মশার ব্যাপক উৎপাত আর মশার কামড় থেকে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগের শঙ্কার মধ্যেই রাজধানী ঢাকায় মশা সংক্রান্ত একটি সুখবর পাওয়া গেল। সুখবর এই যে, রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর জীবাণু বহনকারী এডিস মশার চেয়ে সাধারণ কিউলেক্স ও অন্যান্য পূর্ণাঙ্গ মশাই বেশি। এখানে ৫ দশমিক ১ শতাংশ এডিস মশার বিপরীতে কিউলেক্স ও অন্যান্য পূর্ণাঙ্গ মশা পাওয়া গেছে ৯৪ দশমিক ৯ বা ৯৫ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাক-মৌসুম এডিস জরিপে এই তথ্য উঠে এসেছে। জরিপে এটাও জানা গেছে যে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের চেয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে এডিস মশার ঝুঁকি বেশি। জরিপে প্রাপ্ত তথ্যকে স্বস্তিকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, উত্তরের চেয়ে দক্ষিণে ঝুঁকি বেশি হলেও সামগ্রিকভাবে কোনো সিটি করপোরেশনেই এডিস মশা থেকে রোগ সংক্রমণের পরিস্থিতি চরম বিপর্যয়ে নেই। ডেঙ্গু রোগের মৌসুমের আগে আগে এটা রাজধানীবাসীর জন্য সুখবরই বটে। কিন্তু ঢাকায় এমন সুখবর থাকলেও সারা দেশে মশা নিয়ন্ত্রণ পরিস্থিতি খুব আশাব্যঞ্জক তা বলা যাবে না।
কোনো জায়গায় এডিস মশার প্রজননের আশঙ্কা কতটুকু, সেই মাত্রার পরিমাপককে ব্রুটো ইনডেক্স বলে। ব্রুটো ইনডেক্স ২০ শতাংশের ওপরে যত বেশি হবে সংক্রমণের ঝুঁকি তত বেশি। সে হিসেবে রাজধানী ঢাকার মাত্র তিনটি ওয়ার্ডে ব্রুটো ইনডেক্স স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি, ২৩ দশমিক ৩৩-২০ শতাংশ পর্যন্ত। খেয়াল করা দরকার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরিপ অনুযায়ী, এডিস মশার লার্ভা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে মেঝেতে জমানো পানিতে, যা ২৪ শতাংশ এবং প্লাস্টিকের ড্রামে, ২২ শতাংশ। এ ছাড়া প্লাস্টিকের বালতিতে ১৪, সিমেন্টের পানির ট্যাংকে ১০ দশমিক ৫৩, ফুলের টবে ৪, মেটাল ড্রামে ২ দশমিক ৩৪, প্লাস্টিক মগ-পাত্র-বদনায় ২ দশমিক ৩৪, প্লাস্টিকের পানির ট্যাংকে ২ দশমিক ৩৪ এবং অন্যান্য বস্তুতে ৪ শতাংশ মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। জরিপে দেখা যাচ্ছে এডিস মশার সবচেয়ে বড় প্রজননক্ষেত্র নির্মাণাধীন ভবন যা ৪২ শতাংশ। এছাড়া বহুতল ভবনে ৩১, সেমিপাকা বা বস্তি এলাকায় প্রায় ১০ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই জরিপে যেসব এলাকায় এডিসের বেশি ঘনত্ব পাওয়া গেছে তার বিস্তারিত ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে জানিয়েছে। এখন সেসব স্থানে পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালাতে হবে।
ঢাকায় এডিস মশার শঙ্কা নিয়ে স্বস্তি থাকতে পারে। কিন্তু ঢাকায় ৯৫ শতাংশ কিউলেক্স মশার কামড় নিয়ে অস্বস্তির শেষ নেই। আশার খবর এটুকুই যে, কিউলেক্স মশার কামড়ে যেসব রোগ ছড়ায়, তা ঢাকায় নেই। এ ধরনের মশার কামড়ে গোদ রোগ বা ফাইলেরিয়াসিস, জাপানিস এনকেফালাইটিস রাজশাহী ও রংপুর অঞ্চলে আছে। মনে রাখা দরকার, এডিস মশা উৎপাদনের অধিকাংশ ক্ষেত্রই মানুষ-সৃষ্ট। এ অবস্থায় স্থানীয়দের সচেতনতা ও সাহায্য ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ কিংবা ডেঙ্গু প্রতিরোধ কোনোটাই সম্ভব নয়। তাই স্থানীয় পর্যায়ে মানুষকে পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিয়ন্ত্রণ অভিযানে সম্পৃক্ত করতে হবে। রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা এবং খালের দায়িত্ব ওয়াসার কাছ থেকে এখন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব তাদের যথাযথভাবে পালন করতে হবে। একইসঙ্গে মনোযোগ দিতে হবে রাজধানীর সমস্ত সরকারি, আধা-সরকারি ভবনের ছাদ নিয়মিত পরিষ্কার করার বিষয়ে। কেননা এই স্থানগুলো মশার বড় প্রজননক্ষেত্র হলেও এসব পরিষ্কারের জন্য সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায় না।
কেবল এডিস আর কিউলেক্সই নয়, বাংলাদেশে মোট ১২৩ প্রজাতির মশা রয়েছে। এখন ঢাকায় প্রায় ১৪ প্রজাতির মশা পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মশা সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে মশার প্রজাতি ও আচরণভেদে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আলাদা হতে হবে। মশাকে সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনার। কিন্তু বর্তমানে দেশের ৬৪ জেলায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া পরও সারা দেশের জন্য মশা নিয়ন্ত্রণের কোনো কেন্দ্রীয় ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা দেখা যাচ্ছে না। অথচ জনস্বাস্থ্যবিদ ও কীটতত্ত্ববিদরা বলছেন, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, গোদ, জাপানিজ এনকেফালাইটিসসহ আরও অনেক রোগের বাহক মশা। দেশে প্রতি বছর এসব রোগে লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়। এজন্য একটি কেন্দ্রীয় মশকনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। যারা মশা নিয়ে গবেষণা করবে এবং মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। পৃথিবীর একাধিক দেশে এমন প্রতিষ্ঠান আছে। দেশকে ম্যালেরিয়ামুক্ত করা এবং ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ থেকে মুক্তির জন্য এমন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান জরুরি।
