‘স্বামী বেঁচে আছেন কি না জানতে চাই’

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০২২, ০৩:২৮ এএম

‘আমরা সিংহাসন চাই না, শুধু আমার স্বামী বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন তা জানতে চাই। মরে গেলে একটু মিলাদ দেব।’ গতকাল শুক্রবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে মায়ের ডাক সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ আকুতি পল্লবীর নিখোঁজ কাঠ ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেনের স্ত্রী নাসরিন জাহানের।

সংবাদ সম্মেলনে নাসরিন জাহান বলেন, ‘২০১৯ সালে নিখোঁজ হন আমার স্বামী ইসমাইল হোসেন। তিন বছর ধরে আমার স্বামীর সন্ধানে দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। গুম শব্দটা দুই অক্ষরের, কিন্তু যন্ত্রণা দিনের পর দিন। আমার স্বামীর খোঁজ আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি।’ প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে নাসরিন জাহান আরও বলেন, ‘আপনার মানবতার হাত কি আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিতে পারেন না? আমার স্বামী বেঁচে আছেন নাকি মরে গেছেন, আমি একটু মিলাদ দেব, একবার সন্ধান দেন।’

নাসরিন জাহান যখন কথা বলছিলেন, তখন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা চোখের পানি মোছেন।

সংবাদ সম্মেলনে ভোলা থেকে এসেছেন বৃদ্ধ কয়ছর আহাম্মদ গাজী। ১৯ এপ্রিল রাতে তার ছেলে মো. মহাসিনকে রাজধানীর শেওড়াপাড়া থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয় দেওয়া লোকজন তুলে নিয়ে যায়। মহাসিন পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সংবাদ সম্মেলনে তার বাবা কয়ছর আহাম্মদ গাজী বলেন, ‘আমার মহাসিন কই? মহাসিন কী অপরাধ করছে?’ কাঁদতে কাঁদতে শুধু এটুকুই বলেন তিনি।

মহাসিনের স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ‘১০ দিন হয়ে গেছে, কেউ আমার স্বামীর বিষয়ে কোনো তথ্যই দিচ্ছে না। আমি আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করছি সরকারের কাছে।’

২০১৩ সালে বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেনকে কীভাবে চোখে কালো কাপড় বেঁধে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তার বর্ণনা দেন তার মেয়ে রাইসা। সে বলে, ‘আমি কি বাবার সঙ্গে ইফতার করতেও পারব না। ঈদের নামাজ পড়ে এসে বাবা কি আমাদের সঙ্গে খাবে না?’

গুলশান থানা ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি সাইফুর রহমান সজীবের বাবা শফিক বলেন, ‘আমার ছেলে ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গুম হয়। আমার প্রশ্ন, আমার ছেলে চোর, ডাকাত না সন্ত্রাসী? বিএনপি করে, এটাই কি তার অপরাধ?’

বাংলাদেশ সিভিল সোসাইটি ফর মাইগ্রেন্টসের (বিসিএসএম) চেয়ার অধ্যাপক সি আর আবরার বলেন, ‘গুমের কথা স্বীকার না করে ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। জনগণের প্রতি ন্যূনতম সম্মান থাকলে এভাবে কথা বলা যায় না। গুমের বিষয়ে সরকার যদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি করতে পারে, তাহলে দেশের জনগণের কাছে জবাবদিহি করছে না কেন?’

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান বলেন, ‘রাষ্ট্র যখন তার কৌশল হিসেবে গুমকে ব্যবহার করে, তখন এটি বন্ধ করা যায় না, যতক্ষণ না রাষ্ট্র তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে।’

সরকারের কাছে অনুনয় করে, কান্নাকাটি করে স্বজনদের ফিরে পাওয়া যাবে না বলে মন্তব্য করেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, মায়ের ডাকের এই আয়োজন জাতীয় প্রেস ক্লাবে করার জন্য আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু অনুমতি মেলেনি। সংগঠনের সমন্বয়কারী মঞ্জুর হোসেনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিন, মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান, মায়ের ডাকের সমন্বয়কারী আফরোজা ইসলাম প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত