ঢাকা থেকে বাণী জননীর দীন সেবক শ্রীপ্রমোদ মুখার্জি ৩ আগস্ট ১৯৩৫ রবীন্দ্রনাথকে লিখলেন : হে কবি, আপনি কবিগুরু আপনাকে নমস্কার। আপনি বিশ্বের বরেণ্য, আমারও বরেণ্য। আপনাকে বুঝাইতে পারি এমন কোন ভাষা আমার নাই। তবে আমিও একজন বাণী জননীর দীন সেবক। আপনার দয়া ব্যতিরেকে কোন গ্রন্থকারই এদেশে দাঁড়াইতে পারে নাই। আপনার দয়া পাইতে পারি এমন কোন বিশেষ গুণ যে আছে এমন নহে, তবে আমি একজন জিনিয়াস। আমার সমন্ধে বিভিন্ন পত্রিকাতে আলোচনা হইয়াছে। আপনার দয়া ব্যতিরেকে আমার গত্যন্তর নাই। এদেশের লোকেরা এবং বিশেষ করিয়া সম্পাদকমষন্ডলী আমার সমন্ধে একেবারে উদাসীন। এমনকি বুঝাইয়া লিখিলেও কান দিবে না। জিনিয়াস কথাটায় ব্যাপক অর্থ আমার সমন্ধে প্রমাণ ও ইনডিকেশন স্বরূপ শ্রদ্ধেয় মৃণালকান্তি ঘোষ মহাশয়ের নিকট লিখিয়াছি। ইতি বিনয়াবত,/শ্রীপ্রমোদ মুখার্জি/ঢাকা ৩রা আগস্ট ১৯৩৫ রবীন্দ্রনাথ আরও ৬ বছর বেঁচে থাকলেও ঢাকার শ্রীপ্রমোদ মুখার্জির প্রতি সদয় হয়েছেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সম্পাদকমন্ডলী তার প্রতি আগের মতোই উদাসীন রয়ে যান। সাহিত্যে একজন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান ঠেকাতে তিনি নিশ্চুপ থাকেন।
হতভাগা রবীন্দ্রনাথের জামাইভাগ্য নামে একটি নিবন্ধ লিখে আমি একজন বন্ধু হারিয়েছি। আমার বন্ধু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন রবীন্দ্রনাথ কোনো ছেলেখেলার বিষয় নয়, তাকে নিয়ে কোনো লঘুবচন কবিরাহ গোনাহর শামিল। এই লেখাটি বিশুদ্ধ ভক্তদের আরও চটাবে। কিন্তু কী আর করা? এমনিতেই রবীন্দ্রনাথ একটি সিরিয়াস বিষয়। ১৯১৩ সাল থেকে এই বিষয়ের সঙ্গে নোবেল পুরস্কার যুক্ত হওয়ায় সিরিয়াসনেস আরও বেড়েছে। কিন্তু কিছু রসিক রবীন্দ্রভক্তও তো রয়েছেন। তাদের খারিজ করবেন কেমন করে? আর রবীন্দ্রনাথ? তার মতো রসিকজন কেবল বাংলা কেন, অবিভক্ত ভারতবর্ষেই বিরল। বিশ্বভারতীর আর্কাইভে সংরক্ষিত ‘রবীন্দ্রনাথের পাগলা ফাইল’ থেকে অমিতাভ রায় একজন ভক্তের একটি চিঠি উদ্ধার করেছেন। হোক পাগলা ফাইলের চিঠি, তবুও যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। রবীন্দ্রনাথ নোবেল পেয়েছেন, পাননি অনেকেই, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কেমন করে পেলেন? টেকনিকটা কী?
গুরুদেবকে লেখা সেই চিঠি : ‘সবিনয় নিবেদন আমাকে নোবেল প্রাইজ পাওয়ার টেকনিক অতি সত্বর জানান। তাহা হইলে আমি যদি প্রাইজ পাই মোট প্রাপ্য টাকার অধিকাংশ আপনাকে দিব।’
রবীন্দ্রনাথ সাধারণত চিঠিপত্রের জবাব দিতেন এবং সেই জবাবের কপি রেখে দিতেন। কিন্তু এই পত্রলেখক নিশ্চয়ই কোনো জবাব পাননি। তার মানে একেবারে পরিষ্কার : রবীন্দ্রনাথ চাননি এদেশে আরও একজন নোবেল প্রাইজ বিজয়ী মাথাচাড়া দিয়ে উঠুন। কোনো মুনিই তার তপোবনে অন্য কোনো মুনির উপস্থিতি মেনে নিতে চাইবেন না। সে কারণেই প্রাইজমানির অধিকাংশ পেয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাকেও উপেক্ষা করেছেন!
রবীন্দ্রনাথের প্রকাশক ম্যাকমিলান সুইডিশ অ্যাকাডেমির টেলিগ্রাম পেয়ে শান্তিনিকেতনের ঠিকানায় টেলিগ্রাম পাঠিয়েছেন। ক্ষিতিমোহন সেন, নেপাল রায় এবং কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ডাকপিয়নের কাছ থেকে আগেভাগেই খবরটা পেয়ে যান। অধ্যাপকবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীরা খবরটা পরে জানেন। রবীন্দ্রনাথ তখন উত্তরায়ণে পদব্রজে নাকি পায়ে হেঁটে বিচরণ করছিলেন বলে জানা যায়। অধ্যাপক ও শিক্ষার্থী সবাই ছুটেন কবির কাছে, তাদের সঙ্গে ধীরগামী ক্ষিতিমোহন সেনও। তাদের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠের সংবাদটি রবীন্দ্রনাথ শুনলেন। তারপর ক্ষিতিমোহন সেনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ক্ষিতি যখন টলেছে, তখনই বুঝেছি একটা কিছু হয়েছে’ (ক্ষিতি মানে পৃথিবী)।
ক্ষিতি বাবুকে চিনেছেন তো? অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেনের নানা। ক্ষিতি বাবু রবীন্দ্রনাথের যত প্রিয়জনই হোন না কেন এই টেকনিক তিনি তাকেও বলেননি। অমর্ত্য সেন নোবেল পুরস্কার জিতেছেন ভিন্ন টেকনিকে। নানার কাছ থেকে কোনো টিপস পাননি।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর এক মাস কুড়ি দিন আগে ফরিদপুর থেকে শ্রীনিতিশচন্দ্র রায় চৌধুরী কবিকে লিখেছেন : প্রিয়বরেষু, হে বিশ্বপ্রেমিক। মর্ত্যরে অমর কবি, কাব্য নিকুঞ্জের পিকরাজ। চিরনবীন! অন্তরতম বন্ধু আমার, সখা আমার, জাগ্রত দেবতা আমার, ঢেলে দিচ্ছি আমার অন্তরের অমিয়ধারার অর্ঘ্য চরণে তোমার। চোখে দেখিনি কভু তবু ছুটে যায় আকুল আবেগে হিয়া আমার তোমার পানে। চরণ সরিও না অপরিচিত বলে। তোমার গান আমার প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। তোমায় কী মন্ত্রে অর্চনা করব বুঝি না নাথ, ক্ষুণœ হয়ো না বন্ধু আমার। ভাবছন্দহারা তালহারা বন্ধনহারা তোমার মহান প্রেমে আত্মবিস্মৃত হয়েছি, বোধ হারিয়েছি। তুমি আমার ভাষার অতীত। ভাবের অতীত। জ্ঞানের অতীত তুমি যে কী রত্ন জানি না। আমার অর্ঘ্য গ্রহণ করো আশীর্বাদ দাও। অচেনা প্রেমিক তোমার। ইতি শ্রীনীতিশচন্দ্র রায় চৌধুরী, পো: খালিয়াগ্রাম, জেলা-ফরিদপুর। (রবীন্দ্রনাথ এই প্রেমিকের পত্রের জবাব দিয়ে যাওয়ার সময় ও সুযোগ পাননি।)
নোবেল সম্মানের ভূত : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকাশক ম্যাকমিলান সুইডিশ অ্যাকাডেমির ১৪ নভেম্বর ১৯১৩-এর টেলিগ্রামের ওপর ভিত্তি করে কবিকে টেলিগ্রাম পাঠালেন, যে তিনি নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঈর্ষাপরায়ণ বাঙালির দীর্ঘদিনের ঈর্ষার শিকার। নোবেল সে ঈর্ষাকে আরও বাড়িয়ে দিল। নোবেল বাগাতে মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্রের কত খরচ হলো সে গুঞ্জনও কলকাতায় শোনা গেল।
১ অগ্রহায়ণ ১৩২০ (পুরস্কারের খবর জানার দু’দিন পর) রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে লিখলেন : ‘সম্মানের ভূতে আমাকে পাইয়াছে। আমি মনে মনে ওঝা ডাকিতেছি আপনাদের আনন্দে আমি সম্পূর্ণ যোগ দিতে পারিতেছি না। আপনি হয়তো ভাবিবেন এটা আমার অত্যুক্তি হইল। কিন্তু জানেন আমার জীবন কীরূপ ভরাতুর হইয়া উঠিয়াছে।’ ২৩ ডিসেম্বর ১৯১৩ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী রবীন্দ্রনাথকে সংবর্ধনা জানাতে পাঁচ শতাধিক বিশিষ্ট বাঙালি বিশেষ ট্রেন ভাড়া করে ব্যান্ড পার্টি সহযোগে বোলপুর স্টেশনে এসে হাজির হন। সেখান থেকে অধিকাংশই পদব্রজে শান্তিনিকেতন আসেন।
এই আগমন সম্পর্কে শান্তিনিকেতন তথা রবীন্দ্রনাথ অবহিত। অতিথি আপ্যায়নের জন্য ১০০৫টি কমলাসহ বিভিন্ন খাবার জোগাড় করা হয়। জোড়াসাঁকো থেকে ঠাকুরবাড়ির কারিগর এখানে এসে অভ্যাগতদের জন্য মুখরোচক মিঠাই মন্ডা তৈরি করে পরিবেশন করেছেন। নিশ্চয়ই দূরাগত এসব অতিথিনারায়ণ মিষ্টান্ন ও ফল তৃপ্তিসহ খাবেন। সীতাদেবী শুনেছিলেন সংবর্ধনার জবাবে রবীন্দ্রনাথ গান গেয়ে শোনাবেন, ‘এ মণিহার আমায় নাহি সাজে’। কিন্তু কবি সুর ধরলেন না। শান্তিনিকেতনে এই মহতী অনুষ্ঠানে সংবর্ধনার জবাবে কী বলবেন রবীন্দ্রনাথ তাও আগাম তৈরি করে রেখেছিলেন।
সেই সংবর্ধনার জবাব থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি : আজ আমাকে সমস্ত দেশের নামে আপনারা যে সম্মান দিতে এখানে উপস্থিত হয়েছেন তা অসঙ্কোচে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করি এমন সাধ্য আমার নেই।...দেশের লোকের হাত থেকে যে অপযশ ও অপমান আমার ভাগ্যে পৌঁছেছে তার পরিমাণ নিতান্ত অল্প হয়নি এবং এতকাল আমি তা নিঃশব্দে বহন করে এসেছি। এমন সময় কী জন্য যে বিদেশ হতে আমি সম্মান লাভ করলুম তা এখন পর্যন্ত আমি নিজেই ভালো করে উপলব্ধি করতে পারিনি।...আজ ইউরোপ আমাকে সম্মানের বরমাল্য দান করেছে। তার যদি কোনো মূল্যও থাকে তবে সে কেবল সেখানকার গুণীজনের রসবোধের, আমার দেশের সঙ্গে তার কোনো আন্তরিক সমন্ধ নেই। অতএব আজ যখন সমস্ত দেশের জনসাধারণের প্রতিনিধিরূপে আপনারা আমাকে যে সম্মান উপহার দিতে প্রবৃত্ত হয়েছেন তখন সে সম্মান কেমন করে আমি নির্লজ্জভাবে গ্রহণ করব?
এ সম্মান আমি কতদিনই বা রক্ষা করব? আমার আজকের এই দিন চিরদিন থাকবে না, আমার ভাটার বেলা আসবেতখন পঞ্চতলের সমস্ত দৈন্য আবার তা ধাপে ধাপে প্রকাশ হতে থাকবে।... আজ আদর করে সম্মানের যে সুরাপাত্র আমার সম্মুখে ধরেছেন তা আমি ওষ্ঠের কাছ পর্যন্ত ঠেকাব, কিন্তু এ মদিরা আমি অন্তরে গ্রহণ করতে পারব না। এর মত্ততা থেকে আমার চিত্তকে আমি দূরে রাখতে চাই।
কবির ভাষণের সময়ই গুঞ্জন শুরু হয়ে যায়। অভ্যাগতরা ক্ষুব্ধ ও অপমানিত বোধ করে জলযোগ না করেই দ্রুত বোলপুর স্টেশনের দিকে পা বাড়ান।
শেষ পর্যন্ত শান্তিনিকেতনের প্রধান পুরোহিত তার দলবল নিয়ে অতিথিদের খাবার ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে আসেন। সীতাদেবীর যতদূর মনে গড়ে ‘খাদ্যদ্রব্যগুলোর সদ্গতিই হইয়াছিল।’
এমনই খতরনাক জাতি বাঙালি, শেষ পর্যন্ত নোবেল প্রাইজ পাওয়ার টেকনিক আর তিনি কাউকে জানাননি।
(চিঠিগুলো অমিতাভ রায়ের রবিঠাকুরের পাগলা ফাইল থেকে উদ্ধৃত)
লেখক কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক
