উনিশ দিন কারাবাসের পর হৃদয় মন্ডল মুক্তি পেয়েছেন। জামিনে মুক্তি পেয়েই তিনি বলেছেন শান্তির কথা। যাদের কারণে তার এই কারাবাস, মুন্সীগঞ্জের আলোচিত এই বিজ্ঞান শিক্ষক তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন। বলেছেন, বয়স কম বলে তারা হয়তো ভুল করেছে। তাহলে আর কী! এ ঘটনার তো এখানেই শেষ, নাকি? মধুরেণ সমাপয়েৎ।
কিন্তু, আসলেই কি তা-ই?
একটার পর একটা এই রকম ঘটনা ঘটে, ফেইসবুক সরগরম হয়ে ওঠে, সুশীলরা কখনো কান ধরে উঠবস করার সেলফি আপলোড করেন, কখনো টিপ পরা প্রতীকী ছবি, কখনো বা ‘তাহলে আমাকেও গ্রেপ্তার করা হোক’ লেখা প্রতিবাদ ভাসে তাদের প্রোফাইলে। তারপর শ্যামলকান্তি, হৃদয় মন্ডলদের মুখে শান্তির বাণীতে ‘শান্তিপূর্ণ সমাধান’ হয়ে যায়।
তবে আসল সমস্যাটা রয়েই যায়! এই সর্বসাম্প্রতিক ঘটনাবলির কথাই ধরা যাক না-স্কুলের গন্ডিতে ঘটে যাওয়া তিনটি ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে সারা দেশে! মুন্সীগঞ্জের হৃদয় ম-লের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিজ্ঞান ক্লাসে তিনি ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন, তাতে এমনই আঘাত পেয়েছে ৯০ শতাংশ মুসলিমের দেশে সংখ্যাগুরুর ধর্মীয় অনুভূতি যে তাকে জেলখানায়ই পুরতে হয়েছে! আর নওগাঁর আমোদিনী পালের অপরাধ, ‘হিজাব পরার কারণে’ তিনি পিটিয়েছেন স্কুলের মেয়ে শিক্ষার্থীদের। কপাল ভালো, তাকে এখনো কারাদর্শন করতে হয়নি, তবে কারণ দর্শানোর একখানা নোটিস পেয়েছেন তিনি। মিরসরাইয়ের তুষার কান্তিকে একই রকম একটা অভিযোগ তুলে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে পদত্যাগপত্র। সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত হৃদয় ম-ল মুক্তি পেয়েছেন, আমোদিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগটাও মিথ্যা প্রমাণিত হচ্ছে, তুষার কান্তিও হয়তো ফিরে পাবেন তার পদ। কিন্তু, আসল সমস্যাটা রয়েই যাবে আড়ালে! কেউ খুঁজে দেখবে না, কেন এমন হচ্ছে বারবার?
অন্তর্জালের জগতে উড়ে বেড়ানো দশম শ্রেণির ক্লাসে জনৈক ছাত্রের সঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মন্ডলের কথোপকথনটার দিকেই নজর দেওয়া যাক। ছাত্রটির যদি বিশেষ উদ্দেশ্য না থাকত, তাহলে এই কথোপকথনটি হতে পারত শিক্ষক-ছাত্রের এক আদর্শ আলাপচারিতা। মনে হতে পারত, কোমলমতি এক শিক্ষার্থী বিজ্ঞানের ভুল পাঠ নিয়ে শিক্ষকের সঙ্গে যুক্তি বিনিময় করছে। আমাদের শৈশবে শ্রেণিকক্ষে এই রকম আলাপচারিতার কথা ভাবাই যেত না।
শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের জ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ করছে, শুধু তা-ই নয় তাকে পরামর্শ দিচ্ছে কী পড়তে হবে, এ তো ছিল এক অকল্পনীয় ভাবনা! আবহমান কাল ধরেই এ দেশে ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ এমন এক স্তরে ছিল, যে শ্রেণিকক্ষে তার কথাই ছিল আইন। অভিভাবকরা অধিকাংশই নিরক্ষর ছিলেন, আর বিদ্যাশিক্ষা পদ্ধতিও ছিল গুরুমুখী। তাই গুরুর সঙ্গে এভাবে প্রকাশ্যে দ্বিমত প্রদর্শন গ্রহণযোগ্য ছিল না। এমন ঘটনার অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া ছিল গুরুর হাতে শিক্ষার্থীর বেত্রদ- লাভ; তারপর বাড়িতে এই ঘটনার উল্লেখ করতে গেলে বাপের হাতেও হয়তো খেতে হতো আরও দু-চার ঘা! শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্কের পুরনো অবস্থাই ভালো ছিল, নাকি এখনকার এই শিক্ষার্থী-স্বাধীনতা, সেটা একটা পৃথক ডিসকোর্স হতে পারে।তবে চিন্তার বিষয়টা অন্য খানে। শিক্ষককে উদ্দেশ্যমূলকভাবে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে, সেই প্রশ্নোত্তর বন্ধুকে দিয়ে রেকর্ড করিয়ে, তার ওপর ভিত্তি করে প্রধান শিক্ষকের কাছে শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা এত বড় পরিকল্পনা যিনি করেছেন, তাকে কোমলমতি ভাবার কোনো সুযোগ নেই। যারা এটা বাস্তবায়ন করেছে, তাদেরও কি আসলে কোমলমতি ভাবা যায়? আরও অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও জরুরি।
প্রথমত, হৃদয় মন্ডলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি রেকর্ডিংয়ের ভিত্তিতে। দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কি শ্রেণিকক্ষে মোবাইল ফোন আনতে পারে?
দ্বিতীয়ত, প্রধান শিক্ষকের কাছে যখন এই অভিযোগ দেওয়া হলো, তখন কি তিনি ওই শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করেছেন, কেন সে মোবাইল নিয়ে স্কুলে এসেছে, আর কেনই বা রেকর্ড করেছে?
তৃতীয়ত, দুই দিন পরে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ‘অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণ’ও হৃদয় ম-লের শাস্তি দাবি করে স্কুল ঘেরাও করেছে। এই ‘অভিভাবক ও স্থানীয় জনতা’ কারা?
আসলে এই জনতার চাপেই প্রধান শিক্ষক তার বিরুদ্ধে মামলা করতে বাধ্য হয়েছেন। মামলার বাদী হয়েছে স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির একজন কর্মচারী। বাংলাদেশ দ-বিধির ২৯৫ (ক) ধারা অনুযায়ী।
সেই ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিকদের কোনো শ্রেণির ধর্মীয় অনুভূতিতে কঠোর আঘাত করার উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছাকৃতভাবে ও বিদ্বেষাত্মক কথিত বা লিখিত শব্দাবলির সাহায্য বা দৃশ্যমান কল্পমূর্তির সাহায্যে উক্ত শ্রেণির ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করে বা করার উদ্যোগ করে, তবে উক্ত ব্যক্তি যে কোনো বর্ণনার কারাদন্ডে (যাহার মেয়াদ দুই বৎসর পর্যন্ত হইতে পারে) বা অথর্দন্ডে বা উভয়দন্ডে দন্ডিত হইবে।’ এই ধারা অনুসারে ‘স্বেচ্ছাকৃতভাবে’ ধর্ম অবমাননা অপরাধ, কিন্তু যে তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এই মামলাটি দাঁড়িয়ে, সেই কথোপকথন শুনলে পরিষ্কার বোঝা যায় যে হৃদয় স্যার তার ক্লাসে বিজ্ঞান নিয়েই কথা বলছিলেন, ধর্ম নিয়ে কোনো কথা তিনি স্বেচ্ছায় বলেননি। বরং অত্যন্ত অপ্রাসঙ্গিকভাবে ছাত্রটি বারবার সেই প্রসঙ্গ তোলায় বাধ্য হয়ে তিনি কিছু জবাব দিয়েছেন মাত্র। জবাবে ধর্ম সম্পর্কে তিনি অবমাননাকর কিছু বলেছেন কি না, এই প্রসঙ্গটিই তাই এখানে অবান্তর।
এছাড়া স্কুলের ওই কর্মচারী তো এখানে কোনো পক্ষ নন, তার ঘটনাটি জানতে পারারই কথা নয়। তারপরও পুলিশ কেন মামলাটি আমলে নিল? কেনই বা বিচারিক হাকিম, জজ আদালত শুরুতে তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করল?
এই সব প্রশ্নের উত্তর আসলে একই সূত্রে গাঁথা। ‘তৌহিদী জনতা’র ভয়। ফেইসবুকে একটা ইশারা, মসজিদের মাইকে শুধু একটা ঘোষণার অপেক্ষা, তাহলেই এই তৌহিদী জনতার অনুভূতি এমন প্রবলভাবে জেগে উঠছে যে তারা হাজির হয়ে যাচ্ছেন হিন্দু পাড়ায় আগুন দিতে, মন্দির ভাঙতে এমনকি স্কুল পর্যন্ত ঘেরাও করতে!
অস্বীকার করার উপায় নেই এই মানুষগুলো আমাদের সমাজেরই অংশ, এবং এদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এত বাড়ছে যে, প্রধান শিক্ষক থেকে পুলিশ, এমনকি বিচারিক হাকিম পর্যন্ত এই তৌহিদী জনতার ভয়ে ভীত! আর অন্যরাও সুযোগ নিচ্ছে জনতার একই ক্রমবর্ধমান আবেগের। নওগাঁ কিংবা মিরসরাইয়ের স্কুলে স্কুল-পোশাক না পরা নিয়ে শুরু হওয়া ঘটনাকে হিজাবের রং চড়িয়ে প্রচার করা সেই সুযোগসন্ধানীদেরই কাজ।
এই ভয়ের সংস্কৃতি এতই প্রবল হয়ে উঠেছে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির নেতাকেও বলতে হয় নব্বই শতাংশ মুসলমানের দেশে ধর্ম নিয়ে স্পর্শকাতর কথা বলা উচিত হয়নি! ফেইসবুক-টকশোর কল্যাণে সর্বজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া পন্ডিতের চোখেও হিজাবের গুজব ছড়িয়ে এই আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়াটাকে ছাপিয়ে বড় অপরাধ মনে হচ্ছে স্কুল ড্রেস না পরে আসায় শিক্ষকের শাসন করা!
‘নব্বই শতাংশে’র এই পাটিগণিত আর ‘তৌহিদী জনতা’র ভয় কেন এত জোরালো হচ্ছে? এখন সময় এসেছে সেটা নিয়ে ভাবার; গবেষণা করে বের করার, গণমানসে এই মনোভাব কেন এত জোরালো হচ্ছে আর তার প্রতিকারই বা কী?
সেটা করতে না পারলে বিচ্ছিন্নভাবে একজন হৃদয় মন্ডল বা আমোদিনী পাল বা তুষার কান্তি বড়ুয়ার জন্য সংহতি জানানো আসলে হবে অরণ্যে রোদন। তাতে হৃদয় মন্ডলদের জামিনে মুক্তি মিলবে বটে, কিন্তু মামলার বোঝা পিঠে নিয়ে আরও মিইয়ে যাবে তাদের কণ্ঠ, এক সময় বাধ্য হয়ে দেশ ছাড়ার চিন্তা করতে হবে তাদের। যদিও এই বাংলাদেশ মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টানসহ অন্যসব জাতি-নৃগোষ্ঠীরও।
লেখক অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
