পবিত্র রমজান মাস শুরুর পর কয়েক দিনে ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় আল আকসা মসজিদে নামাজরত কয়েকজন ফিলিস্তিনি নিহত ও কয়েকশ আহত হয়েছেন। অনেক মুসল্লিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর পরও রমজানের তৃতীয় শুক্রবার আল আকসা মসজিদ চত্বরে দেড় লাখের বেশি মুসল্লি জুমা আদায় করেছেন। আজ চলতি রমজানের শেষ শুক্রবার। ধারণা করা হচ্ছে, আজকের জুমায় বায়তুল মোকাদ্দাসে দুই লাখের বেশি মুসল্লি সমবেত হবেন।
রমজানের শেষ শুক্রবার ফিলিস্তিনি মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েলি জবরদখল থেকে মুক্তি এবং বায়তুল মোকাদ্দাসের সব পবিত্র স্থান উদ্ধারের উদ্দেশ্যে ফিলিস্তিনিরা স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত। তাদের এই দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে ১৯৭৯ সাল থেকে রমজান মাসের শেষ শুক্রবার ‘বিশ্ব কুদস দিবস’ পালিত হয়ে আসছে। এই দিবস পালনের উদ্দেশ্য, আল আকসার মুক্তি ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্ববাসীর একাত্মতা ঘোষণা এবং সহমর্মিতা প্রকাশ।
চলতি রমজানে দখলদার ইসরায়েল যখন ফিলিস্তিনে নৃশংসতা চালায়, তখন সারা বিশ্বের দৃষ্টি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে। তাই গণমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার বিষয় সেভাবে বাড়তি মনোযোগ দেখা যায়নি। অথচ দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনের জনগণ নিদারুণ কষ্ট ও বেদনাদায়ক জীবনযাপনে বাধ্য হচ্ছেন। তারা নিজ দেশে পরাধীন, উদ্বাস্তু। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শোষণ ও বঞ্চনার শিকার। এর ওপর ক্ষণে ক্ষণে বর্ণবাদী সেনাদের নিষ্ঠুরতম হামলা ফিলিস্তিনিদের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি দখলদারি অভিযানের পর থেকেই আল আকসা বারবার আক্রান্ত হয়ে আসছে।
১৯৪৮ সালে ব্রিটেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ফিলিস্তিনিদের ভূমি জবরদখলের মাধ্যমে অবৈধ ইসরায়েল রাষ্ট্রের গোড়াপত্তনের পর থেকেই বর্ণবাদী ইহুদিদের হাতে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের মার খাওয়ার ইতিহাস শুরু, যা চলছে অদ্যাবধি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ঝরছে রক্ত। আকাশ ছুঁয়েছে লাশের পাহাড়। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা দমেনি। মাতৃভূমি এবং ধর্মীয় পবিত্র স্থান দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করতে তারা নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে দশকের পর দশক ধরে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আল আকসায় নামাজরত মুসল্লিদের ওপর হামলা এত ঘন ঘন ও নিয়মিত ঘটছে। বিশেষ করে, রমজান মাসে নামাজরত মুসল্লিদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো অনেকটাই নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আর পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এসব খবর কোন কায়দায় পরিবেশন করবে তা-ও সবার মুখস্থ। মূলধারার সংবাদমাধ্যম এসব খবর এমনভাবে পরিবেশন করে, যাতে মনে হবে উত্তেজনার জন্য ফিলিস্তিনিরা দায়ী। শতাধিক ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার তথ্য দেওয়া লাইনে অত্যন্ত সুকৌশলে ফিলিস্তিনিদের পাথর ছোড়ার তথ্য জুড়ে দিয়ে সেটিকে ভয়ংকর সন্ত্রাসী তৎপরতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
মক্কার কাবা শরিফ, মদিনার মসজিদে নববির পর আল আকসা মসজিদ মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র জায়গা। হজরত ইবরাহিম (আ.), হজরত ইসমাঈল (আ.), হজরত ইয়াকুব (আ.), হজরত ইয়াহইয়া (আ.), হজরত দাউদ (আ.), হজরত সুলাইমান (আ.), হজরত জাকারিয়া (আ.), হজরত মুসা (আ.), হজরত ঈসা (আ.)-সহ ইসলামের অসংখ্য নবী-রাসুলের স্মৃতিবিজড়িত স্থান জেরুজালেম। বায়তুল মোকাদ্দাস মুসলমানদের প্রথম কেবলা। মিরাজের রাতে নবী কারিম (সা.) এই মসজিদেই সব নবীকে নিয়ে নামাজ আদায় করেছিলেন।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর (রা.) জেরুজালেম জয়ের পর বিজয়ীদের সঙ্গে যে নমনীয় ব্যবহার করেছিলেন, তা সমগ্র মুসলিম জাতির জন্য এক অনন্য শিক্ষা হয়ে আছে। এসব কারণে আল আকসায় ইসরায়েলি হামলাকে শুধু ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের আগ্রাসন হিসেবে দেখলে হবে না। আল আকসার অসম্মান বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জন্য অপমান। আর প্রতিবছর নিয়ম করে সেখানে রোজার মাসে মুসলমানদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর এই আক্রমণ মূলত সমগ্র মুসলমানদের ওপর উগ্র ইহুদিবাদীদের নির্লজ্জ আগ্রাসন।
ফিলিস্তিন সংকটের বিষয়ে মুসলিম বিশ্বের মনোযোগের একমাত্র কারণ এটা নয় যে, মুসলমানদের একটি ভূখণ্ড জবরদখলের কবলে পড়েছে। এর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়। আল আকসা এবং তার আশপাশের এলাকা বহু নবীর স্মৃতিবিজড়িত। এখানে রয়েছে অনেক নবী-রাসুলের মাজার। তাই এ পবিত্র নগরের প্রতি ভালোবাসা প্রত্যেক মুসলমানের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত।
অন্যদিকে আল আকসায় মুসলমানদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের ভয়ংকর দুরভিসন্ধি। ইসরায়েল ও পশ্চিমা পক্ষ আল আকসাকে মুসলমান ও ইহুদিদের মধ্যে দুই ভাগ করে দেওয়ার পক্ষপাতী। এর আগে ঠিক একই কায়দায় আল খলিল শহরে (হিব্রুভাষীরা শহরটিকে বলে ‘হেবরন’) এর আগে ইসরায়েল ইবরাহিমি মসজিদ দখল করে নিয়েছে। ইসরায়েলের উগ্রপন্থিরা মসজিদে আকসার চত্বরের হারাম শরিফ (টেম্পল অব মাউন্ট) ধ্বংস করে সেখানে তাদের উপাসনালয় বানাতে চান। আল আকসা ভাগের দাবি নতুন নয়। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখল করে নেওয়ার (এই দখলদারী এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অবৈধ বলে সাব্যস্ত) পর থেকে ইসরায়েল সেখানে ইহুদিদের উপাসনার স্থান নির্মাণের দাবি তুলে আসছে। যদিও ইসরায়েল আইন করেছে, আল আকসা চত্বরে ইহুদিরা যেতে পারবে, কিন্তু কোনো অবস্থায় সেখানে তাদের ধর্মীয় প্রার্থনা করতে পারবে না। অথচ এক দশক ধরে কট্টর ইহুদিবাদীরা নতুন দাবি তুলে বলছে, হারাম শরিফের স্থলে প্রাচীনকালে তাদের উপাসনালয় ছিল। এ কারণে সেখানে তারা তাদের উপাসনালয় চান।
মুসলিম বিশ্বের কাছে বায়তুল মোকাদ্দাস কোনো একটি জাতি কিংবা গোষ্ঠীর বিষয় নয়। বরং তা গোটা মুসলিম উম্মাহর সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে সব মুসলিম দেশের সরকার ও জাতিগুলোর বায়তুল মোকাদ্দাস রক্ষার বিষয়ে দায় রয়েছে। এ দায়িত্বের কিছুটা হলেও পূরণ হয় কুদস দিবস পালনের মাধ্যমে। মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও অনুভূতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা পবিত্র স্থানটি জবরদখলের পর থেকে বর্ণবাদী ইহুদিদের হাতে পড়েছে। এটা মুসলিম বিশ্বের জন্য ভীষণ কষ্টকর। সেই কষ্টের বহিঃপ্রকাশ, নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে থাকার অঙ্গীকার মুসলমানরা নানাভাবে নানা সময়ে প্রকাশ করলেও, আল কুদস দিবসে সবই একযোগে উচ্চারিত হয়। এ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন সমস্যা বিশ্ববাসীর সামনে আসে, মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের একচোখা নীতি নিয়ে ওঠে সমালোচনা ঝড়। সমস্বরে জানান দেওয়া হয়, বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ইহুদিদের কবল থেকে বায়তুল মোকাদ্দাস মুক্তি এবং স্বাধীন সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ।
লেখক : মুফতি ও ইসলামবিষয়ক লেখক
