রিজার্ভের চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ের করা মামলা খারিজ হয়ে গেছে বলে ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য পুরোপুরি সত্য নয় বলে জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, রিজার্ভ চুরির মামলা খারিজ হয়নি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘৮ এপ্রিল নিউইয়র্ক কাউন্টি সুপ্রিম কোর্ট আলোচ্য মামলার আংশিক রায় ঘোষণা করে। ২০২১ সালের ১৪ জুলাই অনুষ্ঠিত শুনানির ভিত্তিতে ওই রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত ২০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি ক্যাসিনো প্রতিষ্ঠানকে (ব্লুমবেরি ও ইস্টার্ন হাইওয়ে) অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে আদালত কিম অংয়ের অব্যাহতির আবেদন নাকচ করে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিযোগের জবাব দিতে বলা হয়েছে।’
তা ছাড়া, গত ১৪ অক্টোবর শুনানি সংশ্লিষ্ট আলোচ্য মামলার অন্যতম বিবাদী রিজল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন-আরসিবিসি, লরেঞ্জো তান ও রাউল তানের বিষয়ে আদালত এখনো কোনো রায় দেয়নি বলেও জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র।
সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘ইতিপূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্র্তৃক যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কোর্টে দায়ের করা মামলায় আরসিবিসির অব্যাহতির আবেদন “ফোরাম নন-কনভেনিয়েন্স ডকট্রিন” অনুযায়ী খারিজ করা হয়েছিল। ওই আদেশে উল্লেখ করা হয়, আলোচ্য চুরি নিউইয়র্কে অবস্থিত মার্কিন প্রতিষ্ঠান ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ক হতে সংঘটিত হয় এবং জালিয়াতির মাধ্যমে পেমেন্ট অর্ডার, বিভিন্ন করেসপনডেন্ট অ্যাকাউন্টে চুরি করা অর্থের লেনদেন ও এসব অ্যাকাউন্ট থেকে দেশের বাইরে অর্থ প্রেরণ সবই নিউইয়র্কে সংঘটিত হওয়ায় বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।’
এই বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়ের করা মামলার মূল আসামি আরসিবিসির অব্যাহতির আবেদনের বিষয়ে নিউইয়র্ক আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে ইতিবাচক রায় দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছে নিউইয়র্কে নিয়োজিত বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনি প্রতিষ্ঠান। যদিও ফিলিপাইনের এনকোয়ারার ও ফিলস্টার পত্রিকা উল্লেখ করেছে, ‘পর্যাপ্ত এখতিয়ার নেই’ বলে তিন বছর আগে করা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ মামলা খারিজ করে দিয়েছে নিউইয়র্কের সুপ্রিম কোর্ট।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে ৩৫টি ভুয়া বার্তা পাঠিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে (ফেড) রাখা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নেয় একটি হ্যাকার গ্রুপ। এর মধ্যে ৩ কোটি ৪৬ লাখ ডলার উদ্ধার হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ উদ্ধারে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
চুরির ঘটনার তিন বছর পর ২০১৯ সালে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি), দেশটির ক্যাসিনোসহ ১৭ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং তিন চীনা নাগরিককে আসামি করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আদালতে মামলা করে বাংলাদেশ। অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসামিরা এই অর্থ চুরির ঘটনা ঘটিয়েছে। অন্যদিকে মামলার বিষয়বস্তু সংশ্লিষ্ট আদালতের এখতিয়ারের বাইরে উল্লেখ করে পাল্টা মামলা করে আরসিবিসিসহ সংশ্লিষ্টরা। তারা মামলাটি খারিজের আবেদনও করে।
বাংলাদেশের করা মামলায় পরের বছরের ২০ মার্চ রায় দেয় ওই আদালত। রায়ে বলা হয়, মামলাটি টেকনিক্যাল হওয়ায় তা আদালতে বিচারের জন্য গ্রহণ করা হয়নি। তবে এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট আরেকটি আদালতে মামলার সুযোগ রয়েছে বলে আদালত মতামত দেয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতেই ২০২০ সালের ২৭ মে কাউন্টি সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি করা হয়। এ মামলায়ও বিবাদী করা হয় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের।
এই রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশেও একটি মামলা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং বিভাগের যুগ্ম পরিচালক জুবায়ের বিন হুদা ২০১৬ সালের ১৫ মার্চ মতিঝিল থানায় মামলাটি করেন। অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনে দায়ের করা ওই মামলায় সরাসরি কাউকে আসামি করা হয়নি। তবে মামলার তদন্তের দায়িত্বে থাকা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এখনো আদালতে প্রতিবেদন দিতে পারেনি।
