বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা দাপটের সঙ্গে অবস্থান করছেন। পপ সংগীতেও রয়েছে তাদের সরব পদচারণা। যদিও ব্যান্ড সংগীতে নারীর উপস্থিতি নগণ্যই ছিল গত ৫০ বছরে। তারা এসেছেন আবার অল্প সময়ের মধ্যে চলেও গেছেন। স্থায়ী হতে পারেননি। স্বাধীনতাপূর্ব, ১৯৬৪-৬৫ সালে জিংগা ব্যান্ডে দুই নারী সদস্য নাজমা আলী (নাজমা জামান) ও শাহেলা পারভীন এই দুই বোন গায়ক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৯/৭০ সালে এনিটা, সীমা, জাহাঙ্গীর, ইকবাল হায়দার, স্বপন, রতন, জ্যাকব, ইব্রাহিম মিলে চট্রগ্রামে গঠন করেন ব্যান্ড ‘স্পাইডার’। এখানে এনিটা ও সীমা দুজন নারী সদস্যের উপস্থিতি ছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম নারী ড্রামার জর্জিনা হক। ১৯৭২ সালে তিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির এক অনুষ্ঠানে স্পন্দন ব্যান্ডের সঙ্গে ড্রাম বাজান। পরে জর্জিনা হক তার দুই বোনকে সঙ্গে নিয়ে নারীদের ব্যান্ড ‘থ্রি হক সিস্টার্স’ গড়ে তোলেন। বড়বোন সুলতানা হক ছিলেন ভোকাল এবং রিদম গিটারিস্ট। ছোটবোন রোকসানা হক বাজাতেন পিয়ানো একরডিয়ান, আর মাঝে মাঝে বাজাতেন গিটার। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন তারা। পূর্ণাঙ্গ না হলেও ‘থ্রি হক সিস্টার্স’ ছিল বাংলাদেশের নারীদের প্রথম ব্যান্ড। সে সময় এই ব্যান্ডটি পারিবারিক ও সামাজিক বেশ কিছু শো’তে অংশগ্রহণ করে। পড়াশোনা ও বৈবাহিক কারণে কয়েক বছরের মধ্যেই তাদের কার্যক্রম থামিয়ে দিতে হয়।
১৯৭৬ সালে ঢাকায় ‘বালার্ক’ ব্যান্ডের জন্ম হয়। বালার্ক ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন বর্তমান মাইলস ব্যান্ডের শাফিন আহমেদ ও হামিন আহমেদ। এছাড়া কমল, ল্যারী ও নীনা। এখানেও একজন নারী সদস্য দেখা যায়। যদিও এই ব্যান্ড স্বল্প সময়ে ভেঙে যায়। ১৯৮৪ সালে ‘ওয়েভস’ ব্যান্ডে সক্রিয় নারী সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়। ১৯৮৪ সালে প্রবাস থেকে মিউজিক করার জন্য বাংলাদেশে আসে ওয়েভস। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সুইডেন থেকে আসা মিনু। মিনু বাংলাদেশের প্রথম মেটাল নারী ব্যান্ড মেম্বার। সে সময় তাকে কনসার্ট ও টিভি শোতে নিয়মিত দেখা গেছে। গিটার কিবোর্ড ও গানে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন মিনু।
১৯৯০ সালে ১১ মে চট্টগ্রামে গড়ে ওঠে ব্লু-বার্ড। এই ব্যান্ডের ৯ জন সদস্যই নারী। এটিই বাংলাদেশের নারীদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ড। সৈকতে একদিন নামে একমাত্র অ্যালবাম বের হয় ১৯৯৫ সালে। জানা যায় এই ব্যান্ডটি গড়ে তোলার পেছনে নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছেন চট্টগ্রামের বিশিষ্ট সংগীতানুরাগী জ্যাকব ডায়েস। বিভিন্ন সময়ে এই ব্যান্ডে অনেকে এসেছেন অনেকে চলেও গেছেন জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে। ব্লু-বার্ড এখনো টিকে আছে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় নিশিতা, রীমী, কান্তা ও রুবানা মিলে গড়ে তোলেন মেয়েদের ব্যান্ড ‘সিলেস্টিয়াল’। তাদের একটি অডিও ক্যাসেটও বাজারে আসে। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তারা হারিয়ে যান ব্যান্ড মিউজিক থেকে।
৯০ দশকে কয়েকটি ব্যান্ডে নারীদের দেখা গেছে স্বল্প সময়ের জন্য। ৯০ দশকে বিচ্ছিন্নভাবে নারীরা ব্যান্ড সংগীতে এসেছেন। ‘সাবকনসাস’ ব্যান্ডে ভোকাল হিসেবে আছেন নীরা। ১৯৯৮ সালে ঢাকায় গঠিত হয় ব্যান্ড সাবকনসাস। অ্যালবামের পাশাপাশি টিভি শো ও কনসার্টে তাদের সরব উপস্থিতি দেখা গেছে। ২০০২ সালে বাজারে আসে তাদের প্রথম অ্যালবাম মাটির পৃথিবী।
১৯৯৮ সালে বাংলা ব্যান্ডের ভোকাল হিসেবে গান শুরু করেন আনুশেহ আনাদিল। ‘তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা’ গানটি সে-সময় তুমুল জনপ্রিয় হলেও কয়েক বছর পর সেই ব্যান্ডে তাকে আর দেখা যায়নি। তবে এরপর থেকে আনুশেহ সলো শিল্পী হিসেবে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যান্ড ‘লালন’। কয়েক বছর পর ব্যান্ডের প্রধান ভোকাল হিসেবে যোগ দেন সুমি। সুমি এখনো এই ব্যান্ডের সদস্য হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। দেশ-বিদেশে কনসার্টে অংশগ্রহণ করছেন। খুলনার আরেক মেয়ে শারমিন সুলতানা সুমি ২০০২ সালে ঢাকায় গঠন করেন চিরকুট ব্যান্ড। ব্যান্ডের তিনি দলনেতা ও প্রধান গায়িকা। গান লেখেন, সুরও করেন সুমি। লালন ও চিরকুট ব্যান্ডের ভোকাল সুমী ও শারমিন সুলতানা সুমি দুজনেই পুরুষের পাশাপাশি আজও দাপটের সঙ্গে টিকে আছেন ব্যান্ড মিউজিকে।
‘বাংলাদেশ’ ব্যান্ডে ভোকাল ও কিবোর্ড বাদক ছিলেন লরা। ব্যান্ড গঠনের কয়েক বছর পর লরা প্রবাসে পাড়ি জমান। ২০০৩ সালে প্রবাস থেকে ফেরার পর এলিটা করিম গঠন করেন ‘রাগা’ নামের একটি ব্যান্ড। এই ব্যান্ডটিও অনিয়মিত হয়ে পড়ে। আলিফ আলাউদ্দিন ‘পেন্টাগন’ নামের একটি ব্যান্ডে ভোকাল ছিলেন। এখন পেন্টাগন ব্যান্ডের সঙ্গে আছেন অনিতা। ‘মহাকাল’ ব্যান্ডে ভোকাল ছিলেন অভিনেত্রী স্বাগতা। ২০১১ সালে গঠিত হয় ব্যান্ড ‘এসওএস’। এই ব্যান্ডের ভোকাল নেদা। ডি রকস্টারস-এ ২০০৭ সালে রংপুর থেকে অংশগ্রহণ করেছিল ব্যান্ড ‘বৃত্ত’। এই ব্যান্ডের ভোকাল নিপা। চট্টগ্রামের ‘হার্টস রিলেশন’ ব্যান্ডে গিটার বাজাচ্ছেন নিতু।
২০০৮ সালে মৌলভীবাজার জেলায় পাঁচ তরুণী মিলে গড়ে তোলেন ব্যান্ড ‘টুইঙ্কেল’। পারিপার্শ্বিক কারণে তারা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারেনি। ৭ বছরের বিরতির পর ২০১৫ সালে তারা ‘আঁচল’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ২০১৬ সালে পাঁচ তরুণী মিলে গড়ে তোলেন মেয়েদের আরেকটি পূর্ণাঙ্গ ব্যান্ড ‘এফ মাইনর’ (মেয়েদের চতুর্থ)। এই ব্যান্ডের সবাই গারো সম্প্রদায়ের সদস্য। এই ব্যান্ডের শিল্পীরা নিজেরা গান লেখেন, সুরও করেন। ব্যান্ড মেম্বাররা হলেন রাত্রি জেংঝাম, পিংকি ক্লাসি, চিড়িং ক্লাসি, নাদিয়া রিসিল, গ্রোরিয়া মান্দা।
বাংলাদেশে নারীদের পরিপূর্ণ কোনো ব্যান্ডই বেশিদিন টিকে থাকতে পারেনি। এ অবস্থায় ২০১৯ সালে সানসিল্ক-ডিভাস যৌথভাবে উদ্যোগ নেয় দেশে নারী ব্যান্ড শিল্প গড়ে তোলার এক প্রতিযোগিতা। এই রিয়ালিটি শো থেকে পাওয়া গেছে চার জন নারী ব্যান্ড শিল্পী। তারা হলেন অন্তরা রহমান, মুস্তারিন আহমেদ শীতল, সুনন্দা শারমিন এবং ফেরদৌসি মৌমিতা। এদের নিয়েই তৈরি হচ্ছে দেশের প্রথম অল-গার্ল প্রফেশনাল মিউজিক ব্যান্ড। দাবি করা হচ্ছে এটিই নারীদের প্রথম পেশাদারি বাংলাদেশি ব্যান্ড।
বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতে নারীরা কখনোই শক্ত অবস্থান গড়ে তুলতে পারেননি দু’ একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে চিরকুট ব্যান্ডের দলনেতা ও গায়িকা শারমিন সুলতানা সুমী বলেন, ‘আমাদের দলের ছেলে সদস্যদের শুনতে হয়, ‘ও তোমরা তো মেয়েদের ব্যান্ডে কাজ করো। আমাদের দেশে নারীদের আলাদা ব্যান্ডের প্রচেষ্টা হয়েছে, তবে তা সফল হয়নি।’
পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ও সামাজিক ট্যাবুর কারণে নারী ব্যান্ড শিল্পীরা এগিয়ে যেতে পারেনি। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের ব্যান্ডকে এখনো হয়তো সেভাবে মেনে নিতে পারেনি অনেকেই। তাই মেয়েদের ব্যান্ড বিস্তার লাভ করতে পারেনি সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও। সেই অর্থে এটাও বলা যায় যে, বাংলাদেশের ব্যান্ড মিউজিক এখনো নারীবান্ধব হয়ে ওঠেনি। তবু থেমে থেমে এগিয়ে গেছে নারীরা। পুরুষ ব্যান্ড শিল্পীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নারী ব্যান্ড শিল্পীদের সামনে এগিয়ে আসতে হয়েছে। নারী সদস্যরা স্বল্প সময়ের জন্য এলেও তাদের প্রতিভার ছাপ রেখে গেছেন দর্শক- শ্রোতার হৃদয়ে।
লেখক সাংবাদিক ও কলামনিস্ট
