রমনা বটমূলে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে দুই দশক আগে বোমা হামলার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি) নেতা মুফতি শফিকুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গত বৃহস্পতিবার রাতে কিশোরগঞ্জের ভৈরব এলাকায় অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। র্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার এড়াতে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি ছদ্মবেশে ছিলেন।
হুজিবি নেতা শফিকুর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের জনসভায় গ্রেনেড হামলা মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এবং ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলারও চার্জশিটভুক্ত আসামি।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে তার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন সংস্থাটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
র্যাবের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২১ বছর আগে রমনার বটমূলে হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী শফিকুর রহমান নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত শফিকুর হরকাতুল জিহাদের (বি) প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি হরকাতুল জিহাদের আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ছিলেন শুরা সদস্য।
দেওবন্দ থেকে করাচিতে গিয়ে যেভাবে জঙ্গি দলে : কিশোরগঞ্জের ভৈরবে নিজ গ্রামে পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর মাদ্রাসায় পড়াশোনা শুরু করেন শফিকুর। ১৯৭৫ সালে ঢাকার চকবাজারে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত হেদায়ায় পড়াশোনা করেন। এরপর পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত দাওরায়ে হাদিস (টাইটেল) পাস করে দেশে ফিরেন।
শফিকুর ১৯৮৭ সালে পাকিস্তানের করাচিতে ইউসুফ বিন নুরী মাদ্রাসার ফতোয়া বিভাগে ভর্তি হন। সেখানে তিনি তিন বছরের ইফতা (ফতোয়া) কোর্স সম্পন্ন করেন। করাচির নিউ টাউনে পড়াশোনা করার সময় মুফতি হান্নানের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। হান্নানও সেখানে পড়তে গিয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালে পাকিস্তান থেকে শফিকুর আফগানিস্তানে চলে যান। সেখানে তালেবানদের পক্ষে যুদ্ধও করেন তিনি। আফগানিস্তানে থাকা অবস্থায় তিনি জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার চিন্তাভাবনা করেন। ওই বছরের শেষের দিকে দেশে ফিরে তিনি ঢাকার খিলগাঁওয়ে একটি মাদ্রাসায় পার্টটাইম শিক্ষকতা শুরু করেন।
হুজিবি গঠন : শফিকুর আফগানিস্তান থেকে দেশে এসে অন্যদের সঙ্গে ‘হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি)’ নামে একটি জঙ্গি সংগঠন গড়ে তোলার চিন্তা করেন জানিয়ে র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯০ সালে সমমনাদের সঙ্গে হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ (হুজিবি) সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন শফিকুর। ১৯৯০ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি ‘হরকাতুল জিহাদ (বি)’র প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি হুজিবির আমির ও ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত হরকাতুল জিহাদের শুরা সদস্য ছিলেন তিনি।
যেভাবে আত্মগোপনে : রমনা বটমূলে হামলার পর শফিকুর আত্মগোপনে থেকে সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন। ২০০৮ থেকে নরসিংদীতে একটি মাদ্রাসায় তার সর্বশেষ অবস্থানের কথা জানা ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তার শফিকুর নরসিংদী থাকাকালীন পরিচয় গোপন করে আবদদুল করিম নাম ব্যবহার করে ওই এলাকার চরে অবস্থিত একটি মসজিদে মাসিক ৫ হাজার টাকা বেতনে ইমামতির চাকরি নেন। এরপর ইমামতির আড়ালে তিনি ধর্মের নামে বিভ্রান্তিমূলক অপব্যাখ্যা প্রচার করতেন।
লুকিয়ে থাকা অবস্থায় শফিকুর ‘অত্যন্ত কৌশলে’ মাঝেমধ্যে বিভিন্ন স্থানে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতেন। বিশেষ করে তার ছেলের সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা করতেন তিনি। গত ২১ বছর এভাবেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। সম্প্রতি র্যাবের গোয়েন্দাদের নজরে আসার পর গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
যেসব মামলায় অভিযুক্ত শফিকুর : ২০০১ সালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বৈশাখ বরণের অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় ১০ জন নিহত হয়। দেশে অসাম্প্রদায়িক চেতনার মূলে আঘাত হানতে মৌলবাদী গোষ্ঠী সেই হামলা চালিয়েছিল বলে পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে। হামলার পর ওই দিনই নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র চন্দ রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। দুই মামলায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের (হুজি) শীর্ষ নেতা মুফতি আবদুল হান্নান ও শফিকুরসহ ১৪ জঙ্গিকে আসামি করা হয়। ঘটনার প্রায় আট বছর পর দুই মামলায় ১৪ জনকে আসামি করে ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর ঢাকার আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। হত্যা মামলায় ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দায়রা জজ রুহুল আমিন প্রধান আসামি মুফতি হান্নানসহ আটজনের মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে মুফতি হান্নানের সঙ্গে শফিকুরও ছিলেন। অন্যরা হলেন আকবর হোসেন, আরিফ হাসান সুমন, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা মো. তাজউদ্দিন, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম হাওলাদার ও আবদুল হাই। দণ্ডিত আসামিদের মধ্যে তাজ উদ্দিন, বদর, হাফেজ জাহাঙ্গীর, শফিকুল ও আবদুল হাই পলাতক ছিলেন।
রমনায় হামলার তিন বছর পর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট পল্টনে শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। তাতে ২৪ জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হয়। ওই ঘটনায় ঢাকার মতিঝিল থানায় একটি হত্যা ও হত্যাচেষ্টার সহযোগিতাসহ দুটি পৃথক মামলা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুন্যাল ১৯ জনকে মৃত্যুদ- এবং মুফতি শফিকুর রহমানসহ ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- দেয়।
র্যাব জানায়, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদর থানাধীন বৈদ্যের বাজারে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়াসহ পাঁচজন নিহত এবং কমপক্ষে শতাধিক লোক আহত হন। ওই হত্যা মামলারও চার্জশিটভুক্ত শফিকুর রহমান আসামি। তার বিরুদ্ধে ভৈরব থানায় মোট ছয়টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে।
