শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ তুলনা আপেল-কমলার তুলনার মতো

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২২, ১০:১৮ এএম

ড. নাজনীন আহমেদ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট। নাজনীন আহমেদের জন্ম ১৯৭২ সালের ২১ জুলাই, ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের পর তিনি ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সাসেক্স থেকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেছেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের ওয়েগেনগিন বিশ্ববিদ্যালয় হতে অর্থনীতিতে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (বিআইডিএস) যোগদান করেন।

এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, অ্যাকশন এইডসহ নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরামর্শক হিসেবে গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। ইউএনডিপিতে বাংলাদেশের কান্ট্রি ইকোনমিস্ট পদে যোগ দেওয়ার আগে তিনি বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হিসেবে কর্মরত ছিলেন। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাবসহ প্রাসঙ্গিক বিষয়ে কথা বলেছেন এই অর্থনীতিবিদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দেশ রূপান্তর সম্পাদকীয় বিভাগের এহ্সান মাহমুদ

দেশ রূপান্তর : একসময় সামাজিক সূচকে শ্রীলঙ্কা ছিল দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের সেরা। শিক্ষার গুণাগুণেও ছিল এগিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ায় পোশাক খাতের রপ্তানি প্রথম শুরু হয়েছিল শ্রীলঙ্কা থেকেই। অনেক পর্যটকেরও পছন্দের জায়গা ছিল শ্রীলঙ্কা। এখন সেই শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি এবং জনগণের ত্রাহি অবস্থার খবর সামনে এসেছে। এটির কারণ হিসেবে অতিরিক্ত বিদেশি ঋণ, দুর্নীতিগ্রস্ত বিরাট প্রকল্পে অর্থায়ন, কিংবা অপরাপর অনেক দেশের মতো রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বিদেশি বিনিয়োগ না থাকা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা আছে। আবার বাংলাদেশেরও শ্রীলঙ্কার দশা হতে পারে কিনা এমন একটা আলোচনাও শোনা যাচ্ছে। একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

নাজনীন আহমেদ : আজকাল অনেকেরই আলোচনায় শুনতে পাচ্ছি, বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কার মতো দশা হয়ে যাবে। আবার কেউ কেউ শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেও বিতর্ক করছেন। এখানে আমি একটি কথা বলতে চাই, আমি মনে করিবাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কা দুটি আলাদা দেশ, দুই দেশের সমস্যা, সংকট ও সম্ভাবনাও আলাদা। তাই শ্রীলঙ্কাকে দেখতে হলে শ্রীলঙ্কার বিচারেই দেখতে হবে। আবার বাংলাদেশকে দেখতে হলে বাংলাদেশের জায়গা থেকেই দেখতে হবে। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার বিষয়টি যেহেতু আলাদা, তাই এই দুই দেশের তুলনা হতে পারে না। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য এই তুলনা কাক্সিক্ষত হতে পারে না। তুলনামূলক একটি চিত্র দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার চেয়ে কোন কোন ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। এখন এই এগিয়ে থাকার ফল দেখে যদি কেউ মনে করে আমরা তো শ্রীলঙ্কার চেয়ে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছি, তাহলে তা তো হবে না। কারণ শ্রীলঙ্কা এখন খাদের কিনারে রয়েছে। আবার উল্টোটাও যদি কেউ ভাবেশ্রীলঙ্কার মতো আমাদের অবস্থাও হতে চলেছে, সেটিও বিবেচনাপ্রসূত হবে না। আমি বলতে চাই, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কার তুলনা হতে পারে না। যদি তুলনা করতে চায় তবে শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশের তুলনা হবে আপেল-কমলার মধ্যে তুলনার সমান। অর্থাৎ, দুটি ভিন্ন বিষয়ের মধ্যে তুলনা করা।

দেশ রূপান্তর : শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক অবস্থা এমন হওয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে বলে মনে করেন?

নাজনীন আহমেদ : এখন জানা যাচ্ছে, ২০০৭ সাল থেকে রাজস্ব আসে না এমন প্রকল্পে শ্রীলঙ্কা বাণিজ্যিক ঋণ নিয়েছে। আমরা যদি ব্যক্তিগতভাবেও ঋণ নিয়ে থাকি, আর সেটি যদি কোনো লাভজনক খাতে ব্যবহার বা বিনিয়োগ করতে না পারি, তাহলে তো এমন অবস্থা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। শ্রীলঙ্কা এমন কিছু ঋণ নিয়েছে। ২০১৯ সালে করবিরতির কারণে এই সংকট আরও বেড়েছে। আবার করোনা মহামারীর সময়ে আইএমএফ বলেছে, ইস্টার সানডেতে সন্ত্রাসী হামলা এবং ২০১৯ সালের শেষ দিকে বড় আকারে কর কমানোর নীতির কারণে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক নেতারা বলছেন ২০১৯ সালের এপ্রিলের ইস্টার বোমা হামলা ও ২০২০ সালের কভিড-১৯ মহামারীতে এমন হয়েছে। কিন্তু এটাই সব নয়। তবে এটা সত্যএ দুটি ধাক্কা দেশটির পর্যটনশিল্পে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাব পড়েছে। যার ফলে অর্থনৈতিক খাতে এটি কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

দেশ রূপান্তর : শ্রীলঙ্কার ঘটনা থেকে আমাদের শিক্ষণীয় কী তবে?

নাজনীন আহমেদ : আগেই বলেছি শ্রীলঙ্কা আর বাংলাদেশ পরিস্থিতি এক নয়। তবে এখানেও অনেক বড় প্রকল্পের লাভজনকতা নিয়ে আছে প্রশ্ন। বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ। একদিকে আমদানি ব্যয় যেমন নতুন রেকর্ড ছাড়াচ্ছে, চলতি হিসাবের ঘাটতিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন রেকর্ড। তবে ঋণ পরিশোধের দায়ের দিক থেকে বিপজ্জনক অবস্থানে নেই বাংলাদেশ। সুতরাং আপাতত চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই বলেই মনে করা হচ্ছে। কেননা, আইএমএফের হিসাবে এই হার ৫৫ শতাংশের বেশি হলেই বিপদ। তবে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ থেকে এখন থেকেই কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সতর্ক হতে হবে।

দেশে বড় প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে, যার প্রায় সব কটিই অবকাঠামো প্রকল্প। এসব ঋণের মধ্যে সরবরাহ ঋণও (সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট) আছে। এর সুদহার বেশি, ঋণ সরবরাহকারীরাই প্রকল্প তৈরি করে দিচ্ছে। এ ধরনের ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পের মান নিয়ে প্রশ্ন থাকে, অর্থ খরচের জবাবদিহি কম এবং সময়মতো প্রকল্পের কাজও শেষ হয় না। বর্তমানে ১০টি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর একটির কাজও সময়মতো শেষ হয়নি। সময় বেড়েছে, ব্যয়ও বেড়েছে। এতে এর অর্থনৈতিক মূল্যও কমে যাচ্ছে। বড় প্রকল্পের কারণে এখন বাংলাদেশের ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ছে আগের চেয়ে দ্রুতগতিতে। আবার স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হয়ে গেলে কম সুদে আর ঋণ পাবে না বাংলাদেশ। মিলবে না বাণিজ্যে বিশেষ অগ্রাধিকার সুবিধা। নিতে হবে বেশি সুদের ঋণ। এতে দায় পরিশোধও বাড়বে। ফলে এখন থেকেই ঋণের দায় নিয়ে সতর্ক হতে হবে।

দেশ রূপান্তর : এই সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় রাশিয়া ও ইউক্রেন সংঘাত। যুদ্ধটা প্রতিবেশী দুটি দেশের মধ্যে হলেও এর প্রভাব বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত। কারণ বিশ্বের অন্য শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কোনো না কোনোভাবে এই সংঘাতে নিজেদের জড়িয়েছে। একটি প্রশ্ন উঠছে, এই সংঘাতের প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কতটা পড়বে?

নাজনীন আহমেদ :  দ্রুত সমাধান না হলে এই সংকটের বড় প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরেও পড়বে এটা সত্য। বিশেষ করে, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লে তার প্রভাব সব ক্ষেত্রেই পড়ে। বর্তমান বিশে^ যেকোনো বাণিজ্যিক অবরোধ যখন দেওয়া হয়, সেটার মাত্রাটা ব্যাপক হলে বাংলাদেশ কেন, সারা বিশ্বের জন্যই একটা চিন্তার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে। আর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তো চিন্তার কারণ আছেই, কারণ জ্বালানি তেলের মূল্য এর মধ্যেই বাড়ছে। সেটা বাড়লে যানবাহন, কৃষিসবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। প্রভাবটা কত ব্যাপক হবে, সেটা নির্ভর করবে এই সংকট কতদিন ধরে চলে, তার ওপর। যদি নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে সেটার মাত্রা বাড়তেই থাকবে। পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্ন আসবে। তখন তা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সমস্যার কারণ হয়ে উঠবে। বিশ্বায়নের এই যুগে কোন দেশ কার সঙ্গে ব্যবসা করছে, সেটাই যে শুধু গুরুত্বপূর্ণ তা নয়। বিশ্বে যদি কোনো পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তাহলে সেটা ব্যবহারকারী সব দেশের ওপরই তার প্রভাব পড়ে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশের বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মুদ্রানীতি কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন?

নাজনীন আহমেদ : করোনার কারণে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বাজারে এমনিতেই টাকার প্রবাহ বাড়ানো হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির হার ঊর্ধ্বমুখী। করোনার প্রভাব মোকাবিলা করতে টাকার প্রবাহ বাড়াতে হবে। তবে যেটুকু বাড়ানো হয় তার সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ঋণপ্রবাহ বাড়াতে হবে। তাহলে কর্মসংস্থান বাড়বে। বাড়বে মানুষের আয়। ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এভাবে মূল্যস্ফীতির চাপ কমে যাবে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে করোনা মহামারীর সময়ে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। যারা নতুন করে চাকরির বাজারে প্রবেশের বয়স অতিক্রম করছেন, তারাও চাকরি পাচ্ছেন না। এতে একটি ভারসাম্যহীনতার সৃষ্টি হয়েছে তা বলা যায়। এসব মোকাবিলায় তবে করণীয় কী বাংলাদেশের?

নাজনীন আহমেদ : করোনা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ একাই যে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েছে, তা নয়। এখানে যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের জন্য সাময়িকভাবে খ-কালীন কর্মের ব্যবস্থা করতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়াতে হবে। করোনার মতো মহামারী বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারকে বিকল্প প্রস্তুতি রাখতে হবে। প্রয়োজনে সরকারের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে এসব খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। এখন কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। যেসব শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে সেগুলোকে চালু করার ব্যবস্থা নিলে কর্মসংস্থানে গতি আসবে। সে কারণে আগামী বাজেটে বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করতে হবে। সেগুলোকে দ্রুত কার্যকরও করতে হবে। তা না হলে সুফল মিলবে না।

দেশ রূপান্তর : ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের পরপরই বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য বাড়ানো হয়েছে। এমনকিছু পণ্যের মূল্য বেড়েছে, যার সঙ্গে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। যুদ্ধের অজুহাতে দাম বাড়ানোর বিষয়টিকে কীভাবে দেখবেন?

নাজনীন আহমেদ : ২০২০ সাল থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পরও চালের দাম বেড়েছে। এটা তো যুদ্ধের জন্য বাড়েনি। আবার আমদানি করা পণ্যের দাম বিশ্ববাজারে বাড়লে এখানেও বাড়বে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অনেকে এর অনৈতিক সুযোগ নেন। দেশের বাইরে বাড়লে আগে কম দামে আমদানি করার পণ্যের দামও তারা বাড়িয়ে দেন। আগেই বলেছি, বড় দেশ যখন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব সারা বিশ্বেই পড়ে। আমাদের এখানেও পড়বে সত্যি। তবে এখনই প্রভাব পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি তো হয়নি, কিন্তু এখনই সুযোগ সন্ধানী যারা রয়েছেন তারা যুদ্ধের নামে অনৈতিকভাবে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আবার করোনার সময়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারাবিশ্বেই প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। তাই করোনা পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব এসে পড়ছে বাজারে। তাই করোনা পরবর্তী বিশে^ জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। তবে বাংলাদেশে যুক্তির বাইরে দাম বাড়ছে। এখন এর জন্য বাজার মনিটরিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের রেশনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। নিম্নবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত যাতে এটা পায় তা নিশ্চিত করতে হবে। আবার দেশে আয় বৈষম্য বেড়েছেএটাও মনে রাখতে হবে।

দেশ রূপান্তর : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

নাজনীন আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত