দ্রুত উষ্ণায়নে বাড়বে বজ্রপাত কালবৈশাখী

আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২২, ০২:১৮ এএম

গত ১০০ বছরে পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়েছে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর বাংলাদেশে গত ২০ বছরেই মার্চ-মে এই তিন মাসে গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ অবস্থা চলতে থাকলে ২০৭০ সালের মধ্যে এ সময় বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বাড়বে ২.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এতে করে বাড়বে কালবৈশাখীর প্রকোপ, বাড়বে বজ্রপাত। সম্পদহানির পাশাপাশি মানুষের মৃত্যু বাড়ারও আভাস রয়েছে।

বাংলাদেশের ওপর বিশ্বব্যাংকের গবেষণা ও আবহাওয়া অধিদপ্তর আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদের গবেষণা থেকে এ তথ্য উঠে এসেছে।

এ অবস্থায় গতকাল শুক্রবার (২২ এপ্রিল) বাংলাদেশে পালিত হয়েছে বিশ^ ধরিত্রী দিবস। এ দিনে ঢাকার ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ৮৩ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় বয়ে গেছে। এটা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী কালবৈশাখী ঝড়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকাসহ সারা দেশে কালবৈশাখীর মাত্রা বাড়বে এবং তা কখনো কখনো সাইক্লোনের মাত্রায় পৌঁছবে। তারা বলছেন, পৃথিবী যে হারে উত্তপ্ত হচ্ছে তার থেকে বেশি হারে হচ্ছে বাংলাদেশ। এর ফলে গ্রীষ্মকালে উত্তাপ বাড়ছে। তাই এ স্বল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে, বাকি সময় বৃষ্টিপাত কম হচ্ছে। বজ্রপাত, কালবৈশাখী ও তাপপ্রবাহ দ্বিগুণ হবে। এ কারণে মৃত্যুও বাড়বে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত মার্চ মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে তাপমাত্রা ১.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। চলতি এপ্রিল মাসের গতকাল পর্যন্ত তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস   পৃষ্ঠা ২ কলাম ১  বেশি ছিল। স্বল্প সময় অধিক বৃষ্টিপাত হলে শহরাঞ্চলে নালাগুলো উপচে পড়ে, এতে করে বাড়ে ডেঙ্গুজ্বরের প্রকোপ। তাছাড়া তাপপ্রবাহ বাড়লে ডায়রিয়াসহ নানান ধরনের রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ে।

এ বিষয়ে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাকৃতিক আরও দুর্যোগের সম্পর্ক রয়েছে।’

বাড়ছে বজ্রপাত, মরছে গরিব কৃষক : সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সারা দেশে কালবৈশাখীর প্রকোপ যেমন বেড়েছে তেমনি বজ্রপাতও বেড়েছে। বজ্রপাতে বাড়ছে মানুষের মৃত্যু।

ফিনল্যান্ডের বজ্রপাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ভাইসালার হিসাবে, বাংলাদেশে ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৪০ লাখ বা তার বেশিসংখ্যক বজ্রপাত হয়। আর ২০২০ সালে বজ্রপাতের সংখ্যা ছিল সারা দেশে ২৫ লাখের কিছু কম। ভাইসালার হিসাবে, বজ্রপাতে গত বছর ১৪৪ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা আগের দুই বছরের চেয়ে কিছুটা কম।

বাংলাদেশে সব থেকে অস্বাভাবিক বজ্রপাত হয়েছিল ২০১৬ সালে। ওই বছর প্রায় ৪৩ লাখ বজ্রপাত হয় আর এতে মারা যায় ২৬৩ জন। সে বছর বাংলাদেশ সরকার বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর ৭০ শতাংশ ঘটনা ঘটে কৃষিকাজ করার সময়। এছাড়া বাড়ি ফেরার পথে সাড়ে ১৪ শতাংশ এবং গোসল করা ও মাছ ধরার সময় ১৩ শতাংশ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের বজ্রপাতের পর গবেষণা চালিয়েছে। তারা বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮৪ লাখ বজ্রপাত হয়, যার ৭০ শতাংশই হয় এপ্রিল থেকে জুন মাসে। ২০১৩ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মারা গেছে ১ হাজার ৮৭৮ জন এবং তাদের ৭২ শতাংশই কৃষক।

দেশে মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে সব থেকে বেশি বজ্রপাত হয়। বর্ষা আসার আগের এ সময়ে কৃষকরা ফসল কাটা ও আবাদে ক্ষেতখামারে ব্যস্ত থাকেন। শহরের চেয়ে গ্রাম এলাকায় বজ্রপাতে মৃত্যুর হার বেশি। এর কারণ সম্পর্কে গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, ঢাকাসহ বড় শহরে বেশিরভাগ ভবনে বজ্রপাত প্রতিরোধক দণ্ড রয়েছে। এর ফলে শহরে মানুষের মৃত্যু কম। কৃষিকাজে খোলা আকাশের নিচে থাকার সময় কৃষকদের বজ্রপাত থেকে সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। তাই সেখানে মৃত্যু বেশি হয়। যদিও সরকার বজ্রপাত থেকে কৃষকদের রক্ষা করতে সারা দেশে ১৩ লাখ তালগাছ লাগানোর প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, সেগুলোর কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে তা জানা যায়নি। সরকার এখন হাওর এলাকায় খোলা আকাশের নিচে দণ্ড স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে বজ্রপাত থেকে কৃষককে রক্ষা করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত