১১ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন শাহবাজ শরিফ। ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়িয়ে এবং সাপ্তাহিক ছুটি কমিয়ে নতুন অফিস সময় ঘোষণা করে চমক সৃষ্টি করলেও মন্ত্রিসভা গঠন করতে পারেননি। পাঞ্জাবে শাহবাজের ছেলে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হলেও শপথ নিতে পারেননি। অন্যদিকে সীমান্তে আফগানিস্তানের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে পাকিস্তান। শাহবাজ শরিফের শাসনের প্রথম সাত দিন নিয়ে লিখেছেন মুফতি এনায়েতুল্লাহ
বাবা প্রধানমন্ত্রী, ছেলে মুখ্যমন্ত্রী
বাবা দেশের প্রধানমন্ত্রী আর ছেলে কোনো প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী- পাকিস্তানের ইতিহাসে এমন ঘটনা এটাই প্রথম। ১৬ এপ্রিল পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের ভোটাভুটিতে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন হামজা শরিফ। হামজা পাকিস্তানের শরিফ পরিবারের তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। এর আগে তার বাবা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তিন দফায় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তারও আগে শাহবাজের বড় ভাই ও পিএমএলের (এন) সর্বোচ্চ নেতা নওয়াজ শরিফ পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানের তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীও। হামজা মুখ্যমন্ত্রী হয়েও কুরসির নাগাল পাননি। প্রদেশটিতে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। হামজার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পিছিয়ে দিয়েছেন পাঞ্জাবের গভর্নর ওমর সরফরাজ চিমা। আর এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গভর্নরের অপসারণের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-এন। ওমর চিমাকে চলতি মাসের শুরুতে নিয়োগ দেয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। হামজার নির্বাচনের বিষয়ে ডেপুটি স্পিকার দোস্ত মুহাম্মদ মাজারি ‘পক্ষপাতমূলক’ কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন চিমা।
উল্লেখ্য, রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে লাহোর হাইকোর্টের নির্দেশে শনিবার প্রাদেশিক পার্লামেন্টের অধিবেশনে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন হয়। মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার দোস্ত মুহাম্মদ মাজারির ওপর চড়াও হয় ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) দলের সদস্যরা। গুরুত্বপূর্ণ ওই অধিবেশনে স্পিকার তার আসন গ্রহণ করলে ইমরান খানের দলের সদস্যরা দল পরিবর্তন করায় তার ওপর হামলে পড়ে লোটা নিক্ষেপ করে।
আলোচিত সিদ্ধান্ত
পাকিস্তানের ইতিহাসে বেশিরভাগ সময়ই ছিল সামরিক বাহিনী শাসিত। আর ৭৫ বছরে ২২ প্রধানমন্ত্রীর কেউ তার ক্ষমতার মেয়াদ পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু নানা অস্থিরতা শেষে ২৩তম প্রধানমন্ত্রী হয়ে পাকিস্তানের সরকারি কর্মচারীদের ন্যূনতম বেতন বাড়িয়ে ২৫ হাজার রুপি করার ঘোষণা দিয়েছেন শাহবাজ শরিফ। তাছাড়া সামরিক ও বেসামরিক সরকারি চাকুরেদের পেনশন ১০ গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেন। এ ছাড়া শিল্পখাতে চাকুরেদের এক লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন যারা পান তাদের বেতন ১০ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে দেওয়া প্রথম বক্তৃতায় তিনি এ ঘোষণা দেন। ১ এপ্রিল থেকেই এই ন্যূনতম বেতন কার্যকর হবে বলে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরের দিন তিনি জরুরিভাবে একটি রিলিফ ফান্ডের ঘোষণা দেন। সেই সঙ্গে তিনি রমজানে কঠোরভাবে বাজার তদারকি করারও নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শাহবাজের দেওয়া ঘোষণাগুলো হলো ত্রাণ কর্মসূচির আওতায় সরকারি ইউটিলিটি স্টোরগুলোতে সস্তায় গম সরবরাহ, যুবকদের বিনামূল্যে ল্যাপটপ প্রদান, কারিগরি শিক্ষায় জোর, বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড চালু ও রমজান মাস উপলক্ষে কমদামের বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত জোগান। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোর ঘোষণার পরদিন দেশের সাপ্তাহিক ছুটির দিন কমিয়ে দেন। এখন থেকে পাকিস্তানে সপ্তাহে সরকারি ছুটি দুদিনের বদলে একদিন থাকবে। এখন থেকে সরকারি অফিস শুরু হবে সকাল ৮টায়। ৭০ বছর বয়সী শাহবাজ নিজেও প্রথম দিন নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছান। নতুন সরকার নওয়াজ শরিফ ও সাবেক অর্থমন্ত্রী ইসহাক দারের পাসপোর্ট নবায়নের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জিও টিভি জানিয়েছে, লন্ডনে পাকিস্তানি হাইকমিশনকেও পিএমএল-এনের নেতাদের পাসপোর্ট নবায়নের কাজ শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নওয়াজকে দেশে ফেরানো নিয়ে শাহবাজের তাড়াহুড়াকে দেশটির সুশীল সমাজ খুব ভালো চোখে দেখছে না। গুঞ্জন রয়েছে, সেনাবাহিনীর একাংশও চাচ্ছেন না, নওয়াজ এখনই দেশে ফিরুক।
চ্যালেঞ্জ
দক্ষ ও অভিজ্ঞ শাসক হিসেবে শাহবাজ শরিফের সুনাম আছে। চটকদার নীতি এবং উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যবহারিক দক্ষতা দেখানোর জন্য তিনি বেশ পরিচিত। দীর্ঘদিন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসা শাহবাজ প্রথম জীবনে পারিবারিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবসা সামলাতেন। তারপর ১৯৮৮ সালে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৯৭ সালে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে তার ভাই ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার পর শরিফ পরিবার সৌদি আরবে নির্বাসনে চলে যায়। এরপর শাহবাজ ২০০৭ সালে দেশে ফিরে আসেন এবং পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি তিন তিনবার পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দৈনিক ডন-এর সাবেক সম্পাদক ও প্রখ্যাত বিশ্লেষক ফাহাদ হুসাইনের মতে, “শাহবাজ শরিফ প্রশাসন চালানোর ক্ষেত্রে ‘হ্যান্ডস-অন পদ্ধতি’ অনুসরণ করেন। অর্থাৎ প্রশাসনের প্রাত্যহিক কাজে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকেন।” নিজস্ব চিন্তা ও সক্ষমতার জন্য শাহবাজ শরিফের খ্যাতি আছে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর শাহবাজ প্রতিহিংসামূলক কোনো আচরণ করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সমাবেশে তিনি বলেছেন, তিনি এমন একজন প্রধানমন্ত্রী হবেন, যিনি ‘কথা কম কাজ বেশি’ নীতিতে বিশ্বাসী। তবে এটা মনে করার কোনো কারণ নেই, শাহবাজের পথচলা খুব মসৃণ হবে। কারণ তিনি এমন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এসেছেন, যাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ইতিপূর্বে সংসদ থেকে শুরু করে রাজপথ এমনকি প্রাদেশিকভাবে পরস্পরের মুখোমুখি ছিল। ১১টি রাজনৈতিক দলের এই জোটে কর্র্তৃত্ব করার মতো নেতা, দাবি জানানোর মতো পক্ষ, গোসা করার মিত্রের অভাব নেই; শুধু ‘একটু’ ঐক্যের অভাব আছে। ফলে শাহবাজকে টিকে থাকতে অত্যন্ত সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে। কারণ, শাহবাজ যখন ক্ষমতা নিলেন, সেই সময়ে পাকিস্তান বড় ধরনের সংকটকাল পার করছে। উত্তরাধিকারসূত্রে তার সামনে এখন একটি ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি, সমস্যাযুক্ত বৈদেশিক সম্পর্ক এবং পরস্পর বিবাদে লিপ্ত একটি রাজনৈতিক জোট। ভুলে গেলে চলবে না, শুধু ইমরান খানকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের সাধারণ লক্ষ্যে এ জোটে এসে সবাই হাত মিলিয়েছেন। ইমরান হটানোর ইস্যুতে তারা এক হলেও তাদের নিজেদের মধ্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র বিরোধিতা আছে। এমন একটি ভঙ্গুর জোট করেই ক্ষমতায় ছিলেন ইমরান, সেই সংসারও টেকেনি।
পিটিআই সরকারের অন্যতম প্রধান ত্রুটি ছিল দলটি তার বেশিরভাগ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি, বিশেষ করে অর্থনীতি, সুশাসন, দুর্নীতি নির্মূল ও কর্মসংস্থানবিষয়ক প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণে ব্যর্থতা। ইমরানের সরকার ক্ষমতার যথেচ্ছ ব্যবহারের জন্যও সমালোচিত হয়েছিল। প্রধান নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে পার্লামেন্টকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া এবং তার পরিবর্তে প্রেসিডেন্টের অধ্যাদেশের মাধ্যমে শাসনের জন্য ইমরান সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। কার্যকরভাবে দেশকে নেতৃত্ব দিতে পিটিআইয়ের ব্যর্থতার কারণে বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে বৃহত্তম প্রদেশ পাঞ্জাবে শাসনসংক্রান্ত সমস্যা দেখা দেয়।
সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজকে অবশ্যই শাসনব্যবস্থার উন্নতির বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিন্তু বর্তমান ভূমিকায় তাকে তার প্রতিটি পদক্ষেপের আগে সমর্থনের জন্য ১১টি শরিক দলের দ্বারস্থ হতে হবে। এই ১১টি দলের লক্ষ্য আলাদা। প্রতিটি দলই ভালো করে জানে, তাদের জোটের পথ খুব লম্বা হবে না এবং আগামী নির্বাচনে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তাই ২০২৩ সালের সাধারণ নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে শরিফ সরকারকে অবশ্যই তাড়াহুড়ার পরিবর্তে ধীরস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইতিমধ্যে জোট শরিকদের কেউ কেউ আগাম নির্বাচনের কথা বলে ফেলেছেন। তারা মূলত দর কষাকষিতে টিকতে না পেরেই এমন কথা বলছেন। কিন্তু এগুলো পিটিআই শিবিরকে বাড়তি অক্সিজেন দেবে নিঃসন্দেহে। মন্ত্রিসভায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) যোগদানে অনীহা, মন্ত্রণালয় বণ্টন নিয়ে ‘মতবিরোধের’ কারণে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (জেইউআই-এফ)-এর সরকারের অংশ হিসেবে থাকা না থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট-পাকিস্তান (এমকিউএম-পি)-এর প্রথমে মন্ত্রিত্ব না নেওয়ার ঘোষণা জোট সরকারের ‘পথচলার ট্রেইলার’ মনে করা হচ্ছে। এভাবেই ক্ষোভ-খেদ, দাবি-আবদার, রাগ-অনুরাগ, ধমক-আদর ইত্যাদির মিশেলে সরকার চালাতে হবে শাহবাজকে।
নতুন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফকে শপথ পড়াননি প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি। ধারণা করা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি শিগগিরই পদত্যাগ করতে পারেন। যদি এমনটা ঘটে, তবে পিপিপি প্রেসিডেন্ট চাইবে। ডন জানিয়েছে, জেইউআই-এফ রাষ্ট্রপতি পদটি দাবি করেছে। এটা দেওয়া না হলে জোট সরকার হুমকির মুখে পড়বে, এটা অনেকটা প্রকাশ্যেই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ ২০১৯ সালে ইমরান সরকারের পতন পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে দেশজুড়ে লংমার্চ করেছিলেন পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (জেইউআই-এফ) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান। সে-সময় মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টিসহ প্রায় সব বিরোধী দলই মাওলানার আহ্বানে আজাদি মার্চে অংশ নিয়েছিল। মূলত তখন থেকেই রাজপথে প্রকাশ্যে ইমরানবিরোধী তৎপরতা নজরে আসে। মূলত পাকিস্তান মুসলিম লিগ-এনের (পিএমএল-এন) বর্তমান প্রেসিডেন্ট শাহবাজ, মাওলানা ফজলুর রহমান ও বিলাওয়াল ভুট্টোর যৌথ প্রচেষ্টায় ইমরান সরকারের পতন হয়। এমতাবস্থায় মাওলানার দলকে শুধু দুইটি মন্ত্রণালয়, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে সরকারের অংশীদার করার ঘোষণায় ‘চিড়ে’ ভিজবে বলে মনে হয় না। গত রবিবার রাতে পেশোয়ারে নিজ বাসভবনে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের (পিডিএম) প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান অনেকটা খেদ মেশানো কণ্ঠে বলেছেন, ‘কৌশলের একটা সীমা আছে। আমাদের এখন অবিলম্বে নির্বাচন দরকার। নতুন যে সরকার গঠিত হয়েছে, তা সর্বোচ্চ এক বছরের জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘জোটের অংশীদার হলেও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নিজস্ব অস্তিত্ব, পরিচয় ও অবস্থান রয়েছে।’
মুখোমুখি তালেবান-পাকিস্তান
আফগানিস্তানে বিমান ও রকেট হামলাকে কেন্দ্র করে শাহবাজ শরিফ সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এই হামলা দুই দেশকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। পাকিস্তানের রক্ষণশীল সমাজ এটাকে আমেরিকার প্রতি নতুন সরকারের ‘বন্ধুত্বের উপহার’ বলে কটাক্ষ করেছে। পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এর কড়া সমালোচনা করছেন। আফগানিস্তানে পাকিস্তানের হামলাকে কেন্দ্র করে মাওলানা ফজলুর রহমানও চাপে পড়েছেন। দৈনিক জং জানিয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের আলেম-উলামাদের তালেবান সমর্থক মনে করা হয়। এমনকি তালেবান সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা কিছুদিন আগে মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এমতাবস্থায় তার অংশীদারত্বে চলা সরকারের সময় আফগানিস্তানে হামলা কোনোভাবেই সমর্থন করে না দেশের রক্ষণশীল সমাজ। ইসলামাবাদের দাবি, আফগানিস্তান থেকে জঙ্গিরা পাকিস্তানে হামলা করছে। তালেবান এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আফগান সরকারের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, শনিবার রকেট হামলার পাশাপাশি দেশটির খোস্ত প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় চারটি গ্রামে হেলিকপ্টারে করে বোমাবর্ষণ করেছে পাকিস্তানি সেনারা। বেসামরিক লোকজনের ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে চালানো এ হামলায় নিহতের সংখ্যা অন্তত ৪৭ জন।
বিমান হামলা নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিশ্বের সঙ্গে আফগান সরকারের যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার কাজটি করছিল ইসলামাবাদ। কিন্তু পাকিস্তানের নতুন প্রধানমন্ত্রী তার পূর্বসূরি ইমরান খানের মতো আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন তালেবানকে সাহায্য করবে কি না তা স্পষ্ট নয়।
শাহবাজের দুর্বলতা
শাহবাজ শরিফের সরকারের সঙ্গে এমন সব ব্যক্তি ও রাজনৈতিক শক্তি সামনের কাতারে রয়েছেন যাদের ভূমিকা সরাসরি পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী হিসেবে দেখা হয়। খায়বার পাখতুনখোয়ার মোহসিন ডাবর নামে এক নেতা শাহবাজের মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন বলে অনুমান করা হচ্ছে, তিনি মন্তব্য করেছিলেন খায়বার পাখতুনখোয়া
পাকিস্তানের অংশ নয়। বেলুচিস্তানের কিছু রাজনৈতিক শক্তি শাহবাজ সরকারের সঙ্গে রয়েছে, যারা গোয়াদার বন্দর ও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের বিরোধী। মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট শাহবাজ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এই জোটের নেতারা যুক্তরাজ্যে নির্বাসনে থেকে ভারতের গোয়েন্দা পরিষেবার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রাখেন বলে মনে করা হয়।
পাকিস্তানে গভীর ক্ষমতা বলয়ের মূল ভিত্তি সামরিক প্রতিষ্ঠান। নওয়াজ শরিফের প্রতি তাদের ক্ষোভ থাকলেও তারা ছোট ভাই শাহবাজকে ‘একটি মওকা’ দেওয়ার পক্ষপাতী। শাহবাজ এখানেই হতে পারেন মোক্ষম অস্ত্র। এমনিতেই চীনের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো। বর্তমান অবস্থায় চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আমেরিকান বলয়ে ঝুঁকতে পারেন শাহবাজ। শোনা যাচ্ছে, নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন বিলাওয়াল জারদারি। তাদের পারিবারিক মিত্র এমবিজেড-এর নাহিয়ান পরিবার। অন্যদিকে শরিফ পরিবারের পৃষ্ঠপোষক মনে করা হয় সৌদি আরবকে। তবে পাকিস্তানের নতুন পর্বে সরকারের ওপর আমেরিকান প্রভাব থাকবে অনেক বেশি। বাইডেন নিজে হোয়াইট হাউজে বসে ইমরানের বিরুদ্ধে অনাস্থা ভোটের দৃশ্য পাকিস্তানি টিভিতে উল্লাসের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছেন। শরিফ পরিবারের সঙ্গে মোদির সম্পর্ক বরাবরই উষ্ণ। পাকিস্তানের পরবর্তী পররাষ্ট্র সম্পর্কে এর প্রভাব কমবেশি পড়বে। তবে রাজনীতিবিদরা ইচ্ছা করলেই দেশটিতে সবকিছু করতে পারেন না। জটিল নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র কৌশলের নিয়ন্ত্রণ থাকে সামরিক প্রতিষ্ঠানের ওপর, শঙ্কার জায়গা এটাই।
তবে এটা স্পষ্ট যে, রাজনৈতিক অস্থিরতায় পাকিস্তান চাপে আছে। এই ধরনের রাজনৈতিক সংঘাতের পথ ধরে পরবর্তী সময়ে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানও অনেক সময় কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতি দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থায় আঘাত হানতে পারে বলেও শঙ্কা সৃষ্টি হয়। সেই শঙ্কার শেষ কথা অন্তত শাহবাজের শাসনকালের প্রথম সাতদিনেই লিখে দেওয়া সমীচীন নয়।
