মিসাইল হামলায় রাশিয়ার ফ্ল্যাগশিপ যুদ্ধজাহাজ মস্কভা ডুবে গেছে ইউক্রেনের এমন দাবির পর এবার দেশটির রাজধানী কিয়েভে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউক্রেনের দক্ষিণ ও পূর্বে যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য রুশ সৈন্যরা কিয়েভের আশপাশের এলাকা থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর গতকাল শুক্রবার আবারও সেখানে বিস্ফোরণ চলছে। এর আগে ইউক্রেন দাবি করে, তারা নেপচুন অ্যান্টিশিপ মিসাইল দিয়ে মস্কভা মিসাইল ক্রুজারে আঘাত করে।
সোভিয়েত আমলের জাহাজটি আগুন ও বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর বন্দরে নিয়ে যাওয়ার সময় ডুবে যায়। তবে তা ইউক্রেনের হামলার কারণেই হয়েছে কিনা, এমন কিছু নিশ্চিত করেনি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। জাহাজে থাকা ৫০০ জনেরও বেশি ক্রুকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা। রাশিয়ার তথ্য অনুযায়ী জাহাজটিতে আগুন লেগে গিয়ে গোলাবারুদ বিস্ফোরিত হয়। পরে বন্দরে নিয়ে যাওয়ার সময় ডুবে যায়। গত ৪০ বছরে এই প্রথম কোনো নৌবাহিনীর এত বড় ফ্ল্যাগশিপ জাহাজ ডুবে গেল।
রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি অনুযায়ী গোলাবারুদ থেকে সৃষ্ট বিস্ফোরণে মস্কভার কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছিল। এরপর বন্দরের দিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় উত্তাল সাগরে এটি ডুবে যায়। এ ঘটনায় পশ্চিমাদের মত কিছুটা ইউক্রেনিয়ানদের দাবির সপক্ষে। ‘মোটামুটি আত্মবিশ্বাসের’ সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে ইউক্রেনের দাবিই সত্য। এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এমনটা জানিয়েছে সিএনএন।
মস্কভা রাশিয়ার নৌবাহিনীর গর্বের যুদ্ধজাহাজ ছিল। এতে ছিল জাহাজ বিধ্বংসী ও বিমান বিধ্বংসী মিসাইল, টর্পেডো, নেভাল গান ও মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। স্বভাবতই এতসব অস্ত্র চালনার জন্য জাহাজটিতে প্রচুর গোলাবারুদের মজুদ ছিল। ফকল্যান্ড যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের হাতে একটি ক্রুজার হারায় আর্জেন্টিনা। ১৯৮২ সালের ২ মে ব্রিটিশ নিউক্লিয়ার-সাবমেরিন এইচএমএস কনকুয়েরর টর্পেডো ছুড়ে আর্জেন্টিনার ক্রুজার জেনারেল বেলগ্রানোকে ডুবিয়ে দেয়। জেনারেল বেলগ্রানো আর মস্কভা একই আকৃতির ক্রুজার যুদ্ধজাহাজ। দুটোর দৈর্ঘ্যই প্রায় ৬০০ ফুট (১৮২ মিটার) ও ভর ১২ হাজার টন। তবে মস্কভার ক্রুর সংখ্যা ৫১০ জন থাকলেও জেনারেল বেলগ্রানোতে মোট ১১০০ নাবিক ছিলেন। জেনারেল বেলগ্রানোর ৩২৩ জন ক্রু নিহত হয়েছিলেন। তবে মস্কভার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কারও নিহত হওয়ার তথ্য জানায়নি রাশিয়া।
এ ঘটনায় আর কিছু ক্ষতি না হলেও রাশিয়ানদের মনোবলে কিছুটা হলেও ঘাটতি তৈরি হবে। কৃষ্ণসাগরে মস্কভা ইউক্রেন যুদ্ধে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। হঠাৎ করে এটি হারানোয় তা রাশিয়ানদের জন্য এ যুদ্ধে একটি শূন্যতা হিসেবেই দেখা দেবে। ইউক্রেনের শিকার হোক বা স্রেফ দুর্ঘটনার কবলে পড়–ক; এ জাহাজডুবির ফলে এখন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষমতা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিতে পারে অনেকের মনে। যদি ইউক্রেনের মিসাইল সত্যিই জাহাজটিতে আঘাত করে, তার মানে দাঁড়াবে রাশিয়ার আকাশ-প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। আর দুর্ঘটনায় ডুবলে তার অর্থ রাশিয়ার এই জাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ড্যামেজ-কন্ট্রোল ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল ছিল। তবে ইউক্রেন যুদ্ধে এ জাহাজ হারানোর প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের বিশ্লেষকরা এ ঘটনাকে রাশিয়ার জন্য ছোট আঘাত বলে মনে করছেন। তাদের মতে, এ জাহাজটি থেকে মূলত ইউক্রেনের লজিস্টিকস সেন্টার ও এয়ারফিল্ডগুলোতে ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করা হতো। সেই একই কাজ রাশিয়া এখনো ভূমি থেকে ও আকাশপথে করতে পারবে। তবে তারা আরও মনে করেন, যদি এটি সত্যিই ইউক্রেনের হামলা হয়ে থাকে, তবে রাশিয়ান নৌবাহিনীকে এর অপারেশন নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
এদিকে কিয়েভ, দক্ষিণে খেরসন, পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভ এবং পশ্চিমে ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্ক শহরে বিস্ফোরণের পর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনী বলেছে, বন্দর শহর মারিওপোলের উত্তরে পোপাসনা এবং রুবিঝনে শহরে রাশিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বেশ কয়েকটি ট্যাঙ্ক এবং অন্যান্য যান ধ্বংস করা হয়েছে বলেও জানায় তারা। তবে এসব প্রতিবেদন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
