করোনাকালীন সরকারের স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। তিনি বলেছেন, ওইসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মহামারী মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় খুবই স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করেছে। দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতে টিআইবি এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমাদের কেনাকাটা পুরোটা স্বচ্ছ। কিন্তু টিআইবি অস্বচ্ছ কাজ করেছে। দেশের স্বার্থে টিআইবির বিরুদ্ধে যদি আইনি ব্যবস্থা নিতে হয়, সরকার তা-ই করবে।
গতকাল সোমবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব লোকমান হোসেন মিয়া, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব সাইফুল হাসান বাদল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম উপস্থিত ছিলেন।
গত ১২ এপ্রিল টিআইবির একটি প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ‘করোনাভাইরাস সংকট মোকাবিলায় নমুনা পরীক্ষা, চিকিৎসা সেবা, টিকা ক্রয় ও প্রদান এবং প্রণোদনা বিতরণে উদ্বেগজনক বৈষম্য ও স্বচ্ছতার অভাব বিদ্যমান’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে টিআইবি বলে, জুলাই ২০২১-এ গণমাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে টিকাপ্রতি ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। পরে ১০ মার্চ ২০২২ তারিখে গণমাধ্যমে টিকা কার্যক্রমে মোট ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উল্লেখ করেন। অথচ গবেষণায় দেখা যায় টিকা ক্রয় ও টিকা কার্যক্রমের প্রাক্কলিত মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১২ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা থেকে ১৬ হাজার ৭২১ কোটি টাকা, যা স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রদত্ত হিসাবের অর্ধেকেরও কম।
এ ব্যাপারে সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বলেছিলাম ৪০ হাজার কোটি টাকার কথা। এর মানে এই নয় বাংলাদেশ সরকারের ৪০ হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। টিকা আনা, প্লেনের ভাড়া, রাখা, সিরিঞ্জের দাম, টিকাদান কর্মসূচি চালানো সব মিলিয়ে আমাদের খরচ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ২০ হাজার কোটি টাকা হলো যে সাড়ে ৯ কোটি ডোজ টিকা আমরা ফ্রি পেয়েছি সেটার দাম আমরা ধরে হিসাব করেছি। উপহার হিসেবে পাওয়া টিকার বেশিরভাগই ফাইজার, মডার্নার ওটারও তো একটা মূল্য আছে। সেটা যদি ধরি ২৫ হাজার কোটি টাকা ওই টিকার দামই আসে। দুটো মিলিয়ে আমরা বলেছি, বাংলাদেশের মানুষকে ৪০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের টিকা দিয়েছি।
টিআইবির জরিপের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘টিআইবি মাত্র ১০৫টি সেন্টার থেকে তথ্য সংগ্রহ করে জরিপটি করেছে। তাও টেলিফোনে মাত্র ১ হাজার ৮০০ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে। আমরা টিকা দিয়েছি ১২ কোটি ৮৪ লাখ মানুষকে। কোথায় ১৩ কোটি, কোথায় ১৮০০ মানুষ। টেলিফোনের মাধ্যমে কীভাবে রোগী এবং রোগীর পরিচয় শনাক্ত হলো সেটি ‘নিশ্চিত নয়’। এত কম মানুষের ওপর জরিপ হয় কীভাবে? এত ছোট পরিসরের জরিপে ‘অবশ্যই সঠিক তথ্য দেওয়া হয়নি’।
টিকা নিতে ঘুষ দেওয়ার যে অভিযোগ টিআইবি এনেছে, সেটিও সঠিক নয় বলে দাবি করেন জাহিদ মালেক। তিনি বলেন, (প্রতিবেদনে) বলা হয়েছে টিকা নিতে গড়ে ৬৭ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। এখন তো ৬৭ টাকা ফকিরও নেয় না।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি দেশের ভাবমূর্তি যেন উজ্জ্বল হয়, দেশের অবস্থান ভালো হয়। এটা আমাদের মনে সব সময় থাকে। কিন্তু অনেক সংস্থা, তার মধ্যে টিআইবিও হয়তো, সেইদিকটা তারা গুরুত্ব দেয় না।’
টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে বলে, ‘শুধু একটি দেশের ক্ষেত্রে টিকার ক্রয়মূল্য প্রকাশ না করার শর্ত থাকলেও অন্যান্য উৎস থেকে কেনা টিকার ব্যয় এবং টিকা কার্যক্রমে কোন কোন খাতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে তা প্রকাশ করা হয়নি।’
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ভারত থেকে সরকার যে দামে টিকা কিনেছে, তার কাছাকাছি দামে চীন থেকে টিকা কেনা হয়েছে। কোভ্যাক্স থেকে কস্ট শেয়ারিংয়ের মাধ্যমে ১০ কোটি ডোজ টিকা কেনা হয়েছে। আর কোভেক্স থেকে সাড়ে ৯ কোটি ডোজ টিকা বিনামূল্যে পেয়েছি। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে দেড় কোটি টিকা পাওয়া গেছে। সে পরিমাণ টাকা তাদের পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি দেড় কোটি টিকা পাওয়া যায়নি। তাই টাকাও দেওয়া হয়নি। আর ভারত থেকে ভবিষ্যতে টিকা নেওয়ার ইচ্ছা নেই বলে জানান তিনি। কারণ, সরকারের কাছে যথেষ্ট টিকার মজুদ আছে।
টিআইবি প্রতিবেদনের অসংলগ্ন তথ্য তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘টিআইবি বলেছে দেশের ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ করোনায় বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ মানে তো দেড় লাখ মানুষ। দেশে করোনায় ৩০ হাজারের কম মানুষ মারা গেছে, অথচ তারা বলছেন ৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ মারা গেছেন বিনা চিকিৎসায়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, (টিআইবির প্রতিবেদনে) বলা হয়েছে ৪০ লাখের বেশি ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি টিকা পায়নি। এটিও সঠিক তথ্য নয়। দেশে বর্তমানে ষাটোর্র্ধ্ব ব্যক্তি আছে ১ কোটি ২০ লাখের মতো। সরকার সবার আগে বয়স্ক ব্যক্তিদের টিকা দিয়েছে। তারপর অন্যান্য মানুষকে দেওয়া হয়েছে। কোথাও ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি টিকা পায়নি এমন কথা জানা যায়নি। এরমধ্যে যারা নেয়নি তারা ইচ্ছে করেই নেয়নি। তবে টিকাদানে সরকারের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি ছিল না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ল্যাব সংখ্যা কম, চিকিৎসা সেবা পায়নি মানুষ। অক্সিজেন ঘাটতি ছিল, আইসিইউ সংকটসহ আরও নানা বিষয়ে জরিপে বলা হয়েছে, যার কোনোটিই সত্যি নয়। দেশে কোথাও অক্সিজেন ঘাটতি হয়নি। আমেরিকার রেমডিসিভির ওষুধ সবার আগে বাংলাদেশে চলে এসেছে, সেটিও সরকার বিনামূল্যে দিয়েছে। এরপরও টিআইবি বলছে দেশে ওষুধের ঘাটতি ছিল।
টিআইবির প্রতিবেদন প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, মূলত টিআইবি স্বাস্থ্য খাতের অর্জনকে ম্লান করে দিতেই এই রিপোর্ট করেছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতকে যখন দেশে বিদেশে সবাই প্রশংসা করছে তখন তারা এরকম মনগড়া ও ভীত্তিহীন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি পড়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশকেই ইনট্রান্সপ্যারেন্ট মনে হয়েছে।
