মানিকগঞ্জের সিংগাইরে র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কাওসার হোসেন (৪৫) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গত বুধবার রাত পৌনে ২টার দিকে চারিগ্রাম ইউনিয়নের দাশেরহাটি এলাকার আলম মার্ডার ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত কাওসার ডাকাত দলের সর্দার ছিলেন বলে দাবি র্যাবের। এছাড়া দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে তাদের দুই সদস্য আহত এবং ঘটনাস্থল থেকে কিছু গুলি ও অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশের বিশেষায়িত এ ইউনিটটি।
গত ডিসেম্বরে র্যাব ও এর কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর প্রায় চার মাস ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। ওই নিষেধাজ্ঞার পর র্যাবের সঙ্গে প্রথম ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটে গত ১৬ এপ্রিল। ওইদিন রাতে কুমিল্লায় সাংবাদিক মহিউদ্দিন সরকার নাঈম হত্যা মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ রাজু (৩৫) র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এরপর সিংগাইরের এ ঘটনা ঘটল। সেখানে তাদের একটি গাড়িতে হামলার পর গুলিবিনিময়ের ওই ঘটনা ঘটে বলে দাবি র্যাবের।
নিহত কাওসার হোসেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থানার জয়হার গ্রামের লোকমান হোসেনের ছেলে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় হত্যা ও ধর্ষণ এবং ১২টির বেশি ডাকাতির মামলা থাকার তথ্য জানিয়েছে র্যাব।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কারওয়ানবাজারের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলন শেষে সিংগাইরের ‘বন্দুকযুদ্ধের’ বিষয়ে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈনের কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা। তিনি বলেন, সিংগাইরে বুধবার রাতে র্যাবের একটি গাড়িতে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। পরে তাদের সঙ্গে র্যাব সদস্যদের গুলিবিনিময় হয়।
র্যাবের গাড়িতে সশস্ত্র হামলার ঘটনা এই প্রথম কি না এবং সেখানে ঠিক কী ঘটেছিল এমন প্রশ্নের জবাবে এ র্যাব কর্মকর্তা বলেন, ‘বুধবার রাতে র্যাবের একটি মাইক্রোবাস সাভার থেকে মানিকগঞ্জের দিকে যাচ্ছিল। মাইক্রোবাসটি লক্ষ্য করে অতর্কিতে গুলি চালানো হয়। যতটুকু আমি জেনেছি, গাড়িটিকে থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। এলাকাটি ছিনতাই ও ডাকাতিপ্রবণ এলাকা।’
হামলার মুখে পড়া মাইক্রোবাসটির পেছনে র্যাবের একটি টহল পিকআপ ছিল উল্লেখ করে খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘ওই রাস্তায় সাধারণত গাড়ি থামানো হয় না। অতর্কিতে সন্ত্রাসীরা র্যাবের গাড়িতে গুলি চালায়। এতে গাড়ির উইন্ডশিল্ড ও কাচ ভেঙে পড়ে। পরে গাড়ির পেছনে থাকা র্যাবের ব্যাকআপ টিমের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের গুলিবিনিময় হয়। এ ঘটনার পর র্যাবের ফরেনসিক টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। অন্য একটি দল অস্ত্রের খোঁজ শুরু করে। সেখানে বেশ কিছু দেশি-বিদেশি অস্ত্র ও এক ব্যক্তিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। র্যাব সদস্যরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান। ঘটনাস্থলে পরিচয় শনাক্তের ব্যবস্থা রয়েছে র্যাবের। হাসপাতালেই আঙুলের ছাপ মিলিয়ে জানা যায় ওই ব্যক্তির নাম কাওসার। তিনি একটি সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের সদস্য। র্যাব আগে থেকে তার নাম জানত না।’
এ র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘র্যাবের ওপর যে আঘাত তা নতুন নয়। কুমিল্লাতেও দেখেছেন গুলি করা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে, মাদকবিরোধী অভিযান হয়েছে, সেখানে হামলা হয়েছে। এতে আমাদের ২৯ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন। এক হাজারের অধিক সদস্য আহত হয়েছেন, যেটা কয়েক দিন আগে কুমিল্লাতেও হয়েছে।’
এদিকে র্যাব বন্দুকযুদ্ধের কথা জানালেও ঘটনাস্থলের আশপাশের জনবসতির একাধিক বাসিন্দা বলেছেন, তারা গভীর রাতে গোলাগুলির কোনো শব্দ পাননি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিংগাইর থানার ওসি সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহত ডাকাতের লাশের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে পাঠায়।’
দেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের জন্য র্যাবের সমালোচনা করে এগুলো বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিল। যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও এর ছয়জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে স্বাগত জানিয়েছিল এবং এরপর চার মাস কথিত বন্দুকযুদ্ধের আর কোনো খবর গণমাধ্যমে আসেনি। সম্পতি কুমিল্লায় এবং বুধবার রাতে সিংগাইরের ঘটনার মধ্য দিয়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধ আবারও ফিরে এলো।
