ঢাকা-ওয়াশিংটন নিরাপত্তা সংলাপ

প্রতিরক্ষা চুক্তি হলে অস্ত্র কিনতে পারবে বাংলাদেশ

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২২, ০২:৫১ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ। চুক্তি সইয়ের শেষ ধাপে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ঢাকা-ওয়াশিংটন নিরাপত্তা সংলাপে এ প্রতিরক্ষা চুক্তি জেনারেল সিকিউরিটি অব মিলিটারি ইনফরমেশন অ্যাগ্রিমেন্ট (জিসোমিয়া) ও অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড ক্রস-সার্ভিসিং অ্যাগ্রিমেন্ট (আকসা) নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এ চুক্তি সম্পন্ন হলে দেশটি থেকে বাংলাদেশ অত্যাধুনিক অস্ত্র কিনতে পারবে। করোনার কারণে দীর্ঘ বিরতির পর যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অষ্টম নিরাপত্তা সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। মার্কিনিদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরের আর্মস কন্ট্রোল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি আন্ডার সেক্রেটারি বনি ডেনিস জেনকিনস। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

এছাড়া বৈঠকে জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ, সমুদ্রে নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা বাণিজ্য ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল, রোহিঙ্গা ইস্যু, জঙ্গিবাদ দমন, নাগরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা করে দুই দেশ।

সংলাপের পর প্রতিরক্ষা চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে সফররত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন সাংবাদিককের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘জিসোমিয়া একটি প্রক্রিয়া, এ চুক্তির জন্য চারটি ধাপ পার হতে হয়। বাংলাদেশ বর্তমানে তৃতীয় ধাপে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব আমরা যাচাই-বাছাই করে দেখছি। এরপর চতুর্থ ধাপে যুক্তরাষ্ট্র থেকে একটি প্রতিনিধিদল এসে বাংলাদেশের ক্রয়সংক্রান্ত যে বিধি-বিধানগুলো রয়েছে, তা পরীক্ষা করে দেখবে।’ তিনি বলেন, ‘আগামী নবম নিরাপত্তা সংলাপের আগে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে চেষ্টা করব আমরা। আশা করছি ২০২৩ সালে জিসোমিয়া নিয়ে বসার সুযোগ পাব।’

সংলাপে র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ কী এ প্রশ্নে ড. মোমেন বলেন, ‘র‌্যাব ইস্যুতে শুধু নিরাপত্তা সংলাপেই নয়, গত মাস থেকেই দেশটির সঙ্গে আলোচনা চলছে। আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি। তাদেরও আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেটির মধ্য দিয়েই আমাদের যেতে হবে। এখানে কোনো নির্বাহী আদেশ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়ার মতো সুযোগ নেই।’ সমুদ্র নিরাপত্তা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একটি সমৃদ্ধ অঞ্চল দেখতে চায়। আর বাংলাদেশও ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল নিয়ে তার অবস্থান অচিরেই তুলে ধরবে।’

এর আগে সাতটি বৈঠক দুই দেশের মহাপরিচালক পর্যায়ে হয়ে থাকলেও এবার বৈঠকটি পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আর দুই দেশের সপ্তম নিরাপত্তা সংলাপ ঢাকায় ২০১৯ সালের ২ মে হয়েছিল।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বৈঠক সম্পর্কে বলা হয়, বৈঠকে প্রতিরক্ষা চুক্তির জিএসওএমআইএ এবং এসিএসএ নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নে সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

জানা গেছে, মার্কিন প্রতিনিধিরা বৈঠকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সব সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার স্বীকৃতি দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে সাধুবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ। সামনের দিনে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকার প্রশংসা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এছাড়া বৈঠকে ঢাকা-নিউ ইয়র্ক সরাসরি ফ্লাইট দ্রুত চালু ও অ্যাভিয়েশন খাতের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করে দুপক্ষ। আগামী নবম নিরাপত্তা সংলাপ ২০২৩ সালে বাংলাদেশে হবে বলে বৈঠকে নির্ধারিত হয়।

এদিকে একই দিনে যুক্তরাষ্ট্র সফররত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন দেশটির একাধিক আইনপ্রণেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। তাদের মধ্যে রয়েছে ডেমোক্র্যাট দলের জর্জিয়ার সিনেটর জন অসওফ, ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর ও পররাষ্ট্রবিষয়ক এশিয়া এবং প্যাসিফিক অঞ্চল নিয়ে সাব-কমিটির চেয়ারম্যান কংগ্রেসম্যান অ্যামি বেরা। বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আর্থসামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন ড. মোমেন। এছাড়া রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ও মানবিক সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের অনুরোধ করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এ বিষয়ে তাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানান আইনপ্রণেতারা। বৈঠকগুলোতে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুনি রাশেদ চৌধুরীকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের অনুরোধ করেন ড. মোমেন।

একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল উদ্বোধন করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে চমৎকার দ্বিপক্ষীয় ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে ভবিষ্যতে তা আরও জোরদার হবে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর উদযাপন উপলক্ষে ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেনের সঙ্গে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক আলোচনা হয়েছে বলে জানান ড. মোমেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত