জোরালো হচ্ছে হৃদয় মণ্ডলের মুক্তির দাবি

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২২, ০২:৪৭ এএম

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার মুন্সীগঞ্জের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের মুক্তির দাবি জোরালো হচ্ছে। বুধবার ১৮ বিশিষ্ট নাগরিকের পর গতকাল বৃহস্পতিবার তার নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে দেশের ১২টি সাংস্কৃতিক ফেডারেশন। একই সঙ্গে দুই সপ্তাহেও তার জামিন না পাওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তারা। বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয়ের মুক্তির দাবিতে গতকাল মানববন্ধন হয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও। এ ছাড়া আজ শুক্রবার সাংস্কৃতিক সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী এবং আগামীকাল শনিবার সমাবেশ করবে নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগ। গতকাল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের প্রচার সম্পাদক আহাম্মেদ গিয়াস ১২টি ফেডারেশনের পক্ষে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠান। এতে বলা হয়েছে, ‘সংস্কৃতিকে সংকুচিত    

করার একটি গভীর ষড়যন্ত্র দৃশ্যমান হচ্ছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনে লাল নিশানা টাঙিয়ে তথাকথিত মাজারের উপস্থিতি ঘোষণা, ধানমন্ডি রবীন্দ্র সরোবর মঞ্চ প্রাঙ্গণে সম্প্রতি জামাতে নামাজ আদায়ের সূচনা, দেশের বিভিন্ন মিলনায়তন এবং উন্মুক্ত মঞ্চের পাশে উপাসনালয় বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন মূলত সংস্কৃতিচর্চাকে সংকুচিত করার সুপরিকল্পিত অপপ্রয়াস। এ ধরনের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে প্রত্যাশা করছি।’

বিবৃতিদাতা সাংস্কৃতিক ফেডারেশনের মধ্যে রয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, জাতীয় কবিতা পরিষদ, বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদ, বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ, বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ, আইটিআই বাংলাদেশ কেন্দ্র, বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ ও বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার।

১২ সাংস্কৃতিক সংগঠন সম্প্রতি তেজগাঁও কলেজের প্রভাষক লতা সমাদ্দারকে টিপ পরায় উগ্র পুলিশ সদস্য কর্র্তৃক হেনস্তার ঘটনারও নিন্দা জানিয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে শিক্ষক হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের মুক্তির দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) শহীদ মিনার সংলগ্ন সড়কে মানববন্ধন করেছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা। মানববন্ধন চলাকালে আটক শিক্ষকের নিঃশর্ত মুক্তি এবং ওই ঘটনায় ‘ইন্ধনদাতাদের’ আইনের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়।

মানববন্ধনে ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক পারভীন জলি বলেন, ‘শিক্ষকরা কেমন হবেন? হৃদয় মণ্ডলের মতো যুক্তি দিয়ে ক্লাস করাবেন, নাকি ঠিকমতো ক্লাস নেবেন না এমন শিক্ষক হবেন? হৃদয় মণ্ডলের গ্রেপ্তার পূর্বপরিকল্পিত, এখানে নিশ্চয়ই কেউ চক্রান্ত করেছে; সেটি খুঁজে বের করা হোক।’

ছাত্রফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক শোভন রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্রের ছিটেফোঁটাও বর্তমানে এ দেশে নেই। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন দিয়ে আমাদের মুখ বন্ধ করে রাখা হয়েছে।’

গত ২২ মার্চ মুন্সীগঞ্জ সদরের পঞ্চসার ইউনিয়নের বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে পুলিশ আটক করে। ওইদিন রাতে বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. আসাদ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ এনে হৃদয় চন্দ্র মণ্ডলের বিরুদ্ধে সদর থানায় মামলা করেন। পরদিন ২৩ মার্চ পুলিশ ওই শিক্ষককে আদালতে পাঠায়। ওইদিনই আদালত তাকে জেলহাজতে পাঠায়। গত ৪ এপ্রিল জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ওই শিক্ষকের জামিন আবেদন করা হয়। তবে আদালত জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করে ১০ এপ্রিল শুনানির দিন ধার্য করেছে।

সাম্প্রদায়িক তৎপরতা রুখে দেওয়ার ঘোষণা ছাত্রলীগের : সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ইস্যুতে ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাম্প্রদায়িক অপতৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ এনে তাদের রুখে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে ছাত্রলীগ। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আয়োজিত এক প্রতিবাদ সমাবেশে এ দাবি জানান সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।

ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি সনজিত চন্দ্র দাসের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের সঞ্চালনায় সমাবেশে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল-নাহিয়ান খান জয়, সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যও বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে ছাত্রলীগের বিভিন্ন ইউনিটের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। 

সমাবেশে আল-নাহিয়ান খান জয় বলেন, আজ যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তখনই পাকিস্তানি প্রেতাত্মাদের বুক কেঁপে উঠেছে। বর্তমানে এই মৌলবাদী গোষ্ঠী এই ক্যাম্পাসে বিভিন্ন নামে সাম্প্রদায়িক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। শান্তির ধর্ম ইসলামকে ব্যবহার করে মৌলবাদীরা এসব অপতৎপরতা চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা এই মৌলবাদী গোষ্ঠীদের কখনই মেনে নেবে না। তারাই এই গোষ্ঠীকে দমন করবে।

লেখক ভট্টাচার্য বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের মাধ্যমে সিদ্ধান্তের মাধ্যমে এই ক্যাম্পাসে মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অথচ মৌলবাদীরা একেক সময় একেকটি ব্যানারে ধর্মকে ব্যবহার করছে। এই সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠীকে প্রতিহত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

সনজিত চন্দ্র দাস বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ পরিষদ স্বীকৃত সংগঠনের বাইরেও ব্যাঙের ছাতার মতো বিভিন্ন ধরনের সংগঠন গড়ে উঠছে। এদেরকে প্রকারান্তরে ছত্রছায়া দিচ্ছে ঢাবি প্রশাসন। প্রশাসনের এ ধরনের কর্মকাণ্ড আমাদের হতাশ করেছে।

সাদ্দাম হোসেন বলেন, মৌলবাদী গোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নৈতিক দায়িত্ব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত