ে যেতে চাই, তা নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকে আলোচনা হবে। এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কের রূপরেখা প্রণয়নে সাহায্য করবে।’

বর্তমান সমস্যা নিয়ে কিছু আলোচনা হতেই পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে এটিতে মূলত ভবিষ্যৎ নিয়েই আলোচনা হবে। প্রতিরক্ষাবিষয়ক দুটি চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এর আগেই পরিষ্কার করা হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চুক্তির বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলেও উভয় দেশই ইতিবাচক।’ এ নিয়ে সরকারে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ও পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ২০০২ সালে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আকসা চুক্তি সই করে যুক্তরাষ্ট্র। একই বছর ভারতের সঙ্গে অস্ত্রবিষয়ক গোপন তথ্য বিনিময় ও সুরক্ষা চুক্তি জিসোমিয়া চুক্তি সই করে দেশটি। এবার দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে এই দুটি চুক্তিই সই করতে আগ্রহ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। জিসোমিয়া চুক্তির খসড়া চলতি বছরের ২০ মার্চ বাংলাদেশকে হস্তান্তর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব (সিনিয়র সচিব) মাসুদ বিন মোমেনের কাছে খসড়াটি হস্তান্তর করেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড। একই দিন নুল্যান্ড ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধ প্রসঙ্গ টেনে বৈশ্বিক নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পথচলার বিষয়টিও তুলে ধরেন।

তারা আরও জানিয়েছেন, উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও সংলাপে দুটিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা; র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান ৭ কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার; বিনিয়োগ, জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা ইস্যু, বঙ্গবন্ধুর খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরতসহ সব বিষয়ই আলোচনায় স্থান পাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আকসা ও জিসোমিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বেশ কয়েক বছর ধরেই আমাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এটা হুট করে আসেনি। ঢাকা-ওয়াশিংটন পরবর্তী বৈঠকগুলোতেও দেশটি এ বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইতে পারে বা আলোচনা হবে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের চুক্তি সইয়ের মতো বিষয়গুলো যেমন স্পর্শকাতর, তেমনি গুরুত্বপূর্ণও বটে। খুব দ্রুতই যে চূড়ান্ত কিছু হতে যাচ্ছে বিষয়টি এমনও নয়। নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংলাপে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হবে। তবে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত সংলাপে হবে, সেটি বলা যায় না। এজন্য আরও সময়ের প্রয়োজন হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০০৯ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিস ওয়েলসের ঢাকা সফরে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। সে সময়ে তিনি বলেন, এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকার সঙ্গে আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তি করতে চায় ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্র চায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক। দুই দেশের মধ্যে খুব আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ সামরিক যোগাযোগ রয়েছে। চুক্তিগুলো হলে যোগাযোগ আরও বাড়বে। দুর্যোগসহ একাধিক প্রাকৃতিক সংকট মোকাবিলায় দুই দেশের সামরিক বাহিনী যাথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারবে। দুই দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ফলে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফর করেন যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় নিরাপত্তাবিষয়ক তৎকালীন সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী র‌্যান্ডল শ্রাইভার। আকসা ও জিসোমিয়া চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে সে সময় তিনি বলেন, চুক্তিগুলো দু’পক্ষের কাজে লাগবে। যুক্তরাষ্ট্র যথাযথ প্রক্রিয়ায় এবং সঠিক উপায়ে চুক্তি করতে আগ্রহী। যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও নিবিড় করতে চায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত