নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনাকে দল ও জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য করার ব্যবস্থা নিতে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন ইসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশের দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে নির্বাচন ভবনে আয়োজিত এক সংলাপে এ আহ্বান জানান তারা।
আরও অনেক প্রস্তাবের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন সারা দেশে এক দিনে না করে ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণের প্রস্তাব রেখেছেন তারা। তারা বলেছেন, এর ফলে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনবলের মাধ্যমে বিভাগ কিংবা জেলাভিত্তিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা সম্ভব হবে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে সংলাপের পর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমাদের দিক থেকে সুষ্ঠু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি থাকবে না, আমরা কোনো চাপ অনুভব করছি না। আজকের সংলাপ থেকে আমরা বেশকিছু পরামর্শ পেয়েছি। সেগুলো পর্যালোচনা করে আমরা এগিয়ে যাব।’ নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা রাষ্ট্রের বিষয়। তবে আমরা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার চেষ্টা করব।’
সংলাপের উদ্দেশ্য সম্পর্কে হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নেওয়ার প্রয়োজন থেকেই সংলাপ করা হচ্ছে। সংলাপের যে ফল, সেগুলো আমরা লিপিবদ্ধ করেছি। এরপর আমরা ইন্টারনালি এই মতামতগুলো বোঝার ও জানার চেষ্টা করব।’
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে ইসি আয়োজিত তৃতীয় সংলাপে ২৩ সম্পাদকসহ ৩৪ সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে সংলাপে অংশ নেন ২৩ জন। বাকি ১১ জন ইসির এই আমন্ত্রণে সাড়া দেননি। সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে অন্য চার কমিশনার, ইসি সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
ডেইলি অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী বলেন, ‘গত ইসি তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে। আপনাদের উইল ফোর্স তৈরি করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে। দল ও জাতির আস্থা অর্জন করতে হবে। তার জন্য সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে নিজেদের আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোকে সুষ্ঠু করে তার প্রমাণ দিতে হবে।’
আজকের পত্রিকার সম্পাদক ড. গোলাম রহমান সিইসিকে আগে থেকেই আস্থার সংকটে না ভোগার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসিকে তার ক্ষমতার সঠিক প্রয়োগ করতে হবে।’
যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন শুধু ইসির ওপর নির্ভর করে না, সরকারের সদিচ্ছা, রাজনৈতিক দল ও ভোটারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ভোটকর্মী সকলের ওপর নির্ভর করে।’ তিনি সব দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইসিকে জনগণকে সম্পৃক্ত করার কাজ করতে হবে।
ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, ‘আগের ইসি তাদের ওপর বর্তিত সাংবিধানিক ক্ষমতার কোনো রকম সুস্থ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই দল ও ভোটাররা নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থাহীনতায় ভুগছে।’ এ কমিশনের প্রধান দায়িত্ব হবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসির আস্থা ফিরিয়ে আনা।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘নির্বাচন ইসির একার পক্ষে হবে না।’ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন, পুলিশ সবকিছু ঠিক মনে রাখে, শুধু গণতন্ত্রকে ভুলে যায়।’ তিনি ডিসিদের হাতে রিটার্নিং কর্মকর্তার দায়িত্ব না দিয়ে ইসির কর্মকর্তাদের হাতে দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় বা সরকারে যারা থাকেন তারা যেন প্রভাব বিস্তার না করতে পারেন তা ইসিকে শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে।’
ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন জাতীয় নির্বাচন একেক বিভাগে এক একেক দিনে ভোট নেওয়া ও ইসির নিজস্ব জনবলকে রিটার্নিং কর্মকর্তা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে ইসি যদি কঠোর না হয়, তাহলে প্রার্থী ও দুষ্কৃতকারীরা মেশিনগান নিয়ে ভোটের মাঠে নেমে পড়বে।’
সংলাপে বক্তারা নতুন ইসিকে বিগত ইসিগুলোর ভুলত্রুটি পর্যালোচনা করে তাদের প্রতি দল ও ভোটাদের আস্থাহীনতা ফিরিয়ে আনা এবং আগামীতে জাতিকে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়ার আহ্বান জানান। অনেকে ইভিএম ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন।
সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন কমিশন এর আগে ১৩ মার্চ প্রথম দফায় ৩০ শিক্ষাবিদকে সংলাপের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তাতে ১৭ জনই সাড়া দেননি। দ্বিতীয় দফার সংলাপে ৪০ বিশিষ্ট নাগরিককে আমন্ত্রণ জানানো হলেও পরে একজনকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ওই পর্যায়ে ৩৯ বিশিষ্ট নাগরিকের মধ্যে সংলাপে অংশ নেন ১৯ জন।
নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে কিছু বলব নাÑসিইসি : সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে আমরা কিছুই বলব না। কেননা যে সংবিধান রয়েছে, তার অধীনে আইন এবং সাংবিধানিক বিধিবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছি।’
গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে সংলাপ শেষে আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনে তিনি সাংবাদিকদের এ কথা বলেন।
সিইসি বলেন, ‘আমরা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে মতামত, পরামর্শ জানতে চাই। আজকেও সেভাবে মতামত নিয়েছি। শোনার জন্য সংলাপ করেছি। তাদের সব মতামত লিপিবদ্ধ করেছি। এগুলো নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে ব্রেন স্টর্মিং করব। কোন কোন বিষয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে, এগুলো আমাদের প্ল্যানের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে কাজ করব।’
দলগুলোকে আস্থায় আনতে পারবেন বলে মনে করেন কি নাÑএ প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘এখনো মনে হওয়ার মতো পর্যায়ে যায়নি। কিন্তু আমরা আশাবাদী সব সময়, প্রয়াসের কোনো ত্রুটি থাকবে না। মানুষের যে সাধ্য, মানুষের যে প্রচেষ্টা সেখানে সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। অসীম আমরা কেউ নই। কিন্তু আমরা আমাদের সব শক্তি দিয়ে, সব প্রয়াস দিয়ে চেষ্টা করব, একটা সুন্দর অংশগ্রহণমূলক, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য।’
বৈঠকে যারা ছিলেন : সিইসির সভাপতিত্বে বেলা সোয়া ১১টা থেকে প্রায় আড়াই ঘণ্টার বৈঠকে ২৩ সম্পাদক-জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। তারা হলেনÑপ্রথম আলো থেকে আনিসুল হক ও সোহরাব হাসান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক অজয় দাসগুপ্ত, মানবকণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক দুলাল আহমেদ, আমার সংবাদ সম্পাদক হাশেম রেজা, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সম্পাদক ইনাম আহমেদ চৌধুরী, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিভু রঞ্জন সরকার, বাংলাদেশ জার্নালের সম্পাদক শাহজাহান সরদার, ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, অবজারভার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, ডেইলি অবজারভার অনলাইন ইনচার্জ কাজী আব্দুল হান্নান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাহবুব কামাল, ভোরের ডাক সম্পাদক কে এম বেলায়েত হোসেন, যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম, প্রতিদিনের সংবাদ সম্পাদক শেখ নজরুল ইসলাম, আজকের পত্রিকা সম্পাদক ড. মো. গোলাম রহমান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, নয়া দিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হক, নিউএজ সম্পাদক নূরুল কবীর, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান ও সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন।
