দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে থ্রি-হুইলার, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, নসিমন, করিমনসহ স্থানীয়ভাবে নির্মিত যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল একাধিকবার বন্ধ ঘোষণার পরও ২২ মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এসব যানবাহন। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক নেতা ও অসাধু পুলিশ সদস্যদের নির্লিপ্ততার কারণে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যাচ্ছে না। তাদের নিয়মিত টাকা দিয়েই সড়কে চলছে এসব যানবাহন। যার ফলে মহাসড়কে যানজট, দুর্ঘটনা ও মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। ঈদযাত্রা সামনে রেখে পুলিশ সদর দপ্তরের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
চাঁদাবাজিতে জড়িত পুলিশ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
মহাসড়কে থ্রি-হুইলারসহ সব ধরনের অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে গত সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ও পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি হাইওয়ে পুলিশকেও এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে পুলিশের একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহাসড়কে কোনো অবৈধ যানবাহন চলাচল করতে পারবে না। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ কেউ না মানলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদকে কেন্দ্র করে রাস্তায় ওইসব যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।’
এর আগে গত ১৯ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত বৈঠকে মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বলা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সাফ জানিয়ে দেন, থ্রি-হুইলারসহ কোনো অবৈধ যানবাহন চলতে পারবে না সড়ক-মহাসড়কে। কিন্তু মন্ত্রণালয় বা মন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারির পরও অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ না হওয়ায় পুলিশ সদর দপ্তরের কয়েকটি দল সারা দেশে মহাসড়কগুলোতে অনুসন্ধানে নামে। এরপরই ওই প্রতিবেদন দেওয়া হয়। প্রতিবেদন অবৈধ যানবাহন ছাড়াও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের তথ্য পাওয়া যায়। এসব যানবাহনের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-খুলনা, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহসহ দেশের সবকটি মহাসড়কে দেদার অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে। যানবাহনগুলোর বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রায়ই ঘটছে নানা দুর্ঘটনা। গত এক বছরের ব্যবধানে যত দুর্ঘটনা ঘটেছে তার সিংহভাগই ঘটেছে টমটম, নছিমন বা ফিটনেসবিহীন যানবাহনের কারণে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহনও চলছে। এসব যানবাহন রাস্তা থেকে তুলে নিতে নানা উদ্যোগ নিলেও প্রভাবশালীদের কারণে সম্ভব হচ্ছে না।
কোন মহাসড়ক-সড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে তার একটি তালিকাও করা হয়েছে। কারা চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত তাও চিহ্নিত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান।
বছর তিনেক আগে সড়ক ও যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) ঘোষণা দিয়েছিল যে লক্কড়ঝক্কড় গাড়ি মহাসড়কে নামতে পারবে না। যেসব গাড়ির ফিটনেস শেষ হয়ে গেছে সেগুলো রাস্তায় নামানো যাবে না। কিছুদিন আগে মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত একটি বৈঠকেও রাস্তায় ওইসব যানবাহন চলাচল করতে পারবে না বলে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু তাও কার্যকর হচ্ছে না।
হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মল্লিক ফখরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মহাসড়কে থ্রি-হুইলারসহ সব ধরনের অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশের কোনো সদস্য এসব যানবাহনের চালকদের কাছ থেকে কোনো ধরনের চাঁদা বলেন আর টাকা বলেন, তা আদায় করার প্রমাণ মিললে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১০ সালের ৩১ জুলাই মানিকগঞ্জের শিবালয়ের উথুলী পাটুরিয়ার মোড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু ও মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব রাজিয়া বেগম এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তৎকালীন চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান মারা যাওয়ার পর টনক নড়েছিল প্রশাসনের। ওই বছর ২১ সেপ্টেম্বর তখনকার যোগাযোগ মন্ত্রণালয় প্রাইভেট কার ও বাসচালকদের সিটবেল্ট বাঁধা ও মোটরসাইকেল আরোহীদের হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে। তার পাশাপাশি পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করতেই হবে। টমটমসহ স্থানীয় যান্ত্রিক যান, জরাজীর্ণ ও লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন মহাসড়কে চলতে পারবে না। কেউ আইন অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে জেল-জরিমানা করা হবে। এ নির্দেশের পর প্রথম কয়েক দিন পুলিশ লোক দেখানো অভিযান চালায়। পরে এ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৫ সালের ১ আগস্ট থেকে দেশের ২২টি মহাসড়কে থ্রি-হুইলার, অটোরিকশা, অটোটেম্পো ও অযান্ত্রিক যানবাহনের চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এমনকি একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশের কারণেই সড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা যাচ্ছে না। লোক নিয়োগ করে তারা নিয়মিত অবৈধ যানবাহন থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা আদায় করে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও জেলা-উপজেলার রাজনৈতিক নেতাদের কাছে এ টাকার ভাগ যায় বলেও আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডকে জানানো হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, মহাসড়কে চিরতরে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে কিছুদিন আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে রেঞ্জ ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠানো হয়েছে। আরও জোরালো অভিযান চালাতে হাইওয়ে পুলিশকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কিছুদিন আগে সরেজমিন কুমিল্লা ও ফেনীর সড়ক-মহাসড়কে দেখা গেছে, দেদার অবৈধ যানবাহন চলাচল করছে। পুলিশ দেখেও না দেখা ভান করে। কুমিল্লার পদুয়ারবাজার, কোটবাড়ী, আলেখারচর, ময়নামতি, নিমসার, চান্দিনা, গৌরীপুর, দাউদকান্দি, সুয়াগাজী, চৌদ্দগ্রাম, ফেনীর মহিপালসহ সবকটি মহাসড়কে অবৈধ যানবাহন চলাচল করতে দেখা গেছে।
মহাসড়কে চলাচল করা যানবাহন চালকদের কয়েকজন জানান, থ্রি-হুইলার, অটোরিকশা, নসিমন থেকে প্রতিদিন ১ হাজার ৫০০ থেকে শুরু করে ৩০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। টাকা তোলে পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের পক্ষে তাদের লোকজন। টাকার বিনিময়ে মহাসড়কের ওপরই গাড়ি রাখতে পারে চালকরা।
