ডিপিপির তোয়াক্কা নেই তদারকি ছাড়াই অর্থ ছাড়

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২২, ০১:০৮ এএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়ম ভাঙাই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। যথাযথ তদারকি না করেই প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের অভিযোগ উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল কার্যালয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিতের পরই প্রকল্পের অর্থ ছাড়ের কথা। অথচ প্রকৌশল কার্যালয়কে প্রকল্প তদারকির দায়িত্বেই রাখা হয়নি। নিয়মানুযায়ী বিল তৈরির আগে মেজারমেন্ট বুকে প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষর করার কথা থাকলেও তাকে বাদ দিয়েই বিল তৈরি করা হয়েছে। এ পর্যন্ত তদারকি ছাড়াই এভাবে ঠিকাদারদের ৪১৪ কোটি টাকার বিল পরিশোধ হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন প্রকল্প পরিচালক। তার দাবি, প্রকৌশল কার্যালয় তদারকি না করলেও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান (ভাড়াটে) তদারকি করেছে।

ডিটেইল প্রজেক্ট প্ল্যান (ডিপিপি) ঘেঁটে দেখা যায়, সাত নম্বর পৃষ্ঠার ১১.২ ধারায় বলা আছে, ভিসির নিয়ন্ত্রণে ও তত্ত্বাবধানে প্রধান প্রকৌশলী, কম্পট্রোলার ও প্রকল্প পরিচালক প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য দায়বদ্ধ থাকবেন। এছাড়া ১২ পৃষ্ঠার ১৫.৪.৪ ধারায় বলা হয়েছে, যাবতীয় নির্মাণকাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল কার্যালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারদের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। প্রকৌশল কার্যালয় নির্মাণকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করবে। তবে এসব কথা ডিপিপিতে থাকলেও কাগজে-কলমে বাস্তবায়ন হয়নি। প্রকৌশল কার্যালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অদৃশ্য কারণে প্রকল্পের কাজে তাদের যুক্ত করা হয়নি। এমনকি প্রকল্পের বিল কিংবা তদারকির বিষয়ে তারা অবগত নন।

এদিকে সরকারি নীতি অনুযায়ী বিল তৈরির সময় মেজারমেন্ট বুকে প্রধান প্রকৌশলীর অনুস্বাক্ষর প্রয়োজন। তবে মেজারমেন্ট বইয়ে প্রধান প্রকৌশলীর পরিবর্তে প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে। যা নিয়মবহির্ভূত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এভাবে তদারকি ছাড়াই নতুন ছয়টি আবাসিক হল নির্মাণ এবং হলের সংস্কারকাজসহ অন্যান্য কিছু খাতে প্রায় ৪১৪ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টস ম্যানুয়াল অনুযায়ী, এক লাখ টাকার বেশি বিলের চেক কম্পট্রোলার এবং রেজিস্ট্রারের যৌথ স্বাক্ষরে প্রদান করতে হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক মো. নাসির উদ্দিনের লিখিত পরামর্শে সাবেক উপাচার্য ফারজানা ইসলাম গায়ের জোরে এ নিয়মের পরিবর্তন করেন। কম্পট্রোলার ও রেজিস্ট্রারের যেকোনো একজনের সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকের স্বাক্ষর দিয়েই বিলের চেক প্রদানের নিয়ম চালু করা হয়। একই সঙ্গে ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের আওতায় নতুন করে জনবল নিয়োগ না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন, প্রকৌশল, কম্পট্রোলার অফিসের বিদ্যমান জনবল নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি প্রকৌশল কার্যালয়কে যুক্ত না করে উল্টো নতুন করে জনবল নিয়োগ দিয়েছেন। যা ডিপিপি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘আমরা ইঞ্জিনিয়ার অফিসকে প্রকল্পের কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারাই যুক্ত হয়নি। এমনকি তাদের অফিসে পর্যাপ্ত জনবলও নেই। তবে প্রকল্পের কার্যক্রম দেখভাল করার জন্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো ফুলটাইম সুপারভিশন (তদারকি) করছে।’ এছাড়া মেজারমেন্ট বইয়ে প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, ‘এ প্রকল্পে ডিপিপির কোনো ব্যত্যয় হয়নি।’

প্রকল্পের কাজের তদারকির জন্য পর্যাপ্ত জনবল আছে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুস সালাম মো. শরীফ বলেন, ‘ডিপিপিতে প্রকল্পের কাজের তদারকি ও দায়বদ্ধতার দায়ভার প্রকৌশল অফিসকে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সে জায়গাটি পাশ কাটিয়ে তদারকির দায়িত্ব পালন করছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। অথচ প্রকৌশল অফিসকে তদারকির জন্য প্রস্তাবও দেওয়া হয়নি। এটি প্রকাশ্যে ডিপিপির ব্যত্যয়।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক নূরুল আলম বলেন, ‘আগে কী হয়েছে সেটা আমি বলতে পারব না। তবে এখন থেকে ডিপিপি ও অন্যান্য নিয়মকানুন মেনেই প্রকল্পের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।’ ইতিমধ্যে মেজারমেন্ট বইতে প্রধান প্রকৌশলীর স্বাক্ষর নেওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত