রাজধানী ঢাকায় ডায়রিয়ার প্রকোপ গত ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে কীভাবে পৌঁছাল, তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে মন্ত্রিসভায়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, ওয়াসার পানির উৎসে ‘জীবাণু না থাকলেও’ বাসাবাড়ির রিজার্ভার এবং ‘বেআইনিভাবে লাইন টানার সময়’ ছিদ্র থেকে ব্যাকটেরিয়া ছড়াচ্ছে। আর কিছু এলাকায় পানিতে ক্লোরিনের মাত্রা কমে যাওয়ায়ও ডায়রিয়া হয়েছে।
এ অবস্থায় বিশুদ্ধ পানি পানের বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পাশাপাশি বহুতল ভবনগুলোর নিচে থাকা রিজার্ভ ট্যাঙ্ক কিছু দিন পরপর পরিষ্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ঢাকার ডায়রিয়া পরিস্থিতি নিয়ে এই অনির্ধারিত আলোচনা হয়। পরে আলোচনার বিষয়টি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, ঢাকায় ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে ডায়রিয়ার এ রকম প্রকোপ দেখা যায়নি। এর অন্যতম কারণ হলো, বড় বড় বহুতলবিশিষ্ট ভবনের বাসিন্দারা ওয়াসার পানির লাইন কেটে নিজেরাই পাম্প বসিয়ে পানি টেনে নিচ্ছেন। এতে ছিদ্র থেকে যাচ্ছে, যেখান দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ঢুকছে। এ ছাড়াও কয়েক জায়গায় পানিতে ক্লোরিনের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, এবারের ডায়রিয়ার প্রকোপের কতগুলো কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। মন্ত্রিসভাতেও বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যাচাই করে দেখা গেছে, ওয়াসা যে পানি দেয়, তার উৎসে কোথাও ব্যাকটেরিয়া নেই।
ঢাকার ধানম-িসহ আরও কিছু পুরনো আবাসিক এলাকায় নতুন করে বহুতল ভবন নির্মাণ হওয়ায় সরবরাহের তুলনায় পানির চাহিদা বেড়ে গেছে; সেসব এলাকায় মানুষ আলাদা লাইন টানতে গিয়ে ‘পানি দূষিত করছে’ বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় এখন হাইরাইজ বিল্ডিং হচ্ছে। তিনতলা ভবন, এখন হয়ে গেছে ১৫ তলা। তাদের আর আগের লাইনের পানিতে চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। এখন ওয়াসার পানির লাইন কেটে নিজেরাই পাম্প বসিয়ে পানি টেনে আনছেন। সেই পানি টানার লাইনে ছিদ্র থেকে যাচ্ছে। সেখান দিয়ে ব্যাকটেরিয়া ঢুকছে। প্রায় সব জায়গায় এটি হচ্ছে। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞরা কয়েক জায়গায় পানি পরীক্ষা করে দেখেছেন ক্লোরিনের পরিমাণ কম। এটাও অন্যতম একটি কারণ। পরে ওয়াসা সেখানে ব্যবস্থা নেওয়ায় কমে গেছে।
ডায়রিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৭৪ লাখ কলেরার টিকা দেবে। কলেরার দুটি টিকা দিলে তিন বছর পর্যন্ত কলেরা বা ডায়রিয়া থেকে নিরাপদ থাকা যায়। আগামী ১০ থেকে ১৫ মে’র মধ্যে টিকা দেওয়া শুরু হবে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আমাদের সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে যারা ওইসব দেশে যাচ্ছে তাদের অনেকের মধ্যে ডায়রিয়ার জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে। গ্রামের পানিতে ব্যাকটেরিয়া নেই। আমাদের টেকনিক্যাল লোকজন যেটা বলছে, সেটা হচ্ছে, যারা বিদেশে যান তারা এয়ারপোর্টের আশেপাশে ছোটখাটো হোটেলে ২-৩ দিন থাকেন। এরই মধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা অপারেশন চালাচ্ছেন। ওয়াসার টিম গিয়ে দেখছে, হোটেলের পানিগুলো কেমন।’
দেশে গত মার্চ থেকে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়তে দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকাতেই ডায়রিয়ার প্রকোপ বেশি। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় ডায়রিয়ার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। গরমের মৌসুমের শুরুতে প্রতিবছরই দেশে কম-বেশি ডায়রিয়া হয়। তবে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে ঢাকায় ডায়রিয়ার ব্যাপক প্রকোপ দেখা দেয়। ওই সময় প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩শ রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকার আইসিডিডিআর,বির কলেরা হাসপাতালে, যা রেকর্ড। মার্চ মাসে দেশে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৭০ হাজার ২৩৭ জন। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই ৩৬ হাজার ৯১২ জন হাসপাতালে গেছেন।
গতকালের বৈঠকে স্বেচ্ছাসেবা নীতিমালা অনুমোদন করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগ ‘জাতীয় স্বেচ্ছাসেবা নীতিমালা-২০২২’ এর খসড়া করে নিয়ে এলেও এ সংক্রান্ত কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের কাছে। এ ছাড়া ‘শেখ হাসিনা পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, জামালপুর আইন, ২০২২’ ও ‘পল্লী উন্নয়ন একাডেমি, রংপুর আইন, ২০২২’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
