আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের রোষের বলি সোহেল চৌধুরী

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০২২, ০৫:৪১ এএম

জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যাকা-ের কারণ জানিয়েছে র‌্যাব। গত মঙ্গলবার রাতে এই হত্যাকা-ের মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি আশিষ রায় চৌধুরীকে গ্রেপ্তারের পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে র‌্যাব বলেছে, আলোচিত ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে সোহেল চৌধুরী খুন হয়েছেন। তাকেহত্যার পরিকল্পনায় আজিজ ভাইয়ের সঙ্গে আশিষ ও আসাদুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলাম জড়িত। হত্যাকা- ঘটায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন।

গতকাল বুধবার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান বাহিনীর র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।

র‌্যাবের একটি সূত্র জানিয়েছে, আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেল চৌধুরীর বিরোধের সূত্রপাত মূলত তার স্ত্রী চিত্রনায়িকা দিতি ও আজিজের মধ্যে অনৈতিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। এই বিষয়টি নিয়ে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের সঙ্গে সোহেলের হাতাহাতি হয়। এ ঘটনার পর সোহেলকে ‘উচিত শিক্ষা’ দিতে আজিজ ভাই তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন জানান, সোহেল চৌধুরী হত্যাকা-ের ২৪ বছর পর গত ২৭ ফেব্রুয়ারি আশিষ রায়ের বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। পরোয়ানা জারির এক মাস পর গত ২৮ মার্চ সেটি হাতে পায় র‌্যাব। এর ভিত্তিতে মঙ্গলবার রাতে র‌্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র‌্যাব-১০ অভিযান চালিয়ে গুলশানের ভাড়া বাসা থেকে আশিষকে গ্রেপ্তার করে। ৭ এপ্রিল তার কানাডায় পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল।

এ কারণে নিজের বাসা ছেড়ে গুলশানে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। যেটি একটি পাঁচ তারকা হোটেলের এমডি ভাড়া করে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে কানাডায় যেতে তিনি একটি এয়ারলাইনসের টিকিটও কাটেন বলে জানা গেছে।

 র‌্যাব বলছে, গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে আশিষকে গ্রেপ্তারের অভিযানে ২২ বোতল বিদেশি মদ, ১৪ বোতল সোডা ওয়াটার, ১টি আইপ্যাড, ১৬টি বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড, ২টি আইফোন ও ২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়। আশিষ রায়ের বিরুদ্ধে মাদক আইনে নতুন মামলা করা হবে।

র‌্যাব জানিয়েছে, ১৯৯৬ সালে বনানীর আবেদীন টাওয়ারে ৫০ লাখ টাকা খরচ করে প্রতিষ্ঠা করা হয় ট্রাম্পস ক্লাব। সেটির যৌথ স্বত্বাধিকারী ছিলেন আশিষ রায় চৌধুরী ও আসাদুল ইসলাম ওরফে বান্টি ইসলাম। ক্লাবটিতে সারা রাত নানা অসামাজিক কার্যকলাপ হতো। একপর্যায়ে ক্লাবটি আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন ও গ্যাং লিডারদের একটি বিশেষ আখড়ায় পরিণত হয়। সেখানে বেশি যাতায়াত ছিল আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের। ট্রাম্পস ক্লাবের মালিক বান্টি ইসলাম ও আশিষ রায় চৌধুরীর সঙ্গে তার সখ্য তৈরি হয়। এরপর তার ভাতিজিকে বিয়ে করেন বান্টি ইসলাম। এই তিনজন ক্লাব ব্যবহার করে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন।

র‌্যাব বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে আশিষ বলেছেন, ক্লাবের পাশে ছিল বনানী জামে মসজিদ। পাশে সোহেল চৌধুরীর বাসাও ছিল। তিনি মসজিদ কমিটিকে সঙ্গে নিয়ে ক্লাবের অসামাজিক কার্যক্রম বন্ধে বারবার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। তার প্রতিবাদের কারণে ক্লাব মালিক বান্টি ও আশিষের ব্যবসায়িক স্বার্থে আঘাত আসে।

র‌্যাবের একটি সূত্র বলছে, সোহেলের স্ত্রী পারভিন সুলতানা দিতির সঙ্গে আজিজের সম্পর্ক নিয়ে বিরোধের কারণে আজিজও ক্ষুব্ধ ছিলেন সোহেলের ওপর। এ ছাড়া ক্লাব বন্ধ করার চেষ্টার কারণে সোহেল তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমনের চক্ষুশূলে পরিণত হন। আজিজ ক্ষুব্ধ হয়ে সোহেলের ওপর প্রতিশোধ নিতে বান্টি ও আশিষকে অনুরোধ জানান। এরপর শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। ইমন তার গ্যাং দিয়ে সেভাবেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। ১৯৯৮ সালের ২৪ জুলাই আজিজ মোহাম্মদের সঙ্গে সোহেলের বাগ্বিত-া হয়।

র‌্যাব পরিচালক জানান, ১৯৯৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাত ৩টার দিকে বনানীর ট্রাম্পস ক্লাবের নিচে চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় তার বড় ভাই তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী বাদী হয়ে গুলশান থানায় মামলা করেন। যার মামলা নম্বর ৫৯। ১৯৯৯ সালের ৩০ জুলাই ৯ জনের বিরুদ্ধে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০০১ সালে ৩০ নভেম্বর মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে মামলা বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই মামলার ১ নম্বর আসামি আদনান সিদ্দিকী দুই বছর পর হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রুলসহ আদেশ দেয়। পরে হাইকোর্ট ২০১৫ সালের ৫ আগস্ট আরেকটি রায় দেয়। এ রায়ে আগের জারি করা রুলটি খারিজ করে দেওয়া হয়। প্রত্যাহার করা হয় হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ। সর্বশেষ চলতি বছরের গত ২৮ মার্চ বিচারিক আদালত অনুপস্থিতির কারণে ছয় পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত