পোশাক খাতের রপ্তানি যেমন বাড়ছে, তেমনি এর প্রধান প্রধান কাঁচামাল আমদানিও বাড়ছে। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) ৩৪৪ কোটি ১১ লাখ ডলারের ইয়ার্ন (তুলা, সিনথেটিক ও মিক্সড) আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে। এছাড়া কাঁচা তুলা ও সিনথেটিক ফাইবার আমদানিতে ২৬৭ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের ঋণপত্র এবং কাপড় ও আনুষঙ্গিক পণ্য আমদানিতে ৮১৮ কোটি ৫৩ লাখ ডলারের ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী আলোচিত ৯ মাসে এই তিনটি খাতে মোট ১ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের কাঁচামাল আমদানি করেন পোশাক রপ্তানিকারকরা, যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫৮ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত তৈরি পোশাক উদ্যোক্তারা রপ্তানি করেছেন ৩ হাজার ১৪২ কোটি ডলারের পণ্য। এই অঙ্ক আগের অর্থবছরের একই সময়ের থেকে ৩৩ শতাংশ বেশি। প্রাথমিক এই তথ্যে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে পোশাক রপ্তানির ৪৫ দশমিক ৫১ শতাংশ অর্থ কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে।
এদিকে পোশাকের কাঁচামাল আমদানির পাশাপাশি ভোগ্যপণ্য আমদানিতেও বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে আরও দেখা যায়, অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে গমের আমদানি ঋণপত্র খোলা বেড়েছে ৪২ শতাংশ। চিনির আমদানি ঋণপত্র খোলা বেড়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ। দুগ্ধজাত পণ্যের আমদানি ঋণপত্র খোলা বেড়েছে প্রায় ১১ শতাংশ, ভোজ্য তেল আমদানি ঋণপত্র খোলা বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ এবং ওষুধ আমদানি ঋণপত্র খোলা বেড়েছে ৫৬৭ শতাংশ।
আলোচিত ৯ মাসে গম আমদানির জন্য প্রায় ১৭৪ কোটি ডলারের আমদানি ঋণপত্র খোলেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া চিনি আমদানির জন্য ৮৭ কোটি ডলারের এলসি, দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির জন্য ২৮ কোটি ডলারের এলসি, ১৬২ কোটি ডলারের ভোজ্য তেল আমদানি এলসি এবং প্রায় ৫৫ কোটি ডলারের ওষুধ আমদানির এলসি খোলা হয় বিভিন্ন ব্যাংকে। অবশ্য কিছু ভোগ্যপণ্যের আমদানি ঋণপত্র খোলা কমেছে। ফলে এসব পণ্য অদূর ভবিষ্যতে আমদানি কমে আসবে বলে আশা করছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে চাল আমদানির জন্য বিভিন্ন ব্যাংকে ৩২ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের ঋণপত্র খোলা হয়েছে, যা এর আগের ২০২০-২১ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬৬ কোটি ডলার। সেই হিসাবে আলোচিত ৯ মাসে চাল আমদানির এলসি খোলা কমেছে ৫০ দশমিক ২৭ শতাংশ।
তবে একই সময়ে চাল আমদানির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৫৪ কোটি ডলারের, যা এর আগের অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে নিষ্পত্তি হওয়া ঋণপত্রের তুলনায় ২৯৫ শতাংশ বেশি।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, আগের অর্থবছরে চালের অনিষ্পন্ন এলসি বেশি ছিল। সেগুলোই চলতি অর্থবছরে নিষ্পত্তি হয়েছে। যে কারণে আলোচিত সময়ে চালের এলসি খোলা কমলেও নিষ্পত্তি বেড়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে আরও দেখা যায়, আলোচিত ৯ মাসে পেঁয়াজের আমদানি এলসি খোলা হয়েছে ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের, যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে খোলা এলসির তুলনা ৪ দশমিক ২৬ শতাংশ কম। তবে অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে পেঁয়াজ আমদানির এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
এছাড়া তাজা ও শুকনো ফল আমদানির ঋণপত্র খোলা কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ। নিষ্পত্তি কমেছে ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ। আলোচিত ৯ মাসে প্রায় ৪৪ কোটি ডলারের ফল আমদানির ঋণপত্র খোলা হয়, নিষ্পত্তি হয় প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের এলসি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বাড়ার কারণে আমদানি ব্যয় বেশি হয়েছে। তবে করোনায় কিছু কিছু পণ্যের কাটতি না থাকায় সেসব পণ্যের আমদানি ব্যয় কমেছে। এর মধ্যে খেজুর একটি অন্যতম পণ্য। গত দুই বছর করোনার কারণে সীমিত পরিসরে হজ পালন হয়। এ কারণে খেজুরের বিক্রি কমে যায়। সেসব খেজুর এ বছরও বিভিন্ন দেশ আমদানি করছে। বাজারে দামও তুলনামূলক কম।
তবে আলোচিত সময়ে শিল্প খাতের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তথ্য ঘেঁটে আরও দেখা যায়, আলোচিত ৯ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ঋণপত্র নিষ্পতি বেড়েছে ৪২ শতাংশ। এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৩৮১ কোটি ডলার। শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য ৫৩৫ কোটি ডলারের ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে।
