আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনে থাকা বিএনপি এবার রমজানেও নানা কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত। এবার ইফতারের রাজনীতির বাইরে দলের জেলা পুনর্গঠন কার্যক্রম, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের করা জাতীয় সরকারের প্রস্তাব নিয়ে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সমাবেশ, বিক্ষোভ কর্মসূচি, গুম-খুনের শিকার নেতাকর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে দলটি।
রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামনে আমাদের সময় খুবই কম। এ অবস্থায় রমজানে নানামুখী কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছি আমরা। এর মধ্যে জাতীয় সরকার নিয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে ফর্মুলা দিয়েছেন তা নিয়ে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে। এছাড়া দলের পুনর্গঠন, জনসম্পৃক্ত কর্মসূচিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি চলবে এই রমজানে। কারণ সরকার দেশের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। দেশ-বিদেশে সরকারের দুর্নীতি, অপকর্ম ফাঁস হয়ে পড়েছে। সরকারকে আর সময় দেওয়া যায় না।’ তিনি বলেন, ‘সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যে দুর্নীতি চলছে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার বিএনপি। সংবাদ সম্মেলন করে জনগণকে জানানোর পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে। ইস্যুভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি থাকবে রমজানে। বিশ^ স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে আমরা র্যালি করেছি। আলোচনা সভা করেছি।’
বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ২০১৬ সালে সর্বশেষ ইফতার আয়োজনে অংশ নেন। এরপর ২০১৭ সালে তিনি লন্ডনে ছিলেন। আর ২০১৮ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে ছিলেন। করোনা মহামারীর মধ্যে ২০২০ সাল থেকে তিনি সরকারের নির্বাহী আদেশে মুক্ত হয়ে গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় আছেন। ২০১৯ সালে বিএনপি সর্বশেষ ইফতার আয়োজন করেছিল। গত দুই বছর করোনার কারণে বিএনপি ইফতার পার্টির আয়োজন করেনি। এবার প্রথম রোজায় রাজধানীর ইস্কাটনের লেডিস ক্লাবে এতিম, আলেম-ওলামাদের সম্মানে ইফতার পার্টি দেয় এবং কূটনীতিকদের সম্মানে হোটেল ওয়েস্টিনে ইফতার পার্টি করেছে। সামনে ২০ এপ্রিল রাজনীতিকদের সম্মানে হোটেল লেকশোরে এবং ২৮ এপ্রিল পেশাজীবীদের সম্মানে লেডিস ক্লাবে ইফতারের আয়োজন করবে। এরই মধ্যে আমন্ত্রণপত্র পাঠানোর কাজ চলছে। এছাড়া সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যে ইফতার পার্টির আয়োজন করবে তাতে অংশ নেবেন বিএনপি নেতারা।’
এদিকে প্রতিদিনই বিভিন্ন কর্মসূচি থাকছে বিএনপির। রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে গত শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করেছে বিএনপি। একই সময়ে সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে তেজগাঁও কলেজ শাখা ছাত্রদল নেতা জাকির হোসেনের গুমের প্রতিবাদে সভা করে বিএনপি সমর্থিত একটি সংগঠন। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ^র চন্দ্র রায়। অন্যদিকে শেরেবাংলা নগরে দলের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শ্রদ্ধা নিবেদন করে সিলেট জেলা বিএনপির নবগঠিত কমিটি। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এছাড়া বিকেলে রাজধানীর ইস্কাটনের লেডিস ক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের উদ্যোগে খুন, গুমের শিকার নেতাকর্মীদের পরিবারের সদস্যদের মাঝে ঈদ উপহারসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ অনুষ্ঠানে বিএনপি মহাসচিব, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানসহ দলের ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন। একই সঙ্গে তেজগাঁওয়ে এক ইফতার মাহফিলে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অংশ নেন।
বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রমজানে প্রতি বছর আমরা দলের গুম, খুনের শিকার নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াই। এ বছর সেটা অব্যাহত আছে। ঈদের দিন দলের নেতারা গুম, খুনের শিকার নেতাকর্মীদের পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাবেন। নেতারা তাদের নিজ নিজ জেলায় কারাবন্দি নেতাদের পাশে দাঁড়াবেন। ইতিমধ্যে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বিষয়ে নেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন।’
গত রবিবার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির উদ্যোগে ইফতার মাহফিলের আয়োজন করা হয় সাঁতারকুল গ্রিনভিল আউটডোরসে। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন মির্জা ফখরুল। এর আগে সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অংশ নেন বিএনপি মহাসচিব।
বিএনপির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রমজান মাসে অনেকটা স্তিমিত থাকবে মাঠের রাজনীতি। তবে এবার ব্যতিক্রম। কারণ জনস¤পৃক্ত রাজনীতি নিয়ে এবার মাঠে থাকছেন তারা। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বগতি, হাওরের বাঁধ ভেঙে ফসলের ক্ষতি, ওয়াসার পানির কারণে ডায়রিয়ার মহামারীসহ মাঠে সোচ্চার রয়েছে বিএনপি।
তারা বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে একটি নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে ‘সরকারবিরোধী ঐক্য’ গঠন এই মুহূর্তে দলটির অন্যতম এজেন্ডা। ২০ এপ্রিল রাজনীতিবিদদের সম্মানে যে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হবে সেখানে জোট ও জোটের বাইরে থাকা ডান-বাম সব রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানানো হবে।
কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বাবুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে দেশে সবচেয়ে বেশি নিষ্পেষিত ও শোষিত হচ্ছেন কৃষকরা। ইতিমধ্যে তিনজন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। এছাড়া হাওর অঞ্চলে বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেছে কৃষকের ফসল। এসব অঞ্চলে আমরা কৃষক দলের নেতারা সফরে যাব। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করব।’
