গমের মজুদে টান

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২২, ০১:৫৮ এএম

গমের যে মজুদ তা দিয়ে আগামী জুন পর্যন্ত চলমান সব কর্মসূচি বহাল রাখতে পারছে না সরকার। সরবরাহ লাইন ঠিক রেখে অর্থবছরের শেষ দিন পর্যন্ত যেতে হলে বর্তমান মজুদের চেয়ে ৫০ হাজার টনের বেশি গম দরকার। বিষয়টি খাদ্য মন্ত্রণালয়কে দফায় দফায় আগাম জানিয়ে রাখছে খাদ্য অধিদপ্তর।

গমের ভা-ারে টান পড়ার কারণ জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা বলেন, দুই কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। গত দুই মাস ধরে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম ছিল খোলাবাজারে (ওএমএস) আটা বিক্রির কর্মসূচি বাড়ানো। নির্ধারিত কর্মসূচির বাইরে গিয়ে নতুন করে কর্মসূচি বাড়ানোর কারণে অতিরিক্ত গম লেগেছে। অপর কারণটি হচ্ছে খাদ্য অধিদপ্তর গম কেনার জন্য টেন্ডার করেছে ঠিকই, কিন্তু সরবরাহকারীরা গম সরবরাহ করেনি। বাংলাদেশে মূলত ইউক্রেনের গম আসে। যুদ্ধের কারণে সরবরাহকারীরা গম দিতে পারেনি।

বিষয়গুলো জানতে চাইলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইউক্রেন থেকে সব গম আসত না। এটা ৩০ শতাংশের মতো। আমাদের তিনটি টেন্ডার চলমান রয়েছে। এসব টেন্ডারে বলা নেই কোন দেশ থেকে গম আমদানি করতে হবে। স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্দিষ্ট মানের গম যেকোনো দেশ থেকে আনতে পারবেন সরবরাহকারীরা।’

এই সময়ে খাদ্য অধিদপ্তরের গমের মজুদ কি কমে গেছেজানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, ‘বিভিন্ন কর্মসূচিতে দিলে তো মজুদ কমবেই। দেশের ভেতরে আমাদের সংগ্রহ অভিযান শুরু হবে। দেশ থেকে গম না পেলে বিদেশ থেকে আনা হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে শাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া থেকেও গম আনা যেতে পারে। কানাডার ট্রেড কমিশনার ও অস্ট্রেলিয়ার প্রতিনিধিদল দেখা করে গম সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বুলগেরিয়াও গম উৎপাদনকারী দেশ। আমরা তাদের সঙ্গেও যোগাযোগ করছি। গমের কোনো সংকট হবে না।’

গমের প্রাপ্যতা, মজুদ, বরাদ্দ কমানো বাড়ানোএসব নিয়ে গত তিন মাসে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে পাঁচ দফা চিঠি দিয়েছে খাদ্য অধিদপ্তর। সব শেষ চিঠি দিয়েছে গত ১ এপ্রিল। সেই চিঠিতেও গমের মজুদের সংকটের কথা খোলাখুলিই বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে পাবলিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমের (পিএফডিএস) বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ করা ৭ লাখ ৭৬ হাজার ৮৪২ টন গমের বিপরীতে এ পর্যন্ত ৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৩৮ টন গম বিতরণ করা হয়েছে। ২ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৪ টন গম অবশিষ্ট আছে। গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭৭ টন গম মজুদ ছিল। বাজেট বরাদ্দ অনুযায়ী আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত (২,৩৯,১৪৪-১,৮৬,০৭৭) ৫৩ হাজার ৪২৭ টন গমের ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু জুন সমাপনীতে নিরাপত্তা মজুদ হিসেবে সরকারি ভা-ারে দুই থেকে আড়াই লাখ টন গম মজুদ থাকা জরুরি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন কর্মকর্তা জানান, চিঠিতেই স্পষ্ট জুন নাগাদ ৫৩ হাজার ৪২৭ টন গমের ঘাটতি হবে। গমের ঘাটতি হবে বলেই খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক দফায় দফায় চিঠি লিখে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর গম সরবরাহের টেন্ডার হলেও গমের সরবরাহ দিতে পারেননি সরবরাহকারীরা। একজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, গম সরবরাহ করলে সরবরাহকারীর ক্ষতি হবে ১০ কোটি টাকা। আর গম সরবরাহ না করলে সরবরাহকারীর ক্ষতি হবে আড়াই কোটি টাকা, যা খাদ্যশস্য সরবরাহের নিরাপত্তা হিসেবে সরকারের কাছে জমা রাখা হয়।

একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টেন্ডারে অংশ নিয়ে যারা সরবরাহের দায়িত্ব পায় তারা সরবরাহ না করলে শুধু জামানতের অর্থ বাতিল করা হয়। এটাই যথেষ্ট নয়। কারণ তারা গম সরবরাহ করতে না পারার কারণে সরকার বিব্রত হয়। তাই সরবরাহকারীর জামানতের অর্থ বাতিলসহ ভবিষ্যতে তাদের টেন্ডারে অংশ নেওয়ার পথ বন্ধ করতে হবে।

তবে একজন সরবরাহকারী জানিয়েছেন, সরবরাহকারীদের কালোতালিকাভুক্ত করা হলে সরকার বিপদে পড়বে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী গম সরবরাহ করেন। তাদের কালোতালিকাভুক্ত করা হলে সরবরাহকারীরা টেন্ডারে অংশ নেবে না।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রমজান মাসে আটার চাহিদা কম থাকায় ওএমএসে আটার বরাদ্দ কিছুটা কমানো হয়েছে। কিন্তু কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন আটার চাহিদা কমেনি। যেসব ট্রাকে ওএমএসের আটা বিক্রি করা হয় সেগুলো বিকেল ৫টার মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। অথচ শ্রমঘন এলাকাগুলোতে পোশাক কারখানা ছুটি হয় ৬টায়। পোশাক শ্রমিক ও অন্য শ্রমিকরা তখন ওএমএসের গাড়ি খুঁজে পান না। আর ওএমএসে ১৮ টাকা কেজি দরে আটা বিক্রি হয়। যা খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা কেজি দরে। কাজেই আটার চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি সঠিক নয়।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত