মহাসড়কের জমি কেনাবেচাসহ ব্যাংকে বন্ধক দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গোলাম ফারুক নামে এক ব্যক্তি ও তার সহযোগীকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। গোলাম ফারুক একটি হত্যাচেষ্টা মামলারও আসামি। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে র্যাব-১-এর একটি দল তাদের গ্রেপ্তার করে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাবের অস্থায়ী মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি জানান, সম্প্রতি বাড্ডা থানাধীন মেরুল বাড্ডা এলাকায় জাল দলিল সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এক ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় আদালতে একটি নালিশি দরখাস্ত করেন একজন ভুক্তভোগী। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে বাড্ডা থানাকে তদন্তের নির্দেশ দেয়। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নিয়ে র্যাবও তদন্তে নামে। একপর্যায়ে র্যাব-১-এর একটি দল গত ১৪ এপ্রিল রাতে রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে গোলাম ফারুক এবং তার সহযোগী ফিরোজ আল মামুন ওরফে ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তারের পর র্যাবের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ফারুক ও ফিরোজ রাজধানীর বাড্ডায় হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তথ্য দেয়। এছাড়া মহাসড়কের জমি ক্রয়-বিক্রয় করে প্রতারণামূলকভাবে ব্যাংকে বন্ধক দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করার বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কেও মুখ খোলে।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাব কর্মকর্তা জানান, গত বছরের এপ্রিলে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মহাসড়কের জমি ব্যক্তি নামে নিবন্ধন, বিক্রয়, ব্যাংকে বন্ধক ও ব্যাংক কর্র্তৃক নিলামে বিক্রিচেষ্টার ঘটনার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। উক্ত ঘটনায় ভূমি মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। সেই তদন্তে উঠে আসে, একটি প্রতারক চক্র মহাসড়ক শ্রেণিভুক্ত সরকারি জমি কয়েকটি সরকারি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারি ভূমি ব্যক্তিমালিকানায় নিবন্ধন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নেয়।
জিজ্ঞাসাবাদে গোলাম ফারুকের দেওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে র্যাব কর্মকর্তা জানান, গোলাম ফারুক ২০০০ সাল থেকে গাড়ি আমদানিকারক হিসেবে তার ব্যবসা শুরু করেন। দেশের একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে আমদানিকৃত গাড়ি বিক্রি করে অর্থ পরিশোধ করার শর্তে তাকে ৭ কোটি টাকা ডিমান্ড লোন দেয়। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংক তাকে সম্পত্তি বন্ধক দেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করলে তিনি সরকারি জমিকে অসদুপায়ে ব্যক্তি নামে নিবন্ধন করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরার আজমপুর অংশের অধিগ্রহণ হওয়ার পূর্বের জমির মালিকের ছেলেকে খুঁজে বের করে ২০০৬ সালে তার নামে একটি জাল দলিল করেন। পরে সেই দলিলমূলে গোলাম ফারুক তার স্ত্রীর নামে ওই জমিটির আরেকটি ভুয়া দলিল করেন। পরে উক্ত জমি ওই বেসরকারি ব্যাংকে বন্ধক দিয়ে আরও ১৫ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নেন। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায় ২০১৩ সালে ব্যাংক অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে বন্ধকি জমি নিলামে বিক্রয় করার নোটিস জারি করলে ব্যাংক সরেজমিন গিয়ে দেখতে পায় সেটি সরকারি সম্পত্তি। এই প্রতারণা ঢাকতে তিনি আরও ‘ভ্রম সংশোধন দলিল’ করে পূর্বের বন্ধককৃত জমির দাগ নম্বর পরিবর্তন করে বর্ণিত মামলার বাদীর জমির দাগ নম্বর উল্লেখ করেন। তখন ব্যাংক সেই জমিতে বন্ধকি সম্পত্তির সাইনবোর্ড স্থাপনের চেষ্টা করলে উক্ত প্রতারণার বিষয়টি উন্মোচিত হয়।
র্যাব জানায়, গ্রেপ্তারকৃত গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে জমিজমা সংক্রান্ত, প্রতারণা, হত্যাচেষ্টা, এনআই অ্যাক্ট, জালিয়াতি ইত্যাদি অপরাধে রাজউকের একটি, একটি বেসরকারি ব্যাংক ৪টি ও সাধারণ ভিকটিম বাদী হয়ে ৩টিসহ মোট ৮টি মামলা রয়েছে। গোলাম ফারুকের বিভিন্ন অপকর্মের অন্যতম সহযোগী ফিরোজ। ফিরোজ উত্তরা এলাকায় বিভিন্ন অপরাধ বিস্তারে কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করে বলেও জানিয়েছেন র্যাব কর্মকর্তা।
