কাবুল থেকে নেপিডো দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সবক’টি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। ২০২১ সালে হঠাৎ করেই মিয়ানমারের সুচি সরকারকে হটিয়ে সরাসরি ক্ষমতা গ্রহণ করে সেনাবাহিনী। এরপর দেশব্যাপী চলা গৃহযুদ্ধে সহস্রাধিক লোক নিহত হয়েছে। সরকারবিরোধীরা ছায়া সরকার পর্যন্ত গঠন করেছে। একই বছরের আগস্টে কাবুল থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফলে ফের কাবুলের ক্ষমতায় ফেরে তালেবান। এতে দেশটিতে নতুন অস্থিরতা শুরু হয়। বর্তমানে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট, আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্ট , আফগানিস্তান ইসলামিক স্টেট-সহ বেশ কয়েকটি সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে তালেবানকে। দেশটিতে এখনো স্থিতিশীলতা আসেনি অদূর ভবিষ্যতে আসবে তাও বলা যাচ্ছে না।
২০২২-এ এসে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান ও দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। দ্বিতীয় মেয়াদে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ভারতও নানা ধরনের অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০১৯ এ এনআরসি, সিএএ আইন নিয়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভ, এরপর কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল, কৃষক আন্দোলন নিয়ে দিল্লির সরকারকে ভুগতে হয়েছে। সম্প্রতি হিজাব ইস্যু নিয়েও রাজনীতির জল ঘোলা হয়েছে দিল্লিতে। সেই সঙ্গে বিতর্কিত সিনেমা ‘কাশ্মীর ফাইলস’ ও নবরাত্রি উপলক্ষে মুসলমানদের মাংসের দোকান বন্ধকে কেন্দ্র করে ফের রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে ভারতে। নেপালে কমিউনিস্টদের ঐক্যের সরকার ভেঙে পড়েছে গত বছরে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ কোটি ডলারের অনুদান নেওয়া না নেওয়া নিয়ে বিক্ষোভ চলছে। বাংলাদেশ সরকার করোনা মহামারী কাটিয়ে উঠতে না উঠতে গত ১০ ডিসেম্বর মানবধিকার দিবসের দেশের এলিট ফোর্স র্যাবের কিছু কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সরকার বেশ চাপের মধ্যে আছে। তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সংকটাপন্ন সময় পার করছে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। পাকিস্তানের সংকট রাজনৈতিক হলেও শ্রীলঙ্কার সংকট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দুটোই।
পাকিস্তানে সংকটের শুরু হয় যখন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে সব রাজনৈতিক দল এক হয়ে সংসদে অনাস্থা প্রস্তাব আনে। যদিও-বা মি. খান অভিযোগ করছেন ‘তার সরকার স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি নেওয়ায়, যুদ্ধ চলাকালে মস্কো সফর করায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় তার বিরুদ্ধে বিরোধীরা ষড়যন্ত্র করছে।’ তবে শেষ পর্যন্ত রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে ইমরান খানকে বিদায় নিতে হয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভূ-রাজনীতি জড়িয়ে পড়েছে। ইমরান খান তার সময়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয় এমনকি সৌদি আরবের সঙ্গে কয়েকবার টানাপড়েন তৈরি করেছিলেন। ওআইসি নিয়ে ইমরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ও কুয়ালালামপুর সামিটে মালয়েশিয়া, কাতার, ইরান ও তুরস্কের সঙ্গে ইমরানের যোগদানের ইচ্ছে নিয়ে রিয়াদ প্রচ- রকম ক্ষুব্ধ ছিল। যা পাকিস্তানের চিরাচরিত পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে মানানসই ছিল না। অনাস্থা ভোটে ইমরানকে হারাতে ১৭৪টি ভোট ম্যানেজ করতে কিন্তু পাকিস্তানের প্রধান দুই দলসহ ১০টি বিরোধী দলের ঘাম ঝরেছে। তার মানে ইমরান খানের জনপ্রিয়তা বা রাজনৈতিক অবস্থান একেবারে নড়বড়ে তা বলা যাবে না। আপাত দৃষ্টিতে এই অপসারণ ‘বিচার বিভাগের ক্যু’ও মনে হতে পারে। তবে বর্তমানে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর ইমরানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনে তাকে রাজনৈতিকভাবে দমনের কৌশল নিতে পারে। নতুবা দুই বছর পর বা যখনই হোক নতুন নির্বাচনে ইমরান ফের ক্ষমতায় আসতে পারেন। ইমরান ইতিমধ্যে তার কর্মী সমর্থককে এটা বুঝাতে পেরেছেন তিনি ভূ-রাজনীতির শিকার। ফলে তার প্রতি জনগণের সহানুভূতিও রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে এই টাইপ সহানুভূতি মারাত্মক কাজে দেয়। কিন্তু নতুন সরকার ও ঐক্যবদ্ধ বিরোধীরা ইমরানকে স্বাভাবিক রাজনীতি করতে দেবে কি-না সেটাও প্রশ্ন। এছাড়া যেসব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ শক্তিশালী রাষ্ট্র ইমরানের পররাষ্ট্রনীতিতে অসন্তুষ্ট ছিল তারা ইমরানকে রাজনৈতিকভাবে দমানোর কৌশলে ঘি ঢালবেন না সেটাও বলা মুশকিল।
শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্দশার জন্য বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই অনেকাংশে দায়ী। অপ্রয়োজনীয়, অলাভজনক ও উচ্চাভিলাষী বেশ কিছু প্রকল্প নিয়ে সরকার জনপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছে। এছাড়া অতিমাত্রায় বৈদেশিক ঋণের দিকে ঝুঁকেছে সরকার। গত ১০ বছরে চীন থেকেই নেওয়া হয়েছে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ। আবার দীর্ঘমেয়াদি ঋণের কিস্তি শোধ করতে নেওয়া হয়েছে স্বল্পমেয়াদি ঋণ। এছাড়া বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে অর্থনৈতিক গতি সঞ্চারের কথা বলে ভ্যাট ১৫% থেকে কমিয়ে ৮% করে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যায় প্রায় ২৫%। যতই অর্থনৈতিক গতি সঞ্চারের কথা বলুক মূলত এই সিদ্ধান্ত ছিল রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি পৌঁছেছে প্রায় ১৫%-এ। এক মার্কিন ডলারে পাওয়া যাচ্ছে ২৩৩ শ্রীলঙ্কার রুপি। আরেকটি বড় সংকট হলো করোনা মহামারী। করোনার আগে শ্রীলঙ্কা পর্যটন ও রেমিট্যান্স থেকে প্রতি বছর ১২ বিলিয়ন ডলার আয় করত। করোনার কারণে গত দুই বছর সে আয় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকার সংকটে পড়ে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের মতো সার্বভৌম ঋণ নিয়েছে যা পরিশোধের ক্ষমতা বর্তমানে শ্রীলঙ্কার নেই। ফলে শ্রীলঙ্কাকে অনেকেই দেউলিয়া রাষ্ট্র হিসেবে ভাবা শুরু করেছেন। কিন্তু শুধু বৈদেশিক ঋণ, ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয় দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায়ী। বর্তমান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ে রাজাপাকসে ও প্রধানমন্ত্রী মাহেন্দ্র রাজাপাকসে আপন ভাই। এছাড়া তাদের পরিবারের অন্যান্য ভাই ও ভাতিজারা মন্ত্রী ও এমপি হয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিদেশে অর্থ পাচারের অহরহ অভিযোগ রয়েছে। দেশটিতেও পাকিস্তানের মতো অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে সরকার বদলানোর চেষ্টা করছে বিরোধীরা।
বর্তমান বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজস্ব বলয় তৈরিতে প্রতিযোগিতা করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়েও মার্কিন- সোভিয়েত শীতল যুদ্ধের স্পষ্ট প্রভাব ছিল দক্ষিণ এশিয়ায়। নতুন প্রতিযোগিতার প্রভাবও পড়েছে এই অঞ্চলে। চীনের বিআরই প্রকল্পের জন্য যেমন দক্ষিণ এশিয়া গুরুত্বপূর্ণ জায়গা তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো প্যাসেফিক স্ট্রাডেজি (আইপিএস) এর জন্যও এই অঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশই দক্ষিণ এশিয়ায় হেজেমনি প্রতিষ্ঠার লড়াই করছে। সে লড়াই প্রায়শই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্র, বড় আমদানি বাজার চীন। বাংলাদেশ চীনের বিআরই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে আইপিএসে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর প্রতিযোগিতার মাঝখানে বাংলাদেশকে জটিল এক ভারসাম্য নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।
লেখক : শিক্ষার্থী, সাউথ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি, নয়াদিল্লি
