রানিং স্টাফদের আকস্মিক কর্মবিরতির কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় গতকাল বুধবার দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার হয়েছেন যাত্রীরা। এই ধর্মঘটের কারণে সারা দেশে সকাল থেকে প্রায় ৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকে ট্রেন। রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে বেশ কয়েকটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করতে হয়েছে।
পেনশন থেকে মাইলেজ ভাতা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই সকাল ৬টা থেকে কর্মবিরতি শুরু করেন রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। ফলে সারা দেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এক কারণে ট্রেনের যাত্রা বাতিল করায় টিকিট ফেরত দেওয়া নিয়েও বিপাকে পড়েন যাত্রীরা।
লোকো মাস্টার বা ট্রেনচালক, সহকারী চালক, ট্রেনের গার্ড ও টিকিট পরিদর্শকদের (টিটি) মতো যে কর্মীরা নিয়মিত ট্রেন চলাচলের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বলা হয় রানিং স্টাফ।
এ ধরনের কর্মীরা দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করলে বা ১০০ মাইলের বেশি ট্রেন চালালে এক দিনের বেতনের সমান অর্থ রানিং ভাতা বা মাইলেজ হিসেবে পেয়ে আসছিলেন। আর অবসরে গেলে সেই ভাতার ৭৫ শতাংশ যোগ করে তাদের পেনশন হিসাব করা হতো।
দুপুর ১২টার দিকে কমলাপুর রেলস্টেশনে রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলামের সঙ্গে রেলের রানিং স্টাফ ও কর্মচারীদের বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘মাইলেজের বিষয়টি নিয়ে আমি অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ে কথা বলেছি। যে বিজ্ঞপ্তির কারণে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটি বাতিল করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘১৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী আমাদের সময় দিয়েছেন। আমি এবং রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব। সেদিনের মধ্যে মাইলেজ সুবিধাসহ সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আগে যে সুযোগ-সুবিধাগুলো শ্রমিকরা পেতেন, সেগুলো পুনরায় তারা ফেরত পাবেন।’
ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় রাজধানীর কমলাপুর স্টেশনে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য আসা যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন। দুপুর ১২টা পর্যন্ত কমলাপুর রেলস্টেশনের টিকিট কাউন্টারে টিকিট জমা দিয়ে টাকা ফেরত নেওয়ার জন্য যাত্রীদের দীর্ঘ লাইন ছিল। রোজা রেখে ওই অবস্থার শিকার হয়ে বিড়ম্বনার কথা বলেন যাত্রীরা।
আমাদের চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায়, প্রায় আট ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর বিকেল ৩টা থেকে পুনরায় ট্রেন চলাচল শুরু হলে যাত্রীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের ম্যানেজার রতন কুমার চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, কর্মবিরতি প্রত্যাহারের পর বেলা ২টা ৫৭ মিনিটে সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে যায়। ট্রেনটি সকাল ৭টায় যাত্রা করার কথা ছিল। তিনি জানান, এ সময় মোট চারটি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। এগুলো হলো সিলেটগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস, ময়মনসিংহগামী বিজয় এক্সপ্রেস, চাঁদপুরগামী সাগরিকা এক্সপ্রেস ও ঢাকাগামী কর্ণফুলী এক্সপ্রেস।
রাজশাহীর নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, রাজশাহী স্টেশন থেকে দুপুর পর্যন্ত কোনো রুটে ট্রেন ছেড়ে যায়নি। সকাল থেকে কোনো ট্রেন স্টেশনে আসেনি। এ সময় রাজশাহীর ৪টি ট্রেনের যাত্রা বাতিল করা হয়। এসব ট্রেনের যাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন হাজার।
হঠাৎ ট্রেন বন্ধের ঘোষণা আসায় সকালে হাজারো যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন। একসঙ্গে একাধিক ট্রেনের যাত্রীতে স্টেশন এলাকা ভরে ওঠে। ঢাকাগামী সিল্কসিটি ট্রেনের যাত্রী জাফর আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এইটা কোনো সিদ্ধান্ত হলো। আমরা স্টেশনে এসে জানতে পারলাম ট্রেন যাবে না। আমি পরিবার নিয়ে, ছোট বাচ্চা নিয়ে সকালে কষ্ট করে আসলাম, এখন শুনছি যাওয়া যাবে না। এটা কি মগের মুল্লøুক যে ইচ্ছে হলো আর যাত্রা বাতিল করে দিলাম।’
দুপুরে ধর্মঘট প্রত্যাহার হওয়ায় আবারও সব রুটে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়। রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার আবদুল করিম জানান, সকালেই বনলতা, সিল্কসিটি, সাগরদাঁড়ি এবং মধুমতী ট্রেন যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনোটিই যায়নি। পশ্চিম রেলের ১৭ জোড়া ট্রেনই বন্ধ ছিল। যাত্রা বাতিল হওয়ায় যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া হচ্ছে। তবে, এক দিনে সব টাকা দেওয়া সম্ভব নয়।
পশ্চিম রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার বলেন, ‘আমরা যাত্রীদের টিকিট রিফান্ড করে (ফেরত) দিচ্ছি। ২০ শতংশ টিকিট মনে হয় এখনো রিফান্ড নিতে পারেনি। আমরা আরও ৬ দিন সময় দিয়েছি। এর মধ্যেই তারা এসব টাকা ফেরত নিতে পারবে।’
পার্বতীপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি জানান, রেল কর্তৃপক্ষ দিনাজপুর-সান্তাহারগামী দোলনচাঁপা ও রাজশাহী চিলাহাটিগামী বরেন্দ্র এক্সপ্রেস ট্রেনের যাত্রা বাতিল করে। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে পার্বতীপুর থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস ট্রেন পঞ্চগড়ের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। সকাল ৬টা ২৫ মিনিটে ট্রেনটির যাত্রার সময় ছিল।
যাত্রীদের অভিযোগ, শিডিউল বিপর্যয়ে পড়া ট্রেনের টিকিটের টাকা ফেরত দিচ্ছে না রেল কর্তৃপক্ষ। তবে পার্বতীপুর রেলওয়ে স্টেশনমাস্টার শওকত আলী বলেন, টিকিটের টাকা যাত্রীদের ফেরত দেওয়া হবে।
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুর রেলস্টেশনেও টিকিটের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। একটি বেসরকারি সাহায্য সংস্থায় (এনজিও) কর্মরত শরিফুল ইসলাম বলছিলেন, লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রেনের টিকিট ফেরত দিচ্ছেন। হঠাৎ করে এভাবে ট্রেন ধর্মঘট করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
হঠাৎ করে ট্রেন ধর্মঘটের ফলে যারা বিকল্প যানবাহনের জন্য ছুটছিলেন তারাও পড়েন বিপাকে। ইজিবাইক (অটো) চালকেরা ভাড়া বাড়িয়ে দেন। দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়ার বাসিন্দা খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাকে জরুরিভাবে পার্বতীপুরে যেতে হবে। স্টেশনে এসে দেখি ট্রেন বন্ধ। তাই বাধ্য হয়ে ইজিবাইকে করে যেতে হবে। আগে পার্বতীপুর পর্যন্ত ইজিবাইকের ভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। কিন্তু আজ আমার কাছে চাওয়া হয়েছে ৮০ টাকা।’
