শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ যাচাই করে না রাকাব

তথ্য জাল করে বাড়তি সুবিধা নিচ্ছেন কর্মীরা

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০২২, ১০:৫৭ পিএম

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্র সংশ্লিষ্ট বোর্ড, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউট থেকে ভেরিফাই (যাচাই) করা হয় না। এর ফলে বিশেষায়িত এই ব্যাংকটিতে জাল সনদে চাকরি নেওয়ার সুযোগ থেকে যাচ্ছে বলে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে অনলাইনে শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে এসএসসি বা সমমান ও দাখিল বা সমমান পরীক্ষার ফলাফল ভেরিফাই করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু রাকাব কর্র্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের এ জাতীয় কোনো ভেরিফিকেশন করার সুযোগ নিচ্ছে না।

এই পরিপ্রেক্ষিতে নিয়োগপ্রাপ্ত সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী করার আগে শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদপত্রগুলো যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের কাছ থেকে ভেরিফাই করার জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্র্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

রাকাবের কর্মকর্তারা বলছেন, সনদ যাচাই না করার কারণে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অনেক কর্মী বাড়তি সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। নিজ জেলার তথ্য পরিবর্তন করে কোনো কোনো কর্মী পছন্দের এলাকায় বছরের পর বছর চাকরি করছেন। কেউ কেউ সনদে উল্লিখিত জন্ম তারিখ পরিবর্তন করে বেশি সময় ধরে ব্যাংকটিতে চাকরির চেষ্টাও করেছেন।

এমন একটি ঘটনা ধরা পড়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনেও। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাকাবের ঢাকা করপোরেট অফিসে কর্মরত সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. লুৎফর রহমান ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে চাকরির আবেদনের সময় নিজের স্থায়ী ঠিকানা নওগাঁ জেলা উল্লেখ করেন। ১৯৮৫ সালে ওই ব্যাংকের নিয়োগপত্রের সম্বোধনে লুৎফর রহমানের ঠিকানা নওগাঁ উল্লেখ করা হয়। 

এছাড়া ওই কর্মকর্তা কর্র্তৃক সমসাময়িক সময়ে কর্র্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো বিভিন্ন চিঠিপত্রে স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে নওগাঁ জেলা উল্লেখ করা হয়। এছাড়া লুৎফর রহমানের তৎকালীন চারিত্রিক সনদপত্র, নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র ও বিভিন্ন দলিলে স্থায়ী ঠিকানায় নওগাঁ জেলা উল্লেখ রয়েছে।

 অথচ রাকাবের কর্মী ব্যবস্থাপনা বিভাগ বরাবর কোনোরূপ ঘোষণা ছাড়া লুৎফর রহমান এখন স্থায়ী ঠিকানায় ঢাকা বিভাগ লিখছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই কর্মীর বর্তমান কর্মস্থল ঢাকা করপোরেট শাখা কর্র্তৃক প্রধান কার্যালয় বরাবর প্রেরিত স্টাফ পজিশন প্রতিবেদনে স্থায়ী ঠিকানা কলামে ঢাকা বিভাগ উল্লেখ করা হয়।

রাকাবের কর্মকর্তারা বলছেন, এভাবে স্থায়ী ঠিকানা বদল করে লুৎফর রহমান বদলির ক্ষেত্রে ঢাকায় থাকার ক্ষেত্রে অগ্রধিকার পাচ্ছেন।

অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে উপমহাব্যবস্থাপক লুৎফর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আমার বক্তব্য ব্যাংকের পারসোনাল ডিপার্টমেন্টকে জানিয়েছি। তারাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের কাছে এ বিষয়ে জবাব জানিয়ে দিয়েছি।’

লুৎফর রহমান আরও বলেন, ‘আমি ঢাকায় স্থায়ীভাবে থাকি। আমার নিজস্ব বাড়িতে অবস্থান করছি। আমার সন্তানদের ঢাকার ভোটার তালিকায় নাম আছে। কিন্তু আমার তো নেই। সেই পয়েন্ট থেকে এটা পরিশোধনের জন্য ব্যাংককে অনুরোধ করেছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাকাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৭ সালে। এরপর থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কোনো কর্মকর্তার নিয়োগের ক্ষেত্রে সনদ ভেরিফিকেশন করা হয়নি। এর ফলে ৮০ ও ৯০ দশকে যারা ব্যাংকটিতে নিয়োগ পেয়েছেন তাদের কেউ কেউ সনদ জাল করে বেশি সময় চাকরিতে থাকার চেষ্টা করেছেন। এমন একজন কর্মী মাহমুদুন্নবী, মহাব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ শেষে অবসরে যাওয়ার আগে তার সনদ ঘষামাজার বিষয়টি ধরে ফেলে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই কর্মকর্তা সনদে জন্ম তারিখ পরিবর্তন করে এক বছর বেশি চাকরি করার চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি ধরা পড়ার পর রাকাবের এক আইন কর্মকর্তার মধ্যস্থতায় এর সমাধান করেন ওই কর্মকর্তা।

এসব বিষয়ে কথা বলতে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল মান্নানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাতে সাড়া দেননি। পরে তাকে একটি এসএমএস পাঠিয়ে আলোচনার বিষয় জানানো হলেও তিনি তার কোনো জবাব দেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত