নজিরবিহীন সংকটে পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর অনাস্থা প্রস্তাব অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে নাকচ এবং সংসদ ভেঙে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের উদ্যোগের মাঝে আদালতের হস্তক্ষেপ। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইমরানের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নিয়ে রাশিয়ার অভিযোগ। লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
স্নায়ুযুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র
ইউক্রেনে হামলা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের সঙ্গে সৃষ্ট বিরোধ থেকে রাশিয়া শিগগিরই বের হতে পারবে বলে মনে হয় না। এটা স্পষ্ট যুদ্ধ শুধু ইউক্রেনে সীমাবদ্ধ থাকছে না। নানা দেশে যুদ্ধের আঁচ দেখা যাচ্ছে। অথচ কয়েক দশকের নিত্যকার দৃশ্য ছিল জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনটি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্স একই ঘরানার। তারা নিজ খুশিমতো বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বিশে^ আধিপত্য বজায় রেখেছে। তাদের সিদ্ধান্তের বাইরে কারও কিছু বলার ছিল না। সর্বোচ্চ ভেটো প্রয়োগ করে দ্বিমত জানিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়া ছাড়া রাশিয়া আর চীনের কিছু করার ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের জন্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের হস্তক্ষেপ, হামলা ইত্যাদিতে জেরবার দেশগুলো প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে-ভেতরে রাশিয়ার বিরোধিতা করছে না। ফলে বিশে^ একক শক্তির উত্থানের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি ভারসাম্য সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে মনে করছেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।
ইতিমধ্যে দাবি উঠেছে, জাতিসংঘে সংস্কারের। একের পর এক অর্থনৈতিক অবরোধের মাধ্যমে আমেরিকানবিরোধী দেশগুলোকে চাপের মুখে ফেলার কারণে বিপদে পড়া দেশগুলো আমেরিকান ডলার, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক ও সুইফট নেটওয়ার্কের বাইরে বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা তৈরি করতে শুরু করেছে। এই বিকল্প বৈশি^ক মুদ্রা ও লেনদেনব্যবস্থা আমেরিকান আধিপত্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রও সক্রিয়। ছোট দেশগুলোর প্রতি নতুন দৃষ্টি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারা। উদাহরণ হিসেবে সামনে আসছে পাকিস্তান। রাশিয়াও বসে নেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, নতুন পর্যায়ের স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হচ্ছে পাকিস্তানে।
চাপ প্রয়োগের অভিযোগ
রাজনৈতিক অস্থিরতায় টালমাটাল পাকিস্তান। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ বিরোধী জোটের নানা বক্তব্য, সেনাবাহিনীর সঙ্গে ইমরান খানের সম্পর্কের অবনতি, সংসদ ভেঙে দেওয়া, নতুন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী মনোনয়ন, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ, তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে নির্বাচন কমিশনের অপারগতা ইত্যাদি ছাপিয়ে আলোচনায় পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এখন আলোচনায়। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ পরিস্থিতির মধ্যে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। এক বিবৃতিতে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘অবাধ্য’ ইমরান খানকে শাস্তি দিতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
পাকিস্তান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বলেছেন, রাশিয়া জানতে পেরেছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের পরামর্শে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি ৩ এপ্রিল সংসদ ভেঙে দিয়েছেন। ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি ইমরান খানের রাশিয়া সফরের ঘোষণা আসার পরই তাৎক্ষণিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা মিত্ররা একজোট হয়ে খুব বাজেভাবে ইমরান খানের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করে, সফর বাতিলের জন্য আলটিমেটাম দেয়। কিন্তু কোনো কিছুতে ইমরান খানকে থামানো যায়নি বলে ওয়াশিংটন পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে সফর বাতিল করার জন্য চাপ দিয়েছিল এমন দাবিই করেছে মস্কো।
পরে ইমরান খানকে সরিয়ে দিলেই কেবল পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা সম্ভব যুক্তরাষ্ট্র এমন হুমকি দিয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয় রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে। রাশিয়ার দাবি, এসব ঘটনার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অবাধ্য ইমরান খানকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত আসে। মারিয়া বলেন, ‘নিজের স্বার্থ হাসিলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর আরেকটা নির্লজ্জ চেষ্টা। ওপরের সব ঘটনা সেই সাক্ষ্যই দিচ্ছে।’
সম্পর্কের বিপর্যয়
পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২২ কোটির বেশি। পাকিস্তানের পশ্চিমে ইরান, উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তান, উত্তর-পূর্বে চীন আর পূর্বে ভারতের অবস্থান। এতে দেশটির কৌশলগত গুরুত্ব বেড়েছে। ২০১৮ সালের আগস্টে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ইমরান খানের বক্তব্য অনেক সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গেছে। তিনি চীনের ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সম্প্রতি রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছেন। ২৪ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ যেদিন ইউক্রেনে হামলা শুরু হয়, সেদিন তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের সঙ্গে মস্কোতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইমরান খানের মস্কো সফর ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের জন্য ‘বিপর্যয়কর’। বিশ^ রাজনীতির বাঁকবদলের মুহূর্তে ইমরান খানের এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে অবাক করে দেয়। কারণ, স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রমুখী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে। পাকিস্তানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী দেশটির পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে ইমরান খান সামরিক বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে রাশিয়া সফর করেন। এতে ইমরানবিরোধী শক্তিগুলো আরও কাছে আসে। বলা হচ্ছে, এর ফলে ক্ষমতা ছাড়তে হয় তাকে।
বিরোধীদের আন্দোলন, সংসদের অনাস্থা প্রস্তাব এবং ক্ষমতা থেকে বিদায় থেকে শুরু করে পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক সংকটের জন্য ইমরান খান সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন। তিনি অনেকটা প্রকাশ্যেই বলেছেন, ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া সফরে যাওয়ায় একটি ক্ষমতাধর দেশ ক্ষুব্ধ হয়েছে। ১ এপ্রিল শুক্রবার ইসলামাবাদে নিরাপত্তা সংলাপে তিনি এই অভিযোগ করেন। তবে দেশটির নাম উল্লেখ করেননি। ইমরান খানের দাবি, পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে আনা অনাস্থা প্রস্তাবের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে। এ বিষয়ে দেশটি ‘হুমকির চিঠি’ পাঠিয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এই দাবি নাকচ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইমরান জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এক দেশের ‘হুমকির চিঠি’ নিয়ে কথা বলেন। একপর্যায়ে ইমরান খান বলেন, ওই চিঠির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে। এর পরপরই নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, দেশটি যুক্তরাষ্ট্র নয়। ইমরান চিঠিটিকে তার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রের প্রমাণ’ হিসেবে দাবি করেছেন।
এর আগে গত ২৭ মার্চ নিজ দল পিটিআইয়ের এক সমাবেশে ওই হুমকির চিঠি দেখান ইমরান খান। তবে ওই চিঠি কোন দেশ পাঠিয়েছে, তা তিনি উল্লেখ করেননি। নাম প্রকাশ না করে কয়েকটি সূত্রের বরাত দিয়ে জিও নিউজ জানায়, একটি বিদেশি রাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের এক দূত চিঠিটি লিখেছেন। তবে এ ধরনের চিঠি পাঠানোর বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পরে অবশ্য চিঠি লেখার জন্য দায়ী কূটনীতিকের নাম সামনে আসে।
ডোনাল্ড লু
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লুর বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ তুলেছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তার দাবি, ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথোপকথনে লু বলেছিলেন, ‘অনাস্থা ভোটে ইমরান টিকে গেলেও পাকিস্তান বিপদে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ক্ষমা করবে না।’
সম্প্রতি ভারত সফরে থাকা মার্কিন কর্মকর্তা ডোনাল্ড লুকে ইমরানের এ অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করেছিল হিন্দুস্তান টাইমস। উত্তরে লু বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের দিকে নজর রাখছি। আমরা পাকিস্তানের সংবিধান ও আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।’ এর সম্পূরক প্রশ্ন হিসেবে লুর কাছে আবারও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথোপকথনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটাই সব, এই প্রশ্নের জবাবে আপনাকে আমার এর চেয়ে বেশি কিছু বলার নেই।’
রাশিয়ায় ইমরান
ইউক্রেন নিয়ে উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়া সফরে যান ইমরান খান। ইমরান খানের এই সফর বিশ^ রাজনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারণ দুই দশক পর পাকিস্তানের কোনো সরকার প্রধান রাশিয়া সফরে গেলেন। ইমরানের মস্কো সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশি^ক রাজনীতিতে পাকিস্তানের কূটনৈতিক হিস্যা বাড়ানো।
আগের সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ‘ভয়ংকর তিক্ত’ সম্পর্ক ছিল পাকিস্তানের। প্রথমত, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে রাশিয়া পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করে। দ্বিতীয়ত, আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতের আগ্রাসনের পর যুক্তরাষ্ট্রের মাধ্যমে স্বাধীনতার লড়াইয়ে মুজাহিদদের সাহায্যের ব্যবস্থা করে পাকিস্তান। বিশ বছরের যুদ্ধে আফগানিস্তানে রাশিয়া পরাজয় বরণ করে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে রাশিয়া যতটা দায়ী করে, পাকিস্তানকেও ঠিক ততটাই দায়ী করে। ফলে আফগানিস্তানে সোভিয়েতের পতনের পরে মস্কোর সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে ভাটা আসে, আর ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের জোয়ার তৈরি হয়। এরই মাঝে আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো জোটের হামলায় সর্বতোভাবে সহায়তা করে ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের ভূমিতে জঙ্গি দমনের নামে যখন বোমা হামলা চালানো হয়, তখন ফুঁসতে থাকে দেশের মানুষ। বিস্ফোরোণ¥ুখ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন ইমরান খান, আফগানিস্তান থেকে বিদায় নেয় আমেরিকা। এমন জটিল মুহূর্তে পাকিস্তানের বন্ধুদেশ চীন ইউক্রেন বিতর্কে মস্কোর পাশে দাঁড়ায়। ইমরানও একই সময়ে রাশিয়া সফরে গিয়ে তার বন্ধুত্বের কথা বিশ^বাসীকে জানান দেন। ইমরান খান বলেন, ‘এমন সময়ে মস্কো সফর করতে পেরে আমি বেশ শিহরণবোধ করছি।’ তার এই মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। ইমরানের শিহরণ ভালোভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে দেশটির তরফে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার নতুন করে আগ্রাসনের বিষয়ে পাকিস্তানকে আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। আমরা তাদের যুদ্ধের বিষয়ে কূটনীতি অনুসরণ করার বিষয়ে অবহিত করেছি।’
‘সুযোগ সন্ধানী’ কূটনীতি
যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে ইমরান খানের মস্কো সফরকে পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘সুযোগ সন্ধানী’ কূটনীতি বলে আখ্যা দিয়েছেন। পকিস্তানের কূটনৈতিক মহল অতি ‘রক্ষণশীল’ শাসকশ্রেণী ও সেনাবাহিনীর ‘সুবিধাভোগী’দের চটিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থে ইমরানের মস্কো সফর নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের মত বলতে পারেনি। অনুচ্চস্বরে যা বলা হয়েছে, তার সারাংশ হলো পাকিস্তানের পরিবর্তনশীল জনগণ ইমরান খানের রাশিয়া সফরকে সমর্থন করেছে। তাদের মতে, ইমরানের মস্কো সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল এবং এটি দেশের ‘কূটনৈতিক সুযোগ’ বাড়াতে সাহায্য করেছে।
সফর শুরুর আগে ইমরান খানের মস্কো যাওয়া উচিত হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে অভ্যন্তরীণ পরামর্শ চাওয়া হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি বলেন, ‘আমরা সফরের ভালো-মন্দ বিবেচনা করে একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাই। আমরা রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক সুসংহত করতে চেয়েছিলাম এবং সম্মিলিত প্রজ্ঞার মাধ্যমে আমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছাই যে এই সুযোগ নষ্ট করা উচিত নয়।’
এই সফরে ইমরান খান রুশ প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানের পাশাপাশি ভারতের অবৈধভাবে অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মীরের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। ইমরান রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করেন। কারণ ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের খবরদারি উপকারের তুলনায় ক্ষতি বেশি করছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন নেতৃত্বের আসন হারানো মিত্রহীন রাশিয়া নিজের বলয় বাড়াতে মিত্রের খোঁজে ছিল। ইমরান খান এই সুযোগটিই নিয়েছেন। রাশিয়া সফরে গিয়ে সেখান থেকে ২৫০ কোটি ডলারের বিনিময়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস কেনা নিয়ে আলোচনা সারেন তিনি। করাচি এবং কসুরে দুটি বন্দর গড়ে তুলতে আগ্রহী হয় রাশিয়া। যদিও ইমরানের এই অর্জনকে পাকিস্তানের মিডিয়া গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেনি। উল্টো সফরের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ‘গোস্সা’ করছে, এটাই বড় করে দেখানো হয়েছে।
এর আগে ইমরান পরস্পর শত্রুভাবাপন্ন সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন। এমনকি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথিরকে সঙ্গে নিয়ে আলাদা একটি মুসলিমবলয় বা জোট গড়ার কথা বলেন। এভাবেই ইমরান নানা সময়ে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী মনোভাবের কথা প্রকাশ করেছেন। রাশিয়া সফরে দেশটির গ্র্যান্ড মুফতি রাভিল যায়নুদ্দিন ও চেচেন নেতা রমজান কাদিরভের সঙ্গেও আলাদা বৈঠকে মিলিত হন ইমরান। এর মধ্য দিয়ে তিনি পাকিস্তানের ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে একটি বার্তাও দিতে চেয়েছেন। এটিও ভালোভাবে নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
মস্কোর বিবৃতি
দেশের ভেতরে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাত রয়েছে বলে গোড়া থেকেই ইঙ্গিত দিয়ে আসছিলেন ইমরান খান। এবার এই অভিযোগকে স্বীকৃতি দিয়ে ইমরানের পাশে দাঁড়াল রাশিয়া। তাদের দাবি, হ্যাঁ, হুমকির চিঠি পেয়েছিলেন ইমরান। তার পরও রাশিয়া সফর বাতিল করেননি তিনি। তাতেই আমেরিকা ইমরানকে শাস্তি দিচ্ছে। রাশিয়ার এই বিবৃতি ইমরানকে সাহস ও শক্তি জোগাবে। কারণ, ইমরান যখন মস্কো সফরকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রকে কাঠগড়ায় তুলছেন, তখন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া সরাসরি রাশিয়ার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন।
এটা ইমরানের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। শনিবার ইসলামাবাদে নিরাপত্তা সংলাপে অংশ নিয়ে বাজওয়া বলেন, রাশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পাকিস্তান মারাত্মকভাবে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ছোট একটি দেশের বিরুদ্ধে রাশিয়ার অভিযান মেনে নেওয়া না। ইউক্রেনে রাশিয়ার অভিযানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কোনো শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে এই প্রথমবার প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিতে দেখা গেল। ইসলামাবাদ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কোর যুদ্ধের বিরোধিতা করেনি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে সামরিক বাহিনীর ভূমিকা সব সময়ই গুরুত্বপূর্ণ। এবারও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ায় মুহূর্তে সেনাবাহিনীপ্রধানের এমন অবস্থানকে ইমরানবিরোধী হিসেবেই দেখা হচ্ছে। ইতিমধ্যে দেশটিতে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে, পরিস্থিতি কোন জায়গায় গিয়ে থামবে, তা এখনই বলার সময় আসেনি। তবে এমন সময়ে রাশিয়ার বিবৃতি টনিকের কাজ দেবে ইমরানশিবিরে।
