হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আবারও রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনস বিমানের যাত্রীসেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যাত্রীরা। বিমান তার যাত্রীদের সঙ্গে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞা করে বলে একজন প্রবাসী যাত্রী তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানান। কয়েকজন যাত্রীর অভিযোগ, দুনিয়ার সব এয়ারলাইনস ঠিকমতো ফ্লাইট চালায়, ব্যতিক্রম শুধু বিমান। এসব বিষয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার মেলে না।
বিমান ছাড়াও বিমানবন্দরের সামনে হাজার হাজার লোক সমাগম দেখে এক যাত্রী প্রশ্ন রাখেন এটা কি সমুদ্রসৈকত নাকি সিনেমা হল?
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিমানবন্দরে গণশুনানিতে বিমান ও বিমানবন্দরের সেবা নিয়ে যাত্রীরা এভাবে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান, সদস্য (অপস) এয়ার কমোডর সাদিকুর রহমান চৌধুরী, সদস্য (সিকিউরিটি) গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মাহমুদ মান্নাফী, প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মালেক, সদস্য এটিএস এয়ার কমোডর রিয়াদাদ হোসেন, গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএস তৌহিদ উল আহসান ও গ্রুপ ক্যাপ্টেন কামরুল ইসলাম, বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের কমান্ডিং অফিসার মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম খান ও এওসি চেয়ারম্যান দিলারা আহমেদ।
যাত্রীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বেশ কজন বিদেশিও। তাদের একজন মার্কিন নাগরিক কার্ল অগাস্টিন বলেন, তিনি বাংলাদেশে এসে বেশ অভিভূত। এখানকার আতিথেয়তা তাকে মুগ্ধ করেছে। রাস্তাঘাটে চলার সময় গাড়ির চালকদের আন্তরিকতা থেকে শুরু করে হোটেলের সেবা সবই তার কাছে ভালো লেগেছে। কিন্তু বিমানবন্দরে আসার সময় কিছুটা যানজট ও বিমানবন্দরের ভেতরে ওয়াই-ফাই সেবা না থাকায় তিনি যোগাযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
গণশুনানিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস নিয়ে যাত্রীদের বিভিন্ন অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বিমানের ফ্লাইট শিডিউল ঠিক না থাকা, যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ফ্লাইট পরিবর্তনের তথ্য যাত্রীদের না জানানো ইত্যাদি।
এ প্রসঙ্গে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মফিদুর রহমান বলেন, বিমানবন্দরের আগমনী টার্মিনালে সব যাত্রীর জন্য ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুবিধা থাকলেও বহির্গমন টার্মিনালে সেটা নেই। বহির্গমন টার্মিনালেও ওয়াই-ফাই সুবিধা দ্রুত যুক্ত করার আশ্বাস দেন তিনি।
বেবিচক চেয়ারম্যান জানান, যাত্রীদের অভিযোগ শোনা ও তাদের প্রতি সম্মান জানানোর জন্যই নিয়মিত এ ধরনের গণশুনানির আয়োজন করা হয়। করোনা মহামারীর সময় দুই বছর শুনানি স্থগিত রাখা হলেও এখন থেকে নিয়মিত তা চলবে।
বিমানবন্দরের বহির্গমন কনকর্স হলের দোতলায় শত শত যাত্রী, নিরাপত্তাকর্মী ও অন্যান্য দায়িত্বরত কর্মকর্তা-কর্মচারীর উপস্থিতিতে গণশুনানির আয়োজন করে বেবিচক। এতে ছিলেন বিভিন্ন এয়ারলাইনস ও সংস্থার প্রতিনিধিরা। তবে বিমান বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি হাজির না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বেবিচক চেয়ারম্যান। যাত্রী হয়রানি বন্ধে বিমান বাংলাদেশকে আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
গণশুনানির শুরুতেই কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে আসা প্রবাসী মোহাম্মদ রিয়াদ সরকার মাইক হাতে নিয়ে তার অভিযোগের ফিরিস্তি দেন। তিনি জানান, বিকাল ৩টার সময় বিমানের ফ্লাইট ছিল সৌদি যাওয়ার। দুপুর ১টার সময় তিনি বিমানবন্দরের বিমান কাউন্টারে গিয়ে জানতে চান ফ্লাইটের শিডিউল ঠিক আছে কিনা। তাকে ধুর ধুর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। যেন তিনি একজন ভিখারি।
রিয়াদ অভিযোগ করে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বিমানের উন্নতির জন্য কাজ করেন যাত্রীদের আশীর্বাদের জন্য। কিন্তু এই বিমান এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। কারণ, আমি দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব থাকি। আসা-যাওয়া করি বিমানেই। জীবনে কোনোদিনই বিমানের শিডিউল ঠিক পাইনি।’ তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘দেশ উন্নত হচ্ছে, বিমানবন্দরেরও সেবা বাড়ছে। বিমানবন্দরে হাজার হাজার লোকের ভিড় তাতে চলাচলই কষ্টকর। মনে হচ্ছে এটা সিনেমা হল কিংবা সমুদ্রসৈকত। এখানে কেন এত মানুষের জটলা থাকবে?’
রিয়াদের এসব প্রশ্নের জবাবে বেবিচক চেয়ারম্যান তাৎক্ষণিক বিমানের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকে তলব করেন। আরিফুজ্জামান নামের এক কর্মকর্তা এসে এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। এ ঘটনার জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেজন্য আরও আন্তরিক ও নিবেদিত থাকবেন বলে অঙ্গীকার করেন।
বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, ‘আপনার (রিয়াদ) সঙ্গে এমন ঘটনার জন্য আমরা ক্ষমাপ্রার্থী। দুঃখ লাগছে আপনি সকালে এসেছেন, অথচ বিলম্বের বিষয়টি বিমান আপনাকে জানায়নি। এটা বিমান ঠিক করেনি। এজন্য এয়ারলাইনসকে আমরা ধরব।’
শুনানিতে তৌহিদুল ইসলাম নামে কুমিল্লার এক প্রবাসী জানতে চান, দুনিয়ার সব দেশেই এয়ারলাইনসের ভাড়া কম। এখানে কেন এত বেশি? যাত্রীদের জিম্মি করে এয়ারলাইনসগুলো অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জবাবে বেবিচক চেয়ারম্যান বলেন, করোনার সময় কিছু বিধিনিষেধের জন্য উড়োজাহাজের আসন ফাঁকা রাখার কারণে ভাড়া কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। করোনা কমে আসায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে এবং সে জন্য হঠাৎ একসঙ্গে প্রবাসীরা কর্মস্থলে ফিরছেন। সে জন্য টিকিটের চাহিদা বেড়ে গেছে। কিন্তু ফ্লাইটের সংখ্যা কম। তারপরও ভাড়া কমাতে তারা নির্দেশ দিয়েছেন। ইতিমধ্যে কিছুটা কমেছেও।
এ ছাড়া যাত্রীদের দ্রুত লাগেজ পাওয়ার জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান।
এ সময় বিমানবন্দর আর্মড পুলিশের কমান্ডিং অফিসার মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম খান যাত্রীদের আরও সতর্ক হয়ে লাগেজে মূল্যবান জিনিসপত্র না রাখার পরামর্শ দেন।
