ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে তৃতীয় কোনো দেশের হস্তক্ষেপ মানেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা, এমনটা গত এক মাস ধরেই বলে আসছেন বিশ্লেষকরা। ইউক্রেনে রুশ অভিযান শুরু হওয়ার পর গোটা পশ্চিমা বিশ্ব ও যুক্তরাষ্ট্র একজোট হয়ে কিয়েভকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে। এই সহায়তার জন্য অস্ত্র উৎপাদনও বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনে যুক্তরাজ্যের সেনারা দেশটির সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। শুধু প্রশিক্ষণই নয়, রণাঙ্গনেও ইউক্রেনীয় সেনাদের পাশেই অবস্থান করছে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা।
তৃতীয় দেশের সেনাবাহিনীর এমন উপস্থিতির পরেও রাশিয়া কিন্তু অন্য কোনো দেশে হামলা চালায়নি। উল্টো একের পর এক হুমকি-ধমকির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে মস্কো। পশ্চিমা বিশ্বের পদক্ষেপের বিপরীতে মস্কোর এমন প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবার। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগরে রাশিয়ার সোভিয়েত আমলে নির্মিত ফ্ল্যাগশিপ মস্কভা ডুবে যাওয়ার ঘটনা, দেশটির জন্য ব্যাপক চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে। গত এক দশকে এত বড় সামরিক জাহাজ বিধ্বস্ত বা ডুবে যায়নি। তবে এর মধ্যেই ইউক্রেনের মিত্র দেশগুলোকে অস্ত্র সরবরাহ করার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করেছে রাশিয়া। দেশটি বলেছে, এতে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের মিত্র দেশগুলোর ‘অভাবনীয় পরিণতি’ হতে পারে। রাশিয়ার এ হুঁশিয়ারি নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোয় আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে কী ধরনের পরিণতি নিয়ে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে রাশিয়া।
রাশিয়ার এ হুঁশিয়ারি ভাবনায় ফেলেছে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে। রাশিয়া পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে বলে আবারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি। গত শুক্রবার সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়া পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে। বিশ্বকে এ জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’ প্রসঙ্গত, এর আগে রাশিয়াও দুইবার জানিয়েছে যে, তারা অস্তিত্বের সংকটে পড়লে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ করবে। জেলেনস্কি মস্কোর এমন হুমকিকে আমলে নিয়েই পরমাণু হামলার কথা তুলেছেন।
কয়েক দিন ধরে রাশিয়া ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলে দনেৎস্ক ও লুহানস্কে হামলা জোরদার করেছে। তবে গতকাল শনিবার কিয়েভ ও লাভিভে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। সম্প্রতি এসব এলাকায় রাশিয়া হামলা কিছুটা কমিয়েছিল। রাজধানী কিয়েভের পুলিশপ্রধান বলেছেন, তারা আশপাশ থেকে ৯০০ জন বেসামরিক নাগরিকের লাশ উদ্ধার করেছেন। বুচা শহরে প্রায় ৩৫০ মরদেহ পাওয়া গেছে। রাশিয়া বলেছে, কিয়েভের বাইরে বিমান ও জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানায় তারা হামলা চালিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিস্ফোরণের পর রুশ যুদ্ধজাহাজ মস্কভা ডুবে যাওয়ার কথা নিশ্চিত করে রাশিয়া। তবে রাশিয়া বলেছে, বন্দরে টেনে আনার সময় ঝোড়ো আবহাওয়ার কবলে পড়ে মস্কভা ডুবে যায়। এর কয়েক ঘণ্টা পর ক্ষেপণাস্ত্র কারখানায় হামলার কথা জানাল রাশিয়া। বিধ্বস্ত মারিওপোলে রাশিয়ার সেনাবাহিনী যুদ্ধাপরাধ লুকাতে মরদেহ সরিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইউক্রেনের কর্মকর্তারা। জাতিসংঘ বলেছে, যুদ্ধের কারণে ৫০ লাখেরও বেশি ইউক্রেনীয় গৃহহীন হয়ে পড়েছে। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। এ ভাঙনকে রাশিয়ার জন্য একটি ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয় বলে মনে করেন পুতিন। তারপর থেকে রাশিয়া দেখছে, সামরিক জোট ন্যাটো ধীরে ধীরে তাদের ঘিরে ফেলছে। সংগত কারণেই রাশিয়া তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ১৯৯৯ সালে চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ড ন্যাটোতে যোগ দেয়। ২০০৪ সালে যোগ দেয় বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, রোমানিয়া ও সেøাভাকিয়া। ২০০৯ সালে যোগ দেয় আলবেনিয়া। জর্জিয়া, মলদোভা বা ইউক্রেনেরও ন্যাটোতে যোগ দেওয়া আকাক্সক্ষা আছে। কিন্তু রাশিয়ার কারণে এখন পর্যন্ত তা হয়ে ওঠেনি।
