পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় আরব বিশ্বে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞানচর্চার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। তাই বলে তারা বসে নেই। উন্নত বিশ্বে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছেন, উদ্ভাবন করে চলেছেন যুগোপযোগী প্রযুক্তি। মধ্যযুগের স্মরণীয় আরব বিজ্ঞানীদের দেখানো পথ অনুসরণ করে তারা সমৃদ্ধ করছেন বিজ্ঞানকে। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া
বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের জগতে মধ্যযুগে ব্যাপক অগ্রসর ছিলেন আরব মুসলমানরা। সেই স্বর্ণযুগে ইউরোপ থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়ে তাদের সৃষ্টিকর্ম। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারে সে সময় আরব বিজ্ঞানীদের অবদান অনস্বীকার্য। এদের মধ্যে রয়েছেন জ্যোতির্বিদ ইব্রাহিম আল ফাজারি, আধুনিক শল্যচিকিৎসার জনক আবুল কাসিম জাহরাবি, রসায়নবিদ ইবনে খালদুন, পদার্থবিদ আল বিরুনি, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনাসহ অনেকে। এসব মেধাবী আরব মুসলমানের বিজ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য আজও বহন করে চলেছেন তাদের উত্তরসূরিরা। ইবনে সিনাদের পরবর্তী প্রজন্ম বৈজ্ঞানিক চিন্তার পথ থেকে সরে দাঁড়ায়নি। পূর্বপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আধুনিক বিজ্ঞানের জগতে তারা বিশ্বে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে চলেছেন। গত কয়েক দশকে ক্রিপ্টোগ্রাফি (নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তিবিদ্যা) থেকে শুরু করে কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনসহ অনেক যুগান্তকারী উদ্ভাবন করে বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন আরব আমেরিকান বিজ্ঞানীরা। তাদের অনেকে সাধারণের কাছে সেভাবে পরিচিত নন। এমন কয়েকজন বিজ্ঞানীর নাম এবং তাদের কাজ জেনে নেওয়া যাক।
হাসান কামেল আল-সাব্বাহ
১৮৯৫ সালে লেবাননের নাবাতিয়েহ শহরে জন্মগ্রহণ করেন হাসান কামেল আল-সাব্বাহ। স্থানীয় এক স্কুলে মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি হন লেবাননের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের গণিতশাস্ত্র বিভাগে। পড়াশোনা শেষে ১৯১৬ সালে অটোমান আর্মিতে টেলিগ্রাফ অপারেটর হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন হাসান আল-সাব্বাহ। পরে তিনি সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক শহরের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এ ছাড়া লেবাননের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতেও গণিতশাস্ত্র পড়ান। একপর্যায়ে ১৯২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন হাসান। ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) কিছুদিন পড়াশোনা করেন তিনি। এরপর ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশল বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন হাসান। ১৯২৩ সালে নিউ ইয়র্কে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিক কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ারিং ল্যাবরেটরির ভ্যাকুয়াম টিউব বিভাগে যোগ দেন লেবানিজ এই বিজ্ঞানী। সেখানে তিনি গাণিতিক ও পরীক্ষামূলক গবেষণার কাজ করেন। মূলত ইলেকট্রিক্যাল ডিভাইস রেক্টিফায়ার ও ইনভার্টার ছিল তার গবেষণার বিষয়। হাসান সম্পর্কে মিশিগানের ডিয়ারবর্ন শহরে আরব আমেরিকান জাতীয় জাদুঘরের যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ লুজিন নাসরাল্লাহ বলেন, ‘১৯২৩ সালে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) তাদের প্রকৌশল গবেষণাগারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় হাসানকে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি পেটেন্টের জন্য হাসানকে এক ডলার করে দেওয়া হতো। জিইতে কাজ করার সময় ১৯২৭ থেকে ১৯৩৫ সালের মধ্যে নিজের ৫২টি উদ্ভাবনের জন্য পেটেন্টের আবেদন করেছিলেন হাসান। এর মধ্যে ৪৩টি পেটেন্ট আবেদন মঞ্জুর হয়। এসব উদ্ভাবনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল টেলিভিশন ট্রান্সমিশন ও ক্যাথড রে টিউব প্রযুক্তি। হাসান আল-সাব্বাহর স্বপ্ন ছিল আরবের মরুভূমিতে সৌরচালিত সেল তৈরি করা। ১৯৩৫ সালে এই লেবানিজ ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস রিসার্চ ইঞ্জিনিয়ার, গণিতবিদ ও উদ্ভাবক ঘোষণা দেন, মার্কিন মুলুক ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে ফিরবেন তিনি। দেশে ফিরে তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তির মাধ্যমে আরবের ধু-ধু মরুভূমিকে স্বর্গে পরিণত করবেন। তার লক্ষ্য ছিল, মরু প্রান্তর ব্যবহার করে সোলার সেলের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা। ১৯৩৫ সালের ৩১ মার্চ নিউ ইয়র্কে সড়ক দুর্ঘটনায় মাত্র ৪১ বছর বয়সে মারা যান লেবানিজ উদ্ভাবক হাসান আল-সাব্বাহ। তার মৃত্যু নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা হয়। বিশেষ করে একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন ওঠে, হাসান আল-সাব্বাহ কি আসলেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান নাকি তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। মৃত্যুর দুদিন আগে ২৯ মার্চে লেবাননে বসবাসরত মা-বাবার কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে হাসান বলেছিলেন, ‘আমি কঠিন ও বিপজ্জনক সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, তিনি যেন আমাকে রক্ষা করেন। আপনারাও আমার জন্য দোয়া করবেন। আপনাদের দোয়া ও সম্মতি আমাকে শত্রুদের হাত থেকে বাঁচাতে পারবে। এরা সব সময় আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে আসছে এবং তাদের রাস্তা থেকে আমাকে সরানোর চেষ্টা করছে।’ হাসানের মৃত্যুর পর তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা অব্যাহত রাখেন জিইর প্রকৌশলীরা। হাসান আল-সাব্বাহর উদ্ভাবিত লিকুইড ক্রিস্টাল ডিসপ্লে (এলসিডি) প্রযুক্তি পরে আরও উন্নত করেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা। এ ছাড়া বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতে হাসান আল-সাব্বাহর আরও বেশ কটি উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে।
রানা এল কালিউবি
মিসরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন কম্পিউটার বিজ্ঞানী রানা এল কালিউবি। রাজধানী কায়রোর আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করেন তিনি। এরপর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউহ্যাম কলেজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এই আরব নারী। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) রিসার্চ সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করেন তিনি। এমআইটির অটিজম ও কমিউনিকেশন টেকনোলজি উন্নত করতে সহযোগিতা করেছিলেন রানা। তার মূল লক্ষ্য ছিল, মানুষের সঙ্গে কম্পিউটারের মিথষ্ক্রিয়ার প্রযুক্তির অগ্রগতি সাধন। তবে একপর্যায়ে এই প্রযুক্তি মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ উন্নত করার কাজে ব্যবহার করার বিষয়ে আগ্রহী হয়ে পড়েন রানা। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মানুষ যারা আবেগ প্রকাশে ব্যর্থ, তাদের সহায়তায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে গবেষণায় মনোনিবেশ করেন মিসরীয় এই নারী। এমআইটির মিডিয়া ল্যাবের এক দলের সঙ্গে কাজ করেন রানা। ওই দল ইমোশনাল হিয়ারিং এইড নামে আবেগ-অনুভূতি পড়তে সক্ষম এমন এক চশমা উদ্ভাবন করে। নিউ ইয়র্ক টইমস এই উদ্ভাবনকে ২০০৬ সালে তাদের বর্ষসেরা ১০০ উদ্ভাবনের মধ্যে রাখে।
ইংল্যান্ডে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টোরাল রিসার্চ শেষ করার সময় রানা ভেবেছিলেন, তিনি কখনোই দেশে বাস করা প্রিয়জনদের কাছে তার আবেগ প্রকাশ করতে পারবেন না। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ লুজিন নাসরাল্লাহ বলেন, ‘মিসরে পরিবার ও বন্ধুদের থেকে অনেক দূরে থাকা রানা চাইতেন, তার কম্পিউটার যাতে স্বজনদের কাছে তার আবেগ-অনুভূতি ঠিকঠাক প্রকাশ করতে পারে। এ সময় রানা সিদ্ধান্ত নেন, আরও বুদ্ধিমান প্রযুক্তি তৈরি করা দরকার যার মাধ্যমে আবেগ-অনুভূতি সহজে প্রকাশ করা সম্ভব। ২০০৯ সালে এমআইটির সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে এফেকটিভা নামের একটি সফটওয়্যার কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন রানা। আবেগ বোঝা ও প্রকাশে সক্ষম এমন প্রযুক্তি তৈরি করতে কম্পিউটার ভিশন, স্পিচ সায়েন্স, নানা ধরনের তথ্যসহ বেশ কটি বিষয় নিয়ে কাজ করা শুরু করে এই প্রতিষ্ঠান। লুজিন নাসরাল্লাহ বলেন, ‘অনেক পরিশ্রমের পর রানা এল কালিউবি ও তার দল উদ্ভাবিত প্রযুক্তি মানুষের মুখের অভিব্যক্তি এক মিনিটের মধ্যে যতবার পরিবর্তিত হয়, ততবার ঠিকঠাক পড়তে সক্ষম হয়।’
অ্যান্থনি ফেডেল
খুব বেশিদিন আগের কথা নয় যখন ঘরের বাইরে গান শুনতে হলে সঙ্গে করে গোটা প্লেয়ার, অডিও ক্যাসেট বা সিডি নেওয়া লাগত। এটি ছাড়া গান শোনার বিকল্প কিছু ছিল না। ২০০১ সালের আগে বহনযোগ্য এমপিথ্রি প্লেয়ার বাজারে এলো। তবে ঘরের বাইরে ব্যস্ত সময়ে গান শোনার জন্য ভালো মাধ্যম ছিল না এই যন্ত্র। একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে মার্কিন বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্টিভ জবস আরব আমেরিকান প্রকৌশলী অ্যান্থনি ফেডেলকে তার প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেন। অ্যাপলের নতুন বিশেষ এক প্রকল্পের প্রধান পদে ফেডেলকে বসানো হয়। সংগীত যাতে ব্যস্ত অবস্থায়ও ঝামেলাহীনভাবে মানুষ শুনতে পারে, তার বন্দোবস্ত করাই হলো এই প্রকল্পের কাজ। ফেডেলের নেতৃত্বে ২০০১ সালে অ্যাপলের কর্মকর্তারা নিয়ে এলেন আইপড। ‘আইপডের জনক’ হিসেবে অচিরেই পরিচিতি পাওয়া ফেডেল নতুন এই যন্ত্রের ১৮টি সংস্করণ তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এরপর অ্যাপলের সিইও স্টিভ জবস তাকে পরবর্তী প্রকল্পে যুক্ত করেন। নতুন ওই কাজ হলো আইপডের মতো একই রকম কাজ করতে সক্ষম এমন মোবাইল ফোন তৈরি করা। ফেডেল সিইও স্টিভ জবসের প্রত্যাশা অনুযায়ী বাজারে আনলেন আইফোন। এর মাধ্যমে সব সময় ইন্টারনেট সংযোগসহ উন্নত কম্পিউটার বহন করা সম্ভব হলো। তথ্য আদান-প্রদান হলো আগের চেয়ে সহজ। আইফোনের প্রথম তিন প্রজন্ম বিকাশে যুক্ত ছিলেন ফেডেল। প্রকৌশলী ও উদ্ভাবক ফেডেল ১৯৬৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা লেবানিজ আর মা পোলিশ। ১৯৯১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক পাস করেন ফেডেল। ইলেকট্রনিকস শিল্পে ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে থাকা ফেডেলের নামে রয়েছে তিন শতাধিক প্রযুক্তির পেটেন্ট। ২০১৪ সালে তাকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় রাখে টাইম ম্যাগাজিন।
মাইকেল ডিবেকি
১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের লেক চার্লস শহরে জন্মগ্রহণ করেন মাইকেল ডিবেকি। বাবা শাকের মরিস ও মা রাহিজা দাবাগি। দুজনেই লেবাননের নাগরিক। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে শাকের ও দাবাগি অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। ছোটবেলায় বাবার ফার্মেসিতে সময় কাটাতেন মাইকেল ডিবেকি। মায়ের সঙ্গে সেলাইয়ের কাজ করতে ও বাগানের পরিচর্যা করতে পছন্দ করতেন তিনি। ইলেকট্রিক্যাল মেশিন কীভাবে কাজ করে, তা নিয়েও একপর্যায়ে পড়াশোনা করেন ডিবেকি। ১৯৩২ সালে চিকিৎসক হন তিনি। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর সার্জিক্যাল কনসালট্যান্টস ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন ডিবেকি। ওই সময় সহকর্মীদের সঙ্গে মিলে সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিট উন্নত করেন তিনি। মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সেনাদের অস্ত্রোপচারের কাজ করত এই বিশেষ ইউনিট। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রথম এই ইউনিটকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সে সময় আহত সেনাদের চিকিৎসা দিত ওই বিশেষ ইউনিট। তবে পঞ্চাশের দশকে কোরিয়া ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় গুরুতর আহত মার্কিন সেনাদের সফল অস্ত্রোপচারের জন্য ব্যাপক পরিচিতি পান ডিবেকি ও তার সহকর্মীরা। চিকিৎসায় ডিবেকির অবদান কয়েক দশক ধরে অব্যাহত থাকে। ১৯৫৩ সালে ক্যারোটিড ধমনিতে রক্ত চলাচলে বাধা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সফলভাবে দূর করতে সক্ষম হন ডিবেকি। ১৯৬৩ সালে করোনারি বাইপাস সার্জারির ধারণা উন্নত করেন তিনি। এ ছাড়া টেলিমেডিসিন (কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা ফোনের সাহায্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া) ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন ডিবেকি। ১৯৬৫ সালে তিনিই প্রথম এমন এক ওপেন হার্ট সার্জারি করেন, যা স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেখতে পারেন দেশ-বিদেশের চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। ১৯৬৬ সালে আংশিক কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড প্রথম প্রতিস্থাপন করেন লেবানিজ বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ডিবেকি।
তাহের ইলগামাল
ইন্টারনেট সুরক্ষা নিয়ে এখন কম-বেশি সবাই চিন্তিত। বিশ্বের নামিদামি বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি এই সুরক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন মিসরীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ক্রিপ্টোগ্রাফার তাহের ইলগামাল। ইন্টারনেটে নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তি বিদ্যাকে ক্রিপ্টোগ্রাফি বলে। মেধাবী ক্রিপ্টোগ্রাফার হিসেবে বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছেন তাহের ইলগামাল। তাকে এসএসএলের জনকও বলা হয়। সিকিউর সকেটস লেয়ারকে সংক্ষেপে এসএসএল বলা হয়। এর মাধ্যমে ইমেইল, মেসেজসহ অন্যান্য অনলাইন বার্তা নিরাপদ রাখা হয়, যাতে প্রাপক ও প্রেরকের বাইরে সেসব বার্তা কেউ দেখতে না পারে। এই এসএসএল উন্নীতকরণে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখায় ইলগামালকে এটির জনক উপাধি দেওয়া হয়। ক্রিপ্টোগ্রাফি নিয়ে আরও উল্লেখযোগ্য কাজ রয়েছে ইমগামালের। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মডুলাসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ও সফটওয়্যার ডেভেলপার রিচার্ড গার্ডনার জানান, ১৯৮৪ সালে ‘এ পাবলিক কি ক্রিপ্টোসিস্টেম অ্যান্ড এ সিগনেচার স্কিম বেসড অন ডিসক্রিট লগারিদমস’ নামে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন ইলগামাল। তার এই গবেষণাপত্র ইলগামাল ডিজিটাল সিগনেচার অ্যালগরিদমের ভিত্তি। ১৯৭৭ সালে মিসরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক পাস করেন ইলগামাল। পরে ১৯৮১ ও ১৯৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ থেকে যথাক্রমে স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ছোটবেলা থেকে গণিতের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ ইলগামালের। গণিতে না করে তড়িৎ প্রকৌশলে পিএইচডি করার বিষয়ে ইমগামাল বলেন, ‘গণিতের ব্যবহার সবচেয়ে নান্দনিকভাবে করেছে ক্রিপ্টোগ্রাফি। গণিতের এমন ব্যবহার আমি অন্য কোথাও দেখিনি।’
মোস্তাফা আল-সায়েদ
মিসরের জিফটা শহরে জন্মগ্রহণ করেন মোস্তফা আল-সায়েদ। ১৯৫৩ সালে রাজধানী কায়রোর আইন শামস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়নে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে রসায়নে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন মোস্তাফা। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবদন্তি রসায়নবিদ গিলবার্ট নিউটন লুইসের শেষ ছাত্র মাইকেল কাশার সঙ্গে কাজ করেছিলেন মোস্তাফা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পোস্ট-ডক্টোরাল গবেষক হিসেবেও কাজ করেন তিনি। মোস্তাফা এ সময়ের সামনের সারির ন্যানোসায়েন্স গবেষক। তিনি ও তার গবেষণা দল রসায়ন শাস্ত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। ন্যানোস্কেলে বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও আচরণ বুঝতে লেসার স্পেকট্রোস্কপিক প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানবিষয়ক সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের সদস্য নির্বাচিত হন মোস্তাফা।
