পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্বহীন মুসলিম সমাজ

আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২২, ১০:৩০ পিএম

ভারতের অবস্থা যে ভয়াবহ তা এখন, নতুন করে বলার নয়। আজ দিল্লির, জাহাঙ্গীর পুরীতে দাঙ্গা হচ্ছে, তো কাল উত্তর প্রদেশের কোনো জেলায় বা অন্য কোথাও। ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বড় অস্ত্র জনমনে বিপুল ভয় চারিয়ে দেওয়া। এই কাজটি, অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে চলেছে ‘আরএসএস’ ও ‘সংঘ পরিবার’-এর মাতব্বরেরা। এদেশকে ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ বানাতে তারা নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের মনে যে ‘ফিয়ার সাইকোলজি’ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন নিয়মিত, তার পরিণতিতে সারা দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজন প্রবল নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

‘কাশ্মীর ফাইলস’-এর মতো আদ্যন্ত মিথ্যে একটি সিনেমাকে খোদ দেশের মন্ত্রী, আমলা, সভাসদেরা নির্লজ্জ চাটুকারিতায় যেভাবে উচ্ছ্বসিত হয়ে দারুণ দারুণ বলে পিঠ চাপড়াচ্ছেন তাতে কখনো কখনো মনে হচ্ছে, ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হবে কবে ঠিক না থাকলেও ইতিমধ্যেই জোর করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক করার কাজটা প্রায় সম্পন্ন হয়ে গেছে।

দিল্লি, রাজস্থান, কর্নাটক, উত্তর প্রদেশ, মধ্যে প্রদেশ, এমন কোনো রাজ্য নেই যেখানে দাঙ্গা হচ্ছে না। বলা ভালো ‘জেনোসাইড’ ঘটছে রাজ্যে রাজ্যে। দাঙ্গা হয় দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে। ভারতে এখন যা ঘটছে তা পরিকল্পিতভাবে একটি সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনা।

পশ্চিমবঙ্গ যে নিশ্চিন্তে আছে তাও কিন্তু নয়। এখানে হালফিল যত গোলমাল হয়েছে তাতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আক্রান্ত হয়েছে মুসলমান। তরুণ ছাত্রনেতা আনিস খাঁনকে পুলিশ ছাদ থেকে ফেলে খুন করেছে এমন অভিযোগ উঠেছে। বীরভূমের রামপুরহাটের বাগটুই গ্রামে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে এক পরিবারের বেশ কয়েকজন নারী ও শিশুকে। এরা দাঙ্গার কারণে খুন হননি। একথা ঠিক।

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের গ্রামে গ্রামে যে রাজনৈতিক হানাহানি তার পরিণতিতে মার খায় গরিব মুসলমান লোকজন। এখানে কথায় আছে যে, ‘মারে মুসলমান’ ও ‘মরেও মুসলমান’। অর্থনীতিতে পিছিয়ে থাকার কারণেই মুসলমান আজ এ বঙ্গে রাজনৈতিক দাবা খেলার বোড়ে মাত্র। ফলে দক্ষিণ ও উত্তরবঙ্গের সব জেলাতেই মৃতদের তালিকায় সবসময় জ্বলজ্বল করে কোনো না কোনো শেখ, রহমান, উদ্দীন বা সরকারের নাম। অনেক দিন আগে আসামের এক জনপ্রিয় ডাক্তার বলেছিলেন যে, একটা সমাজ কত পিছিয়ে তা বোঝা যায় হসপিটালে ও কোর্টে গেলে। পশ্চিমবঙ্গের কোর্ট, জেলখানা, সরকারি হসপিটাল যেখানে যান গরিবস্য গরিব মুসলমানদের ভিড় দেখে বুঝতে পারবেন একটা সমাজ কতটা পিছিয়ে আছে, স্বাধীনতার এত বছর বাদেও। সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সব দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকার কারণে অধিকাংশ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে তারা হয়ে ওঠেন নিতান্তই লেঠেল। কোথাও কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিকেশ করতে এমন মুসলমানদের জুড়ি নেই। পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্গের আধিপত্যবাদী সমাজে বাঙালি মুসলমান ব্রাত্য। যতদিন যাচ্ছে তত একটা সমাজ পুরোপুরি ‘ররা’ আর ‘আমরা’-তে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। ‘ওরা সন্ত্রাসবাদী’ আর ‘আমরা নিপাট ভালো মানুষ’। শুধু মাঝেমধ্যে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মেয়েদের কবর থেকে তুলে ধর্ষণের নিদান দিই। ওরা খুব গোঁড়া। আমরা উদার। তাই চারপাশে হুহু করে বাড়ছে মন্দির। ওরা মাইকে তারস্বরে আজান দিয়ে নাগরিকদের ঘুম ভাঙায়। আমরা শুধু অস্ত্র হাতে মিছিল করি ও তারস্বরে বলতে থাকি, ‘হিন্দু, হিন্দি হিন্দুস্তান, মুসলিম ভাগো পাকিস্তান’।

অন্য রাজ্যের মতো এ রাজ্যের মুসলমানদের বড় অংশ শহুরে নয়। গ্রামের বাসিন্দা। সংখ্যায় কম না। মোট জনসংখ্যার আটাশ ঊনত্রিশ শতাংশ হবে। এই পড়শিদের সঙ্গে আমার পরিচয় দশ-বারো বছরের বেশি নয়। তার আগে কফি হাউজে বসে রাজা-উজির মারতে মারতে পাশের গাঁ-গঞ্জে কোথাকার কে রোগা জিরজিরে চেহারার লুঙ্গি গায়ে মাছ ধরছে বা জমি চাষ করছে সেদিকে ফিরেও দেখিনি। আমরা তখন অনেক বেশি ব্যস্ত থেকেছি লেনিন বা গ্রামশি অথবা কুরোসাওয়া চর্চায়। রাজেন্দ্র সাচারের পাল্লায় পড়ে একটু আধটু পড়শিদের তত্ত্ব তালাশ করা।

পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজের কোমর ভেঙে গেছে ১৯৪৭ সালেই। ওপারে চলে গেছেন বা যেতে বাধ্য হয়েছেন এলিট, মিডল ক্লাস বাঙালি মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ। এপারে থেকে গেছেন হতদরিদ্র সিংহভাগ। চাষি, জেলে, ক্ষেতমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ইত্যাদি। ৪৭ সালের পরেও নানা সময়ে নানাভাবে তাদের ওপর দিয়ে ঝড়ঝাপটা কম যায়নি। এখন অবশ্য ধীরে হলেও অবস্থা কিছু পাল্টেছে। সংখায় কম হলেও এক মধ্যবিত্ত শ্রেণি মুসলমান সমাজে উঠে আসছে। শিক্ষক, অধ্যাপক, বড় ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, লেখক, সম্পাদক, আপনি এখন পশ্চিমবঙ্গের মুসলিম সমাজে খুঁজে পাবেন। আনুপাতিক হারে দেখতে গেলে মোটামুটি হিসাবে সংখ্যাটা হবে আশি ও কুড়ি শতাংশ। বলাবাহুল্য আশির রোজগার মাসে মেরে কেটে দশ-বারো হাজার। অন্যদিকে কুড়ি শতাংশ মধ্যবিত্ত, এলিট। তাদের আয় মোটের ওপর দু থেকে তিন লাখ। ওই কুড়ি শতাংশের ভেতরে ধনীদের গুনতিতে ধরতে হবে। এদের অনেকেই কয়েক বছরে, যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তাদের সঙ্গে গা ঘষাঘষি করে নিজেদের আখের ভালোমতন গুছিয়ে নিয়েছেন।

এদের কেউই সে অর্থে ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট নয়। ফাটকা পুঁজির দৌলতে নব্যধনী। এদের প্রায় কারোরই নিজের কমিউনিটির ওপর ন্যূনতম দায়বোধ ও মমত্ব নেই। পাশাপাশি পশ্চিমা ধনী মুসলিম ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পর্ক হাজার মাইল দূর। অনেকেই সদ্য গড়ে ওঠা অ্যাকাডেমিক ইনস্টিটিউশনের পৃষ্ঠপোষক হন, যত না শিক্ষা অনুরাগের কারণে তার চেয়ে অনেক বেশি সমাজে কেষ্ট-বিষ্টু সাজার তাগিদে। আরএসএস বা সংঘ পরিবারের চেয়ে এরাও মুসলিম জনতার বিপন্নতার জন্য কম দায়ী নন। সারা দেশে সংখ্যালঘু মুসলমান যখন অস্তিত্ব সংকটে, একের পর এক জায়গায় তারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তখন একশ্রেণির তথাকথিত মুসলিম মুরব্বি কয়েক লাখ টাকা খরচ করে হাসিমুখে সেজেগুজে ইফতার পার্টি করছেন। এরা না জানে মানবতা, না ইসলাম। ইসলাম জানলে জানতেন অপ্রয়োজনে টাকা খরচ করাও ধর্মসম্মত নয়।

সত্যিই পশ্চিমবঙ্গের আম মুসলিমদের দুর্ভাগ্য যে তাদের কোনো নেতা নেই। ভালো খারাপ যাই বলুন, দেশভাগের আগে সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক, আবুল হাশিমের মতো নেতা ছিলেন। পরেও জাহাঙ্গীর কবির বা সৈয়দ বদরুদ্দোজার মতো ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাদের কথা মুসলিম সমাজ শুনতেন। এখন এক একজন বামনের কথা তার মহল্লাতেই কেউ শুনতে চায় না।

কাগজ দু-একটা আছে। দৈনিক পুবের কলম ও দিন দর্পণ। দুটোই শাসক দলের তল্পিবাহক। ফলে সমাজের আসল সুখ-দুঃখ সেখানে উঠে আসে না। অন্যান্য বছরের মতো এবারও বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঈদ সংখ্যা বের হবে। কিন্তু তার সঙ্গে আবার মূল স্রোতের সাহিত্যের যোগাযোগ নেই। তার পেছনে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানসিকতাই নিশ্চিত দায়ী। তারা এতটাই উন্নাসিক যে পড়শি সাহিত্য কেমন হচ্ছে তা নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র কৌতূহল নেই। অথচ ইতিবাচক দিক হচ্ছে এই ক’বছরে অসংখ্য লেখক মুসলিম সমাজের মধ্য থেকে দ্রুত উঠে এসেছেন অসম্ভব ক্ষমতা নিয়ে। খালিদা খানুম, ইসমাইল দরবেশ, নাফিস আনোয়ার, আশরাফুল আমিন সম্রাট, আমিনুল ইসলাম, হাসিবুর রহমান, আলিমুজ্জামান, জিক্রাউল হক, নাসিরউদ্দিন মোল্লা, সৈকত আলী মোল্লা, সাবিনা ইয়াসমিন, মামুন হোসেন নির্ঝর এরকম আরও অজস্র নাম পশ্চিমবঙ্গের মূলধারার সাহিত্যকে আজ চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।

আপাত পিছিয়ে পড়া সমাজে অন্ধকার একটু একটু করেও কাটছে। আলো আসছে। মাথা উঁচু করে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলমান সমাজ নিশ্চিত আরও এগোবে। এগোতেই থাকবে।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত