তেঁতুলতলা মাঠের অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০২২, ১০:৫০ পিএম

রাজধানীর কলাবাগানে তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষার আন্দোলনে একই সঙ্গে দুটি অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি হলো। একটি নাগরিক অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া, সংগঠিত হওয়ার সামাজিক শক্তির নৈতিক বিজয়। আরেকটি পরিবেশ ও সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষায় সামাজিক আন্দোলনে সৈয়দা রতœা ও তার ছেলে প্রিয়াংসুকে যে হয়রানি ও নিপীড়ন সইতে হয়েছে, তা দেশের মানুষকে বেদনাহত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে তা এই দৃষ্টান্তও তৈরি করেছে যে, বৃহত্তর কল্যাণের জন্য সামাজিক আন্দোলনে শামিল হলে বিজয় আসে। আবার তেঁতুলতলা মাঠে থানাভবন নির্মাণ না করে মাঠটিকে মাঠ হিসেবেই রেখে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ দেশের মানুষকে স্বস্তি দিয়েছে। আন্দোলনকারীরা যথার্থই বলেছেন যে, এই ঘোষণা শিশুদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার। শুধু কলাবাগান নয়, ঢাকার সব এলাকাতেই যেন শিশুদের জন্য খেলার মাঠ পাওয়া যায়, বয়স্কদের হাঁটাচলার জন্য অবকাশের জন্য যাতে খোলা জায়গা পাওয়া যায়Ñসেটাই প্রত্যাশা। আমরা আশা করব, প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের সব মাঠ এবং উন্মুক্ত স্থান রক্ষায় অনুসরণ করা হবে।

তেঁতুলতলা মাঠের নামের মধ্যেই যেন পুরনো দিনের হারিয়ে যাওয়া ঢাকার গন্ধ লেগে আছে। চারপাশ বৃত্তাকারে ঘিরে থাকা পাঁচটি বড় নদী আর শতাধিক খাল নিয়ে রাজধানী ঢাকার প্রাকৃতিক ঐশ^র্য ছিল গর্ব করার মতো। কিন্তু এখন চারপাশের নদীগুলো দখল-দূষণে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। শতাধিক খালের বেশিরভাগই বেদখল হয়ে গেছে। অবশ্য, সাম্প্রতিককালে ঢাকার নদী ও খাল দখলমুক্ত করার যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে তা আশা জাগাচ্ছে যে, নিষ্ঠার সঙ্গে এগিয়ে গেলে ঢাকা আবারও নদী-জলাশয়-গাছপালায় শোভিত একটা স্বাস্থ্যকর মহানগরে পরিণত হতে পারে। এই আশাবাদ জাগিয়ে রাখা জরুরি। এজন্য সামাজিক আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি। কেননা, বর্তমান বাস্তবতায় ঢাকা যে সবুজহীন এক কংক্রিটের মহানগর সেটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। পরিবেশবিদরা মনে করেন, যেকোনো শহরে অন্তত ২৫ শতাংশ সবুজ থাকা বাঞ্ছনীয়। কিন্তু ঢাকা মহানগরে সবুজ অঞ্চলের পরিমাণ পুরনো অংশে মাত্র ৫ শতাংশ এবং নতুন অংশে মাত্র ১২ শতাংশ। খেয়াল করা প্রয়োজন, অনুপাত অনুসারে প্রয়োজনীয় সবুজ এলাকার অভাব কেবল ঢাকা মহানগরেই নয়, সারা দেশেই ক্রমাগত কমছে। এই বাস্তবতা বদলাতে হলে সব স্তরের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও সক্রিয় দায়িত্বপালন জরুরি। একইভাবে প্রতিটি এলাকায় সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি। মাঠ ও খোলা জায়গা কেবল শিশুদের খেলাধুলা আর বয়স্কদের হাঁটাচলার প্রয়োজনই মেটায় না, এমন উন্মুক্ত স্থানগুলো সবুজায়ন এবং পরিবেশের বিবেচনাতেও খুবই প্রয়োজনীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, বিশাল আয়তন ও বিপুল জনসংখ্যার ঢাকা মহানগরীতে প্রয়োজনের তুলনায় মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের বড়ই অভাব। সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা গেল, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মোট ১২৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৪১টি ওয়ার্ডে কোনো খেলার মাঠ নেই। রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) খসড়ায় এই তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবেদনটি থেকে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১০টি ওয়ার্ড এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৩১টি ওয়ার্ড মাঠশূন্য। অন্য ওয়ার্ডগুলোতে খেলার মাঠ থাকলেও সব মাঠ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়।

রাজধানী ঢাকায় মেট্রোরেল হচ্ছে, পাতাল রেল হবে। একসময় নিশ্চয়ই ঢাকা মহানগর বর্তমান যানজটের অচলাবস্থা থেকে মুক্তি পাবে। ঢাকার নাগরিকরা দ্রুতগতির উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুফল ভোগ করবে। কিন্তু খেলার মাঠ ও খোলা জায়গার জন্য জমি পাওয়া নিঃসন্দেহে আরও কঠিন হয়ে পড়বে। ঢাকা মহানগরের জন্য রাজউকের করা ড্যাপের খসড়ায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ১২ হাজার ৫০০ মানুষের জন্য একটি করে খেলার মাঠ প্রয়োজন। ঢাকার দুই সিটিতে প্রায় ১ কোটি ৮৪ লাখ মানুষ বাস করে। সে হিসাবে ঢাকায় মাঠ দরকার ১ হাজার ৪৬৬টি। তাই এখনই ঢাকার সব এলাকায় মাঠ গড়ে তোলা এবং সবুজায়নের দিকে আরও জোর দেওয়া জরুরি। প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি মাঠ গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান সব মাঠ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার বিষয়ে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়র দায়িত্ব নেবেন কি? সিটি করপোরেশন এই দায়িত্ব পালনে আগ্রহী হলে সেটা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব বলে মনে হয় না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত