দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছে উপকূলবাসী। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর থেকে ওই এলাকার মানুষের কাছে আতঙ্কের আরেক নাম ভাঙাচোরা বেড়িবাঁধ। উপকূলের মানুষের এই আতঙ্ক দূর করতে উদ্যোগ নেওয়া হয় শক্তপোক্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণের। কিন্তু দীর্ঘ সাত বছরেও শেষ হয়নি এর কাজ। এমন পরিস্থিতিতে হতাশ ও ক্ষুব্ধ বাঁশখালীর উপকূলবাসী।
জানা গেছে, বাঁশখালীতে ৬৪/১এ, ৬৪/১বি ও ৬৪/১সি নম্বর পোল্ডারের সমন্বয়ে বেড়িবাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশের স্থায়ী পুনর্বাসন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় ২০১৫ সালে। ২০১৫ সালের ১৯ মে ২৫১ কোটি ২৯ লাখ টাকা ব্যয় ধরে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন হয়। পরবর্তীতে প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাঁধ ভেঙে যাওয়া ও সিসি ব্লক ধসে পড়াসহ নানা কারণে কয়েক দফা সংস্কার করা হয়। তাতে প্রকল্পের ব্যয় ৪২ কোটি ৩১ লাখ টাকা বেড়ে সংশোধিত ব্যয় দাঁড়ায় ২৯৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। কয়েকবার বাড়িয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ছনুয়ায় ২.৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে মাত্রই। ছনুয়া অংশের কাজে নানা অনিয়মের অভিযোগে ঠিকাদারের সঙ্গে পাউবোর মামলা এবং পরে দফারফা করে আবারও কাজ শুরু হয়। কিন্তু বাঁধের শক্ত মাটি নিয়ে পাশে আবার বালি দিয়ে ভরাট করা এবং বঙ্গোপসাগর থেকে বালি তুলে তা বাঁধে দেওয়াসহ নানা অনিয়মে চলছে এ কাজ। অন্যদিকে খানখানাবাদে বাঁধের কাজ শেষ হলেও প্রেমাশিয়া অংশে ভাঙনের ফলে স্থানীয়দের মাঝে আতংক বিরাজ করছে। বর্ষা মৌসুমের আগে ভেঙে পড়া বাঁধটি সংস্কার করা না হলে বঙ্গোপসাগরের প্রবল ঢেউয়ে তা ভেঙে পড়তে পারে। পাউবো কর্মকর্তারা বাঁধটি সংস্কার করা হবে বলে দেশ রূপান্তরকে জানালেও কবে নাগাদ এ বাঁধ সংস্কার করা হবে তা নিয়ে সংশয়ে স্থানীয় মানুষ। পাউবোর তথ্যানুযায়ী, বাঁশখালীর উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে প্রথম ফেজে দুই কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতি করা, দ্বিতীয় ফেজে বাঁধের ঢাল সংরক্ষণসহ ব্রিড রেজিং ৫ দশমিক ৮০৬ কিলোমিটার, তৃতীয় ফেজে বাঁধের ঢাল সংরক্ষণসহ ব্রাঞ্চ কেজিং দশমিক ৮৬ কিলোমিটার, চতুর্থ ফেজে ঢাল সংরক্ষণসহ বাঁধ পুনরাকৃতি করা ১ দশমিক ২৬৪ কিলোমিটার, পঞ্চম ফেজে ঢাল সংরক্ষণসহ পুনরাকৃতি করা ২ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার, ষষ্ঠ ফেজে নদীতীর সংরক্ষণ (শঙ্খ নদী) দশমিক ৪ কিলোমিটার এবং সপ্তম ফেজে ৩ দশমিক ৪১৮ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ করার কথা। অর্থাৎ ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার বাঁধের ঢাল সংরক্ষণ, ভাঙন রোধ ও পুনরাকৃতি করা, ৩ দশমিক ৮ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং ৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার বাঁধ পুনরাকৃতি করা হচ্ছে। বাঁশখালীর খানখানাবাদের প্রেমাশিয়া ও রায়ছটা এলাকায় লোকালয়ে পানির প্রবেশ ঠেকাতে সিসি ব্লকের মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। অনেক জায়গায় সিসি ব্লক বসানোর কাজ শেষ হলেও সমুদ্রের পানির চাপে ব্লকের নিচের মাটি সরে দেবে গেছে। আবার কোথাও ব্লকগুলো উঠে নিচের দিকে ধসে পড়েছে। অনেক জায়গায় গত কয়েক বছরে কয়েক দফায় সংস্কারকাজ করেও ভাঙন থেকে রক্ষা করা যায়নি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পাউবো কর্মকর্তাদের যথাযথ তদারকি না থাকার সুযোগে ঠিকাদাররা নিজেদের মনমতো এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সাব ঠিকাদার হিসেবে নিয়ে কাজ করার কারণে দীর্ঘ সময়েও উপকূলীয় এই বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ শেষ হচ্ছে না।
চলমান কাজ নিয়ে ছনুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম হারুনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগে কাজ নিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম হয়েছে। বর্তমান ঠিকাদার যেভাবে কাজ চালিয়ে নিচ্ছে তাতে এবার কাজ সমাপ্ত করতে পারবে এবং কাজেও কোনো অনিয়ম হবে না বলে আশা করছি। তবে কাজ যথাসময়ে শেষ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী প্রকাশন চাকমা বলেন, ‘বাঁশখালীর উপকূলীয় এলাকায় চলমান এডিপি প্রকল্পের আওতায় ৩.৮৪৮ কিমি নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজ এবং ৬ দশমিক ২৬ কিমি বাঁধ পুনরাকৃতিকরণসহ ঢাল প্রতিরক্ষা কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ছনুয়া ইউনিয়নে ২ দশমিক ৭৫০ কিমি এবং খানখানাবাদ ইউনিয়নে কিছু কাজ চলমান রয়েছে। ২০২২ সালের মধ্যে সমাপ্তির জন্য নির্ধারণ করা এই প্রকল্পের বর্তমানে ভৌত অগ্রগতি ৮৯ দশমিক ২৫ শতাংশ।’
তিনি আরও বলেন, ‘চলতি বর্ষা মৌসুমে জরুরি ভিত্তিতে পুকুরিয়া ও সাধনপুর ইউনিয়নে ৪০০ মিটার জিওব্যাগ ডাম্পিং কাজ এবং সরল ইউনিয়নে ২০০ মি: বাঁধ পুনরাকৃতিকরণ কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নতুন করে প্রস্তাবিত ডিপিপি দাখিল করা হয়েছে।’
দীর্ঘ সময়ে বাঁধ নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘আমি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথম উদ্যোগ নিয়েছি এই কাজ করার জন্য। এ কাজের ফলে আজ উপকূলের জনগণ স্বস্তির নিঃশ^াস ফেলছে। কাজে নানা কারণে সময়ক্ষেপণ হলেও কোনো অনিয়ম হলে আমি যথাযথ ব্যবস্থা নেব।’
