স্পিন ঘূর্ণিতেই চোখ রাঙাচ্ছে হার

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০২২, ০৬:৫০ এএম

শেষ বিকেলের ব্যাটিংয়ের ঝুঁকি কেন যে বারবার বাংলাদেশের ওপর পড়ে! সেই ডারবান থেকে শুরু। গেবেরহাতেও একই কা-। বাংলাদেশকে দুই ইনিংসেই খেলতে হলো রাতে। গোলাপি বল থাকলে একে দিবারাত্রির টেস্ট বলা যেত অনায়াসে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সন্ধ্যায় স্টেডিয়ামের হাজার পাওয়ার লাইটের আলোও যেন বাংলাদেশের ভাগ্য আলোকিত করতে ব্যর্থ। দিন শেষের ওই কঠিন মুহূর্ত তাই আরেকটি টেস্ট হারের স্বাদ দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশকে। প্রোটিয়াদের দেওয়া ৪১৩ রান গেবেরহার ওই ঘূর্ণি পিচে তোলা অসম্ভব। ১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়া ৮ উইকেটে ২৭১ রান তুলে জিতেছিল এই মাঠে। এরপর থেকে কোনো দল চতুর্থ ইনিংসে তিনশো রানও তাড়া করতে পারেনি। বাংলাদেশের সামনে তো ৪১৩! এরপর কাল দ্বিতীয় ইনিংসে নেমে ২৭ রানে ৩ উইকেট হারানো হারের পথে দ্রুত ঠেলে দিচ্ছে বাংলাদেশকে।

ডারবান টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৩ রানে অলআউটের পর থেকেই সব বদলে গেছে বাংলাদেশের। কোনো কিছুই নিজেদের পক্ষে যাচ্ছে না। ভাগ্য এতই বাজে যে মেহেদী হাসান মিরাজের মনোসংযোগেও ব্যাঘাত ঘটে। প্রোটিয়াদের দ্বিতীয় ইনিংসের শুরুতেই এবাদতের বলে সারেল এরউইয়ের ক্যাচ মিস করেন মিরাজ। তবে একে মিস না বলে অদ্ভুত বলা যায়। পয়েন্টে দাঁড়ানো মিরাজের দিকেই বল যাচ্ছিল কিন্তু তিনি তাকিয়ে ডান পাশে কাভারের দিকে। কী মনে করে ওদিকে তাকিয়ে ছিলেন মিরাজই জানেন। দুর্ভাগ্যের অপর সংবাদ আসে কালই। করোনা টেস্টে পজিটিভ হয়ে দলের সঙ্গে থাকতে পারছেন না কোচ রাসেল ডমিঙ্গো। এই টেস্টের শুরু থেকেই অবশ্য তিনি বাসাতেই ছিলেন। গেবেরহাতেই বাংলাদেশ দলের কোচের বাড়ি। শুরুতে টেস্ট করিয়ে নেগেটিভ হয়েছিলেন। কিন্তু পরে আবার টেস্টে আসে পজিটিভ।

দুর্ভাগ্যের সঙ্গে যোগ হয় ব্যর্থতা। প্রথম টেস্টে সেঞ্চুরি করা মাহমুদুল হাসান জয় এই টেস্টে দুই ইনিংসেই ০ মেরে পেলেন ‘পেয়ার’। শরীর থেকে এক হাত দূরের বল খেলতে গিয়ে সিøপে ক্যাচ দেন জয়। দুই ইনিংসেই একই ভাবে আউট এই ব্যাটার। পরে শান্ত প্রথম বলেই বোল্ড হওয়া থেকে বেঁচে যান। কিন্তু ডারবানের মতো এবারও স্পিন বিষ নিয়ে প্রস্তুত মহারাজ বেশিক্ষণ টিকতে দেননি শান্তকে। মাত্র ৭ রান করে মহারাজের এক হাত টার্ন নেওয়া বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে এলবিডব্লিউ হলেন। বল খেলার চেষ্টাই করেননি। শান্ত না করলেও তামিম ইকবাল করেছিলেন। কিন্তু তাতেও সমস্যা। সিমন হারমারের বলটি সফট হ্যান্ডে ডিফেন্স করতে যান তামিম। অথচ এক্সট্রা বাউন্স হওয়া হারমারের বলটি তামিমের ব্যাটের কানায় লেগে দ্বিতীয় সিøপের ক্যাচ হয়। এমন বলে বিশ্বের সেরা ব্যাটারদেরও কিছু করার নেই। ১৩ রানে তামিমের ফেরার পর হার আরও পরিষ্কার হলো বাংলাদেশের জন্য। তার আউটের সঙ্গে দিনের খেলাও থামে। মুমিনুল অপরাজিত আছেন ৫ রানে।   

আসলে বারবার এমন ‘টোয়াইলাইট’ সময়ে খেলতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এই সময়ে কীভাবে ব্যাট করতে হবে সেই আলোচনা তাহলে কতটুকু হলো দলের। বারবার একই অবস্থায় পড়েও ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে খালেদ মাহমুদ জানান, ‘আমাদের দুঃখ যে আমরা স্পিনে ভালো করি এমন একটা অতীত বা জানা থেকেও আমরা এখানে স্পিনে বাজে পারফর্ম করলাম। আমরা প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ভালো করেছি। এরপর প্রতিবার এই স্পিনের বিপক্ষেই হারলাম। তাছাড়া আমরা পরিকল্পনা মতো বল করতে পারিনি। সব মিলিয়ে স্পিনের বিপক্ষে এভাবে আত্মসমর্পণ করা সত্যি দুঃখজনক। এর কারণে আমরা দক্ষিণ আফ্রিকাকে ওদের মাটিতে হারানোর দারুণ সুযোগও হারালাম।’  

দিনের শুরুতে প্রতিরোধটা ভালোই করেছিল বাংলাদেশ। ইয়াসির আলির সঙ্গে ৭০ রানের জুটিতে দলকে ফলোঅনের শঙ্কা থেকে দূর করেন মুশফিক। স্পিনিং উইকেটের ভয় সামলে দুজনই খেলছিলেন দারুণ। ইয়াসির আলির ৭টি চারের ইনিংস ছিল খুব সাবলীল। অথচ কেশভ মহারাজের বলে মিস টাইম হয়ে আরেকটি টেস্ট ফিফটি হাতছাড়া করেন। ৮৭ বলে ৭ চারে ৪৬ রানে আউট হওয়ার ধরনে ইয়াসির নিজেই ছিলেন বিরক্ত। তবে সবচেয়ে বিরক্তির কারণ ছিলেন মুশফিকুর রহিম। দল বিপদে, প্রথম ইনিংসে তখনো ২৪৩ রানে পিছিয়ে। মেহেদী হাসান মিরাজকে নিয়ে দলকে আরও যতদূর এগিয়ে নেওয়া যায় সেই চেষ্টা করবেন মুশফিক। অথচ অভিজ্ঞতার সবটুকু জলাঞ্জলি দিয়ে নিজের ইনিংসের আত্মাহুতি দিলেন। ১৩৬ বলে ৮ চারে ৫১ রান করা মুশফিক ফিরলেন প্রিয় রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে বোল্ড হয়ে। দলের বিপদে এমন অহেতুক শট খেলে গত বছর থেকে চারবার আউট হয়েছেন মুশফিক। তবুও নিজেকে সামলাতে পারেন না এই ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলার লোভ থেকে। মুশফিক ফেরার পর মাত্র ৭ রান টিকেছে বাংলাদেশের ইনিংস। মুশফিকের ওই শট সময় অনুযায়ী মোটেও ঠিক হয়নি বলে জানান খালেদ মাহমুদ, ‘না সত্যি বলতে ওই সময় ওই শট খেলা মোটেও উচিত ছিল না। মুশফিক আমাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ব্যাটার। আমাদের হাতে আরও তিনদিন সময় ছিল। আমাদের রান করতে হতো। এরপরও মুশফিক কী মনে করে ওই শট খেলল তা আমিও বলতে পারব না।’  

নিজেদের ইনিংসে মিরাজ যখন উইকেট থেকে স্পিনটা পাচ্ছেন ঠিক তখনই ইনিংস ঘোষণা করে দেন ডিন এলগার। অবশ্য বাংলাদেশকে চারশো রানের ওপর টার্গেট দেওয়ার লক্ষ্য তো পূরণ হয়েছেই। মিরাজের বলে মুলডার ৬ রানে সরাসরি বোল্ড হতেই এলো ইনিংস ঘোষণা। দ্বিতীয় উইকেট পান মিরাজ। এর আগে ৩০ রানে থাকা টেম্বা বাভুমাকে এলবিডব্লিউতে ফিরিয়েছেন এ অফস্পিনার। মিরাজের আগে আরেকটি ৫ উইকেটের সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন তাইজুল ইসলাম। ২৬ রানে থাকা এলগারকে বোল্ড, পিটারসেনকে ১৪ রানে এলবিডব্লিউ ও রিকেলটনকে ১২ রানে মুমিনুলের ক্যাচ বানিয়ে ম্যাচে ৯ উইকেট পেয়ে যান তাইজুল। একটির জন্য হয়নি ম্যাচে ১০ উইকেট। অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকায় এক টেস্টে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়া বোলার হয়েছেন তাইজুল।

তাইজুলের সাফল্যে ব্যাটারদের চালিকাশক্তি হতে পারছে না। টেস্টে তাড়াহুড়ো ব্যাটিং আর উইকেটে স্পিন ঘূর্ণি কঠিন করে তুলেছে তামিম-মুমিনুলদের সবকিছু। হাতে আরও দুই দিন আছে। তবে ঘূর্ণির সঙ্গে বাউন্সও যখন স্পিনারদের সঙ্গী তখন ব্যাটিং দলের ভালো কিছুর স্বপ্ন দেখাও যেন মানা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত