হাওরে বাড়ছে পানি, ফসল রক্ষার দাবি সংসদে

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২২, ০৬:৫৫ এএম

দেশের ৫২টি হাওরে ২২ লাখ ২২ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। আর কয়েক দিন পরেই সোনালি ধানে গোলা ভরার স্বপ্ন ওই এলাকার কৃষকদের চোখে। তবে সীমান্তের ওপার থেকে ঢল আর বৃষ্টিতে ফসল রক্ষা বাঁধ পড়েছে ঝুঁকিতে। গোলা ভরার স্বপ্নভঙ্গের শঙ্কায় বিভিন্ন জেলার ১২টি উপজেলার লাখো কৃষকের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।

এদিকে হাওয়ের বাঁধ রক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদেও। গতকাল সোমবার জাতীয় পার্টির সাংসদ পীর ফজলুর রহমান পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়কে সব কাজ বাদ দিয়ে এ বিষয়টির দিকে নজর দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র ও স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, গত শনিবার সকাল থেকেই দেশে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদনদী ও হাওরে পানি বাড়তে শুরু করে। মেঘালয় থেকে আসা ঢলে টাঙ্গুয়ার হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় নিম্নাঞ্চল। ওই হাওরের আরও কয়েকটি বাঁধে ফাটল ধরার খবর পাওয়া গেছে। এসব বাঁধ শক্ত করতে স্থানীয়ভাবে কৃষকরা কাজ করছেন। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জের অনেক এলাকার ফসলি জমিই চলে গেছে পানির নিচে। ওইসব এলাকার অনেক কৃষক আধা-পাকা ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন।

হাওর ছাড়াও গত যমুনা নদীতেও হঠাৎ করে পানি বেড়েছে। টাঙ্গাইল ও সিরাজগঞ্জের চরাঞ্চলে পানির নিচে চলে গেছ শত শত এক জমির ধান। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নদীর তীরবর্তী এলাকার বাদাম, তিল ও কাউনের ক্ষেত।

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গেল কয়েক দিনের পাহাড়ি ঢলে ক্রমেই সুনামগঞ্জে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে হাওর ও নদীর পানি। বৃষ্টির আর ঢলের পানিতে হাওরে বাঁধ উপচে পানি ঢুকছে ফসলি জমিতে। এতে নষ্ট হচ্ছে কৃষকের কাঁচা ধান। সোমবার পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ভারতে চেরাপুঞ্জিতে ৭০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে আর সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহুরুল ইসলাম জানান, মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে এছাড়া হাওরেও বৃষ্টি হচ্ছে ফলে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। তাই বাঁধ যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জেলার ইটনাসহ আরও কয়েকটি হাওরে এক দিনে পাহাড়ি ঢলে নতুন করে আরও ২০০ একর ধানি জমি পানির নিচে চলে গেছে। এতে অন্যান্য হাওরের কৃষকরা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। কীভাবে রক্ষা করবেন তাদের বছরের একমাত্র খোরাক সোনালি ফসল তার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না এলাকার কৃষক। এখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তাদের।

গতকাল বিকেলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিশোরগঞ্জের ইটনাসহ আশপাশের আরও বেশ কয়েকটি হাওরে কৃষকরা বাধ্য হয়েই কাঁচা ধান কেটে নিচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মতিউর রহমান এ বিষয়ে বলেন, প্রকল্প এলাকার বাইরে, নদী ও খালের মধ্যে এ পানি ঢুকেছে। মূল হাওরে এখনো পানি ঢোকেনি। আমাদের ফসল রক্ষার বাঁধগুলোর এখনো তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি।

এদিকে পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার খালিয়াজুরী উপজেলার ধনু নদীর পানি বৃদ্ধির পেয়েছে। এতে উপজেলার কীর্তনখোলার হাওর রক্ষা বেড়িবাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাছাড়া পানি বৃদ্ধি ও বাঁধে প্রবল বাতাসের ঢেউয়ের কারণে এ বাঁধটি যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অত্র এলাকার কৃষকরা। কীর্তনখোলা বাঁধে চাকুয়া, রানীচাপুর, বল্লী ও খালিয়াজুরী সাধারণ জনগণ বাঁধ রক্ষায় সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

খালিয়াজুরী কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, খালিয়াজুরী হাওরে প্রায় ২১ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। পাহাড়ি ঢলের কারণে বেড়িবাঁধের বাইরে প্রায় ১১৩ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে।

এ বিষয়ে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এমএল সৈকত জানান, বাঁধ রক্ষা করার জন্য সব ধরনের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বাঁধ রক্ষায় বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সব পিআইসি, কৃষকসহ সবাইকে নিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হঠাৎ করে যমুনার পানি বাড়ায় শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকার নদীর তীরবর্তী নিচু জমির বোরো ধান ডুবে গেছে। উপজেলার কৈজুরি, সোনাতনী, গালা ও জালালপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলের নিচু জমির কাঁচা ও আধাপাকা ধান সবচেয়ে বেশি ডুবেছে। অনেকে পানিতে ডুব দিয়ে কাঁচা ধান কেটে গরুকে খাওয়াচ্ছে।

শাহজাদপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুস সালাম বলেন, হঠাৎ পানি বৃদ্ধির ফলে শাহজাদপুরে প্রায় ২০০ বিঘা বোরো ধান ডুবে গেছে। এর মধ্যে ১১৫ বিঘা জমির ধান সম্পূর্ণ ও ৭৫ বিঘা জমির ধান আংশিক ডুবে গেছে। এতে কৃষকদের বেশ ক্ষতি হয়েছে। তবে কী পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা এখনো নিরূপণ করা হয়নি।

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর প্রতিনিধি জানান, কয়েক দিন ধরে ভূঞাপুরের যমুনা নদীর পানি হঠাৎ করে বাড়তে শুরু করেছে। আর সে কারণেই পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগেই আংশিক কাঁচা অবস্থায় স্থানীয় জাতের বোরো ধান কাটতে শুরু করেছে উপজেলার যমুনা চরাঞ্চলের বোরো ধান চাষিরা। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চরাঞ্চলের উপরিভাগে সৃষ্ট ডোবাগুলোতে চলতি বছরে ৯০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ৪০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে এবং বাকি ৫০ হেক্টর জমির ধান কাটতে শুরু করেছেন কৃষকরা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. মো. হুমায়ুন কবির বলেন, চলতি বছরে উপজেলার যমুনা চরাঞ্চলে ৬৯০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে চরাঞ্চলের উপরিভাগে ৯০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের বোরো ধান চাষ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে সেগুলো কাটতে শুরু করেছেন কৃষকরা। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে। প্রায় ৪০ হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে।

এদিকে সার্বিক এ অবস্থা নিয়ে গতকাল সংসদে কথা বলেছেন জাতীয় পার্টির সাংসদ পীর ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, সুনামগঞ্জ হাওর এলাকার একমাত্র ফসল বোরো। এই ফসল ঘরে তুলতে ১০-১৫ দিন সময় প্রয়োজন। কিন্তু এই মুহূর্তে বোরো ফসল হুমকির মুখে। মনে হচ্ছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় প্রশাসন এর গুরুত্বটা বুঝতে পারছে না। এই ফসলহানি হলে হাহাকার দেখা দেবে।

হাওরের ধান রক্ষায় উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এই ফসলহানি হতে বেশি দিন লাগে না। এক দিনের ভেতর একটি-দুটি বাঁধ ভাঙা শুরু হলেই সব হাওর তলিয়ে যায়। টাঙ্গুয়ার হাওরের নজরখালি বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকেছে। আরও কয়েকটি বাঁধে ধস দেখা দিয়েছে। স্থানীয় লোকজন বাঁধ রক্ষায় কাজ করছে। ফসল তোলার জন্য কয়েকটা দিন দরকার। এ ফসলকে গুরুত্ব দিয়ে পানিসম্পদ ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উচিত সবকিছু বাদ দিয়ে ফসল রক্ষা করা দরকার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত