অতিরিক্ত ভাড়া ঘাটে ভোগান্তি নিয়ে ফেরা

আপডেট : ০৮ মে ২০২২, ০২:১২ এএম

প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ শেষে কয়েকদিন ধরেই ঢাকা ও আশপাশের কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে মানুষ। ফিরতি যাত্রায় গত বৃহস্পতিবার থেকে ফের ব্যস্ত হয়ে উঠেছে সড়ক, ট্রেন ও নৌপথ। ঈদুল ফিতরের আগে ঈদযাত্রা ছিল অনেকটাই স্বস্তির। ফিরতি যাত্রায় গত শুক্রবার পর্যন্ত বড় ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর পাওয়া যায়নি। তবে, গতকাল শনিবার যাত্রীর চাপ যেমন ছিল তেমনি বিভিন্ন ফেরিঘাটে  ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, ফেরি স্বল্পতা, বাস, স্পিডবোট ও লঞ্চে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের খবর পাওয়া গেছে।

ঈদের ছুটির পর আজ রবিবার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস। সংগত কারণেই ফিরতি যাত্রায় গতকাল বাস, ট্রেন ও লঞ্চে যাত্রীর চাপ একটু বেশি ছিল। গতকাল দুপুরে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও সায়েদাবাদ এলাকায় দেখা যায়, ঈদের আগে ও পরের দুদিনের  চেয়ে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। ঢাকামুখী মানুষের চাপ শুক্রবারের চেয়ে গতকাল বেড়েছে। সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকামুখী বেশিরভাগ বাস ছিল যাত্রীতে প্রায় পূর্ণ। যাত্রীরা নির্বিঘ্নে ঢাকায় ফিরছেন।

ঢাকামুখী মানুষের ভিড় ছিল সদরঘাটেও। শুক্রবার রাত থেকে গতকাল সকাল ১১টা পর্যন্ত দক্ষিণাঞ্চল থেকে সদরঘাট টার্মিনালে ৮১টি লঞ্চ আসে বলে জানান দায়িত্বরত ব্যক্তিরা।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে গতকাল বিভিন্ন ট্রেনে আসা ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ ছিল অন্য দুদিনের চেয়ে কিছুটা বেশি।

রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রী ও যানবাহনের চাপ গতকাল দ্বিগুণ বেড়েছে। ঘাটে দিনভর যাত্রীবাহী বাসের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন শত শত মানুষ।

সরেজমিনে দৌলতদিয়া ঘাট ও এর আশপাশের সড়ক ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলামুখী মানুষ দূরপাল্লার বাস, মাহিন্দ্র, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে ঘাটে এসে ফেরি ও লঞ্চে নদী পার হচ্ছেন। ঘাটের জিরো পয়েন্ট থেকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস ও মালবাহী গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলোকে ১০ থেকে ১৫  ঘণ্টা পর্যন্ত ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেককে পায়ে হেঁটে দৌলতদিয়া ঘাটের উদ্দেশ্যে যেতে দেখা গেছে।

ঘাটে ফেরির অপেক্ষায় থাকা সোহাগ পরিবহনের এক যাত্রী বলেন, ‘দুপুরে খুলনা থেকে রওনা হয়ে রাতে ঘাটে এসে বাসের দীর্ঘ সারিতে আটকা পড়েছেন। ১০ ঘণ্টা পার হলেও ফেরির অপেক্ষা শেষ হয়নি।’

একে ট্রাভেল পরিবহনের এক যাত্রী বলেন, ‘ভোর থেকেই যানজটে আটকা পড়ে আছি, খাবার হোটেল, টয়লেটের ব্যবস্থা না থাকায় নারী ও শিশুদের ভোগান্তি বেশি হচ্ছে।’

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি) ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) কর্মকর্তারা জানান, যাত্রী পারাপারে দুর্ভোগ ও ভোগান্তি কমাতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ২৩টি লঞ্চ ও ২১টি ফেরি চলাচল করছে।

বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) শিহাব উদ্দিন বলেন, ‘শুক্রবার থেকে যানবাহনের চাপ বাড়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে আমরা কাজ করছি।’

দৌলতদিয়া ঘাটে ভোগান্তি হলেও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ঘাটে ঢাকামুখী মানুষের চাপ থাকলেও তেমন দুর্ভোগের খবর পাওয়া যায়নি। মানিকগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক আব্দুল্লাহ আল জুবায়েদ বলেন, গত শুক্রবারের তুলনায় শনিবার দিনভর যাত্রী বেশি ছিল।

বিআইডব্লিউটিসির আরিচা কার্যালয়ের সহকারী ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মহিউদ্দিন রাসেল বলেন, পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় যানজট এড়াতে লোকাল বাস ঘাট এলাকা থেকে এক কিলোমিটার দূরে বাসস্ট্যান্ডে রাখতে হয়েছে। সে কারণে যাত্রীদের পায়ে হেঁটে আসতে হচ্ছে।

মাদারীপুরের বাংলাবাজার ও শরীয়তপুরের মাঝিরকান্দি থেকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া পর্যন্ত নৌপথে ঢাকামুখী মানুষের ঢল দেখা গেছে। এ সুযোগে স্পিডবোটে যাত্রীদের কাছ থেকে ১৫০ টাকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ২০ টাকা পর্যন্ত বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, ১২ জনের জায়গায় ১৬ জন যাত্রী নিয়ে চলছে স্পিডবোটগুলো।

এই দুটি নৌপথে সীমিত ফেরি চলাচলের কারণে ঈদযাত্রায় যেমন দুর্ভোগ ছিল, তেমনি ফিরতি যাত্রায়ও মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ দুটি নৌপথে ১৭টি ফেরি থাকলেও মাত্র ১০টি ফেরি চালু রয়েছে।

দুপুরে তীব্র গরমে যাত্রীরা কিছুটা ভোগান্তিতে পড়েন। সকালে লঞ্চগুলোতে ধারণ ক্ষমতার বেশি যাত্রী বহনের অভিযোগ করেন অনেক যাত্রী।  তবে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন ও শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)  মো. আসাদুজ্জামান তদারকিতে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। অন্যদিকে স্পিডবোট কম থাকায় যাত্রীদের কাছে থেকে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

খুলনা থেকে আসা জয় নামে এক যাত্রী অভিযোগ করে বলেন, স্পিডবোটে ১৫০ টাকার ভাড়া ২০০ টাকা নিচ্ছে। বরিশাল থেকে আসা সুজন নামে আরেক যাত্রী অভিযোগ করেন, তার কাছ থেকে ৩০০ টাকা ভাড়া নেওয়া হয়েছে। ফেরিঘাটের  তিন ও চার নম্বর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য যাত্রী ও যানবাহন পারাপারের অপেক্ষায়। তিন নম্বর ঘাটে দুপুর ২টায় দেখা যায়, প্রায় ২ শতাধিক যানবাহন রাত  থেকে পারাপারের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘাটের ৪ নম্বর ঘাটে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় আটশ মোটরসাইকেল চালক পারাপারের অপেক্ষায় আছেন।

বিআইডব্লিউটিএ’র বাংলাবাজার ঘাটের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আক্তার হোসেন বলেন,  নৌযানে যাত্রীদের প্রচুর চাপ রয়েছে। তবে, ধারণক্ষমতা অনুযায়ী যাত্রীদের লঞ্চে ওঠানো হচ্ছে।

শিমুলিয়া ঘাটেও যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া  গেছে। এসি বাসে ১৫০ টাকার ভাড়া ২০০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। নন-এসি বাসের ভাড়া ৮০ টাকার জায়গায় ১০০-১৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

স্পিডবোট ও লঞ্চ মালিকরা জানান, ফিরতি পথে যাত্রী খুবই কম। তাই পুষিয়ে নিতে একটু বাড়তি ভাড়া নিতে হচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ শিমুলিয়া ঘাটের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. সোলাইমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিমুলিয়া থেকে লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করা হয় না। বাংলাবাজার ও মাঝিরকান্দি ঘাট থেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে এলে আমাদের কিছু করার থাকে না।’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী), লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ), মানিকগঞ্জ ও শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত