কক্সবাজারের টেকনাফ পৌর আওয়ামী লীগের দুজন নেতাকে পিটিয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। দলের বর্ধিত সভায় গত শুক্রবার অন্যরা তার বক্তব্যের প্রতিবাদ করলে মঞ্চ থেকে নেমে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বদি নিজেই দুই নেতাকে মারধর করেন। এ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যমও ফলাও করে প্রকাশ করেছে গত ২২ এপ্রিলের ন্যক্কারজনক এ ঘটনা।
এর আগের দিন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শাখা আওয়ামী লীগের শ্যামপুর থানার ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবু মারধর করেন ঢাকা-৪ আসনের সাংগঠনিক টিমের অন্য নেতাদের। থানা শাখার নেতা হলেও দলের অন্য নেতাদের মারধর করে হাবু তার ক্ষমতা ও আধিপত্য জানান দেন। এ নিয়ে মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের নেতাদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন মার খাওয়া নির্যাতিত নেতারা। অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিন রিয়াজ।
তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের এমন বেপরোয়া আচরণের নজির শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়। প্রতিপক্ষহীন রাজনীতির মাঠে প্রায়ই আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে মারামারি-হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছেন। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অস্বস্তিতে রয়েছেন। তাদের কেউ কেউ পরামর্শ দিয়েছেন, স্থানীয় পর্র্যায়ে দলীয় নেতাদের ক্ষমতার বলয় ভেঙে দিয়ে নতুন নেতৃত্বে হাতে দল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হোক।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্রে জানা যায়, লিখিত ও মৌখিক অনেক অভিযোগ কেন্দ্রীয় দপ্তরে স্তূপ হয়ে আছে। ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা-পৌরসভা ও জেলা আওয়ামী লীগের বড় অংশে চলছে ক্ষমতা ও আধিপত্য ধরে রাখার নগ্ন প্রচেষ্টা। আধিপত্যের এ লড়াইয়ে টিকে থাকতে প্রয়োজন পড়লে বেপরোয়া আচরণেও দ্বিধা নেই ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কোনো পর্যায়ের নেতারই। এমন ‘বেপরোয়া বাহিনীর’ বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়ার পরও তাদের লাগাম টানা যাচ্ছে না।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে দলে বেপরোয়া আচরণ করেন এমন নেতাকর্মীর সংখ্যা বেড়েছে। পরিস্থিতির কারণে একসময় তাদের এমন আচরণ সহ্যও করা হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক কার্যক্রম স্থবির হয়েছিল। সংগত কারণে ব্যবস্থা নেওয়া যায়নি। যেসব সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মী বেপরোয়া আচরণ করেছেন ওই দুটি নির্বাচনে, দেখা গেছে তাদের ওপরই আস্থা রাখতে হয়েছে। ক্ষমতাধর হয়ে ওঠা ওই বলয়গুলো মনে করেছে অপরাধ করলেও অনেকেই পার পেয়েছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই যে ওই পরিস্থিতিতে দলের ভেতরে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়।
ওই নেতারা বলেন, পরিস্থিতির কারণে দলে অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তারা দলে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্তও করেছেন। তারাই বেপরোয়া আচরণ করছেন। তাই কেন্দ্রের চেয়েও তৃণমূলে দলের ভাবমূর্তি বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সময় এসেছে বেপরোয়া নেতাদের ছেঁটে ফেলার।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, আচরণগত সমস্যাকে দুরারোগ্য ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত চিকিৎসা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে দলে আলোচনা আছে। তা না হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি জৌলুস ও ঐতিহ্য হারাবে বলে নেতারা মনে করছেন। তিনি বলেন, সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন এলাকার খবর নিতে গিয়ে দেখেছি স্থানীয় রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধিদের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ সুবিধাবঞ্চিত হচ্ছে। অনেক জনপ্রতিনিধি তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এমন অভিযোগও রয়েছে।
আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বলেন, সংসদ সদস্য থেকে তৃণমূল পর্যন্ত যেসব জনপ্রতিনিধি রয়েছেন তাদের ক্ষেত্রে পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছে। নতুনত্ব এলে তাদের ভয়ভীতি থাকে। আচার-আচরণে সৌজন্যতা বজায় থাকে।
এ প্রসঙ্গে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের ভাবমূর্তির প্রশ্নে এখন কোনো আপস চলবে না। যারা বেপরোয়া আচরণ করছেন, দলের শৃঙ্খলা নষ্ট করছেন তাদের দলে প্রয়োজন নেই।’ তিনি বলেন, ‘চলমান সাংগঠনিক কার্যক্রমে এগুলো আমলে নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। যাকে দলের প্রয়োজন নেই, তাকে বাদ দিয়ে কমিটি করা হচ্ছে। আগামী নির্বাচনেও এ ধারা অব্যাহত রাখা হবে।’
আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টানা ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতাকর্মীর আচরণ অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক সারা দেশে যে বলয় তৈরি হয়েছে তারাই মূলত বেপরোয়া আচরণ করছে। ফলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি-উন্নয়ন এ সবকিছু জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। এ জায়গাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করার চেষ্টা চলছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের সভাপতিমণ্ডলীর আরেক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, সারা দেশে রাজনীতি একটি বলয় ও বিত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ফলে ক্ষমতার চর্চাকারী একটি শ্রেণি অরাজনৈতিক আচরণ করছে গ্রামগঞ্জে। তিনি বলেন, যেকোনো পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে বেপরোয়া আচরণ কারা করছে তাদের চিহ্নিত করতে হবে। দেখতে হবে যার হাতে দলীয় পদ ও প্রতীক তুলে দেওয়া হচ্ছে ওই ব্যক্তি সমাজে কতটা গ্রহণযোগ্য। তিনি আরও বলেন, গত তিন মেয়াদে সংসদ নির্বাচনে বেশিরভাগ এলাকায় প্রার্থী বদল হয়নি। নতুন মুখ না আসায় বারবার নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নিজেদের দলের জন্য অপরিহার্য ভেবে বসে আছেন। ফলে তাদের মধ্যে গরিমা কাজ করে। দলীয় রাজনীতির লাভ লোকসান তারা হিসাব করেন না। ওই শ্রেণিও বেপরোয়া আচরণ করে। ওয়ার্ড-ইউনিয়ন-উপজেলা ও পৌরসভায়ও অদক্ষ ও অরাজনৈতিক ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হচ্ছেন। ফলে তারাও নিজেদের দলের জন্য অপরিহার্য মনে করেন। সেজন্য অসৌজন্যমূলক আচরণ বেড়েই চলছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছু কিছু জনপ্রতিনিধির আচার-আচরণে সৌজন্যতা নেই তা সত্যি। তবে সবাই এক নয়। ভালো ব্যবহার করেন এমন অনেকেই আছেন। আচরণ-সৌজন্যতায় জনপ্রিয়তা যেমন বাড়ে আবার কমেও। তাই রাজনীতি যারা করেন তাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।’
