দেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানকে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘উন্নয়ন দর্শনের ক্ষেত্রে আমরা প্রকৃতিভিত্তিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছি। পানিসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য আমাদের প্রকৃতিভিত্তিক কৌশল খুঁজে বের করতে হবে।’ যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি জলাধার নির্মাণ, এই দুটি বিষয় মনে রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দেন তিনি।
বিশ্ব পানি দিবস-২০২২ উপলক্ষে গতকাল সোমবার আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আয়োজিত নগরীর গ্রিন রোডে পানি ভবনের অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভে জলাধার নির্মাণের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। সংশ্লিষ্টসবাইকে খাল, বিল, হাওর ও বাঁওড়ের সঙ্গে নদীর সংযোগবিন্দুসমূহ খুলে দিতে হবে, তা না হলে নদীর নাব্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ তিনি এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
নদী খননের সময় নাব্য সৃষ্টির পাশাপাশি অতিরিক্ত পানি কিংবা বন্যার পানি সংরক্ষণে বাফার জোন তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই পানি শীতকালে চাষাবাসে ব্যবহার করা যেতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘বন্যার সঙ্গে কীভাবে বাঁচতে হয়, সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়Ñসে সম্পর্কে আমাদের জানতে হবে। কারণ বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ।’
প্রধানমন্ত্রী সড়ক কিংবা বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নেওয়ার সময়ে গাছের চারা লাগানোরও নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এ পদক্ষেপ ভূমিধস থেকে রক্ষায় সহায়ক হবে।
সরকারপ্রধান সবাইকে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোরও নির্দেশ দেন। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে নদীর পানি বিশুদ্ধ করে জনগণের কাছে নিরাপদ পানি সরবরাহ এবং সেচকাজে ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারসহ নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে।
গৃহস্থালী, নির্মাণ কিংবা সেচসহ সব কাজে পানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্র সাধনের অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারকে পানি বিশুদ্ধ করতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে কোনো ভূমিকা না রাখলেও বাংলাদেশের মতো কিছু ছোট দ্বীপ ও দেশকে এর ব্যাপক খেসারত দিতে হচ্ছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সুতরাং দেশরক্ষায় আমাদের নিজেদেরই পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ‘মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান’ গ্রহণ করেছে যেখানে এ বিষয়ে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উন্নত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে ‘বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড’ এবং ‘ইন্দো-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি)’ প্রতিষ্ঠা করেন। ফলোআপ হিসেবে আওয়ামী লীগ সরকার অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে জাতীয় পানি নীতি, ১৯৯৯, বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশনের জন্য জাতীয় নীতি-১৯৯৮ প্রণয়ন করেছে। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে নিরাপদ ও উন্নত জীবন দেওয়ার লক্ষ্যে তারা ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ প্রণয়ন করেছেন এবং তা বাস্তবায়ন শুরু করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরাপদ স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানীয় জল নিশ্চিত করে জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি-৬ বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমরা সফলভাবে ৯৭ শতাংশ মানুষের জন্য স্যানিটেশন নিশ্চিত করেছি এবং আমরা সবার জন্য নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, সারা বিশ্বে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন এবং ২ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ স্যানিটেশন এবং বিশুদ্ধ পানীয় জল থেকে বঞ্চিত।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক, উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবীর বিন আনোয়ার। অনুষ্ঠানে বিশ্ব পানি দিবসের ওপর একটি অডিও-ভিডিও গান এবং বাংলাদেশের পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাবিষয়ক একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শিত হয়।
এবারের বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘গ্রাউন্ডওয়াটার-মেকিং দ্য ইনভিজিবল ভিজিবল’। বিশুদ্ধ পানির গুরুত্বের প্রতি মনোযোগ কেন্দ্রীভূত এবং বিশুদ্ধ পানিসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার সুপারিশের লক্ষ্যে প্রতি বছর ২২ মার্চ বিশ্ব পানি দিবস পালিত হয়। জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়নবিষয়ক সম্মেলনের (ইউএনসিইডি) সুপারিশের সঙ্গে সংগতি রেখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী ২২ মার্চ ওয়ার্ল্ড ডে ফর ওয়াটার ঘোষণা করা হয়, যা ১৯৯৩ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে।
