নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের নেপথ্যে ইন্ধন থাকার তথ্য পেয়েছে বলে দাবি করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের দাবি অনুযায়ী, ওই ইন্ধনদাতাদের মধ্যে ছিল ছাত্রলীগ, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী। তারা সরাসরি ও মেসেঞ্জারে ছাত্র ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষকে উসকানি দিয়েছে। এরই মধ্যে ইন্ধনদাতা ২৫ জনের একটি তালিকা করে তাদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, ‘আমরা দেখেছি, শেষপর্যায় এসে ঘটনা ছাত্র ও ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। তৃতীয় কোনো পক্ষ জল ঘোলা করার জন্য আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে। এগুলো আমাদের নজরে এসেছে। সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষের ঘটনায় তীয় পক্ষের ইন্ধন আছে বলে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনার একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত করব। যেখানে আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাও খতিয়ে দেখা হবে। ঘটনার তদন্তের জন্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ এরই মধ্যে চলে এসেছে, যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা প্রকৃত দোষীকে খুঁজে বের করব। তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।’
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে নিউমার্কেটসহ আশপাশের এলাকার ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রায় ১৯ ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে। এতে নাহিদ ও মোরসালিন নামে নিরীহ দুই যুবকের প্রাণ গেছে। আহত হয়েছেন সাংবাদিক, পুলিশ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ীসহ অন্তত ১০০ জনের মতো। এ ঘটনার পর সরকারের হাইকমান্ডের নির্দেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসেছে। পুলিশ, র্যাবসহ বিভিন্ন ইউনিটপ্রধানরা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। গতকালও পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ডিএমপি কমিশনার, র্যাব মহাপরিচালকসহ কয়েকজন ঊর্ধ্বতনকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। এলাকার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার পাশাপাশি সন্দেহভাজনদের মেসেঞ্জার গ্রুপ পর্যবেক্ষণ করছে পুলিশ। তুচ্ছ ঘটনাটি কেন এত বড় রূপ নিল তা আমলে নিতে আইজিপি ঊর্ধ্বতনদের বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছেন।
গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্মকর্তারা দাবি করছেন, তারা নিশ্চিত হয়েছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা এত বড় সংঘর্ষে জড়ানোর সাহস নেই। তাদের একটি চক্র উসকে দিয়ে মাঠ গরম করে। এরই মধ্যে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে ৭০ জন বহিরাগতকে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংঘর্ষে দুপক্ষকেই ইন্ধন দিয়েছেন অন্তত ২৫ জনের মতো। তারা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতা ও কর্মী বলে জানা গেছে। পাশাপাশি কয়েকজন আছেন স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামের নেতাও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইন্ধনদাতা হিসেবে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট ২৫ জনকে চিহ্নিত করেছে। তাদের মধ্যে ছাত্রলীগের সাত কর্মী রয়েছেন। বাকিরা ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী। তা ছাড়া ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরুর কয়েকজন অনুসারীও আছেন তালিকায়। তারা ঘটনাস্থলে থেকে সরাসরি সংঘর্ষের ইন্ধন দিয়েছেন। আবার কেউ মেসেঞ্জারে তথ্য দিয়েছেন। এমনকি তারা দেশি কিছু অস্ত্র ও লাঠিসোঁটাও সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ঢাকা কলেজের ভবনগুলোর ছাদেও অবস্থান নেওয়াদের মধ্যে বেশির ভাগ ছিল বহিরাগত। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বহিরাগতরা মিশে গিয়ে হামলা করেছে। সরকারবিরোধীরা সুযোগটি আরও কাজে লাগাতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে।
জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সংঘর্ষের ঘটনাটি আমরা হালকাভাবে নিইনি। যারা দেশের শান্ত পরিবেশকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে, তাদের কঠোরভাবে প্রতিরোধ করা হবে। সংঘর্ষের সময় কারা উসকানি দিয়েছে তাও খুঁজে বের করা হবে। ছাত্র ও ব্যবসায়ীদের শান্ত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তারা আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। এলাকার পরিবেশ আগের মতো ফিরে এসেছে। তবে আর যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেদিকে নজরদারি করা হচ্ছে।’
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল (বুধবার) থেকে তারা মাঠে কাজ করছেন। ছোট্ট একটি ঘটনা এত বাড়াবাড়ির পেছনে ‘অন্য একটি শক্তি’ জড়িত। শিক্ষার্থী ও ছাত্রদের একটি গ্রুপ ও বহিরাগতরা মিলে উসকে দিয়েছে। যারা ইন্ধন দিয়েছে তাদের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। ছাত্রলীগের পাশাপাশি ছাত্রদল, শিবিরের কিছু নেতা ও কর্মীর নাম পাওয়া গেছে। ভিপি নুরের কিছু অনুসারীর নামও পাওয়া গেছে। তাদের নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিছু বহিরাগত ও ইন্ধনদাতাকে আইনের আওতায় আনতে বুধবার রাতে ঢাকার কয়েকটি স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে। ঢাকার বাইরে আরেকটি টিম আছে।
এডিসি হারুনকে নিয়ে পুলিশের মধ্যে আলোচনা : সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ সদস্যের কারও কাছে গুলি আছে কি না জানতে চান রমনা জোনের সহকারী উপকমিশনার (এডিসি) হারুন-অর-রশিদ। একপর্যায়ে পুলিশের এক সদস্যকে তিনি থাপ্পড় মারেন। এ রকম একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ ঘটনায় পুলিশ কর্মকর্তারা বিব্রত। ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে আইজিপি নির্দেশ দিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেখেছেন তারা। পুলিশ কনস্টেবলকে এভাবে থাপ্পড় মারা ঠিক হয়নি এডিসি হারুনের। ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
