দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সহজ হবে না এমনটা ধরে নিয়েই সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত শনিবার দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দেন।
ওই বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ধরেই নিচ্ছে বিএনপি যতই নিরপেক্ষ সরকারের দাবি জানাক, নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় শেষ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের অধীনেই নির্বাচনে আসবে। বর্তমান সংসদে দলটি তিন নম্বর দল হলেও মাঠের রাজনীতিতে বিএনপি যে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ তেমন আভাসও পাওয়া যায় ওই বৈঠকের আলোচনা সূত্রে।
এছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শেখ হাসিনা সরকারের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের ‘মূল্যায়নের’ বিষয়টিও মাথায় রাখছে আওয়ামী লীগ। সে কারণে আগামী জাতীয় নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠন গোছানোর নির্দেশ দিয়েছেন আওয়ামী লীগপ্রধান।
প্রায় দুই বছর পর অনুষ্ঠিত পূর্ণাঙ্গ কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেছেন, সংগঠনকে গুরুত্ব দিতে হবে। সেজন্য ধরে রাখতে হবে সংগঠনের ঐক্য ও শৃঙ্খলা। তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নির্বাচন কঠিন হবে, অংশগ্রহণমূলক হবে।
বৈঠকে উপস্থিত আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা দেশে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট হবে। এবারের নির্বাচনে কাউকে জেতানোর দায়িত্ব আমি নেব না। জিততে হবে নিজের যোগ্যতায়।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত এমপিদের (সংসদ সদস্য) ব্যাপারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে আমাকে এখনো জবাবদিহি করতে হয়।’ দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দেন, ‘জরিপ চলছে। সেখানে যার রিপোর্ট ভালো আসবে তাকেই বেছে নেব আমি।’
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে আরও জানান, বিএনপি নির্বাচনে আসবে এটা ধরেই আওয়ামী লীগকে প্রস্তুতি নিতে বলেছেন দলের সভাপতি। তারা আরও জানান, বৈঠকে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করব। তবে কোনো দলকে নির্বাচনে আনতে বিশেষ কোনো উদ্যোগ-দায়িত্ব সরকার নেবে না।’ অবশ্য তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে সব দলের প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে উদাত্ত আহ্বান থাকবে বলে জানান।
গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র্যাব ও তার কয়েকজনের কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর বিএনপি রাজনীনিতে আগের তুলনায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। দলটি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাবে না বলে শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করে। সম্প্রতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেওয়া জাতীয় সরকারের ধারণা নিয়েও কাজ করছে বিএনপি। তারা জাতীয় সরকারের রূপরেখা তৈরি করে এর ভিত্তিতে বড় নির্বাচনী জোট গড়ার পথে হাঁটছে। বিএনপি মনে করছে, আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যর্থ। এ ব্যর্থতার কারণে জনগণ ক্ষুব্ধ হয়ে মাঠে নামবে। সে ক্ষেত্রে তারা সহায়ক শক্তি হিসেবে মাঠে থাকবে। এর মধ্য দিয়ে সরকারের পতন ঘটবে।
অন্যদিকে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে বেশিরভাগ দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় আওয়ামী লীগ সরকার। সেজন্য আসন ছাড়া, বিকল্প জোট গঠনসহ নানা কৌশল নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে দলটি।
অবশ্য বিএনপিকে নির্বাচনে আনার বিষয়ে গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন ওই দেশের সহযোগিতা চেয়েছেন বলে গণমাধ্যমে খবর আসে। যদিও পরে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন।
আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকেও বিএনপির নির্বাচনে আসা না আসার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে দলটিকে নির্বাচনে আনতে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেবে না বলে আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে আওয়ামী লীগের উদ্যোগ নেওয়ার কী আছে। কোন দল নির্বাচন করবে বা করবে না সে সিদ্ধান্ত কি আওয়ামী লীগ নিতে পারে?’ তবে তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চান সব দলের অংশগ্রহণে এবার নির্বাচন হবে।’
সভাপতিমন্ডলীর আরেক সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো প্রত্যাশা করি বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। আওয়ামী লীগ মনে করে ভেতরে ভেতরে বিএনপি নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে।’ তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সভায় দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা নিজেও বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে আসবে।
জাফরউল্যাহ বলেন, ‘আমরা বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি, এটাই তো উদ্যোগ। এর বাইরে আর কী উদ্যোগ গ্রহণ করব?’
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী ফোরামের ওই বৈঠকে আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেন, পুরো রমজান মাসে ভার্চুয়ালি তারেক রহমান ওয়ার্ড পর্যায়ে পর্যন্ত সভা করেছেন। ৫০টি ‘লবিস্ট ফার্ম’ নিয়োগ দিয়েছে সরকারের বিরুদ্ধে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতে। এগুলো বিএনপির নির্বাচনের প্রস্তুতিরই অংশ।
শেখ হাসিনাকে উদ্ধৃত করে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা আরও জানান, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির বর্তমান অবস্থান মূলত দরকষাকষির। কিন্তু সরকার বিএনপির সঙ্গে দরকষাকষিতে যাবে না। নিজেদের প্রয়োজনে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। এ ক্ষেত্রে বিএনপি বিদেশি সহযোগিতার আশা করছে। বিদেশিদের দিয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়।
ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা একাধিকবার সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে অনুরোধ করেছেন। সেই অনুরোধ একপর্যায়ে চাপও তৈরি করতে পারে। সব বিবেচনায় নিয়েই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে জানিয়ে দিয়েছেন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন কঠিনই হবে।
গতকাল রবিবার সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে সব দল নির্বাচনে আসুক। বিএনপিসহ সব দলকে নিয়েই ভোট করতে চাই। নিশ্চয়তা দিচ্ছি নির্বাচন ফেয়ার হবে। ইভিএমে ভোট হবে, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ থাকবে।’
বিএনপিকে নির্বাচনে আনতে কোনো উদ্যোগ থাকবে কি না এমন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা বলব তাদের নির্বাচনে আসতে। যদিও এটি বলা উচিত নয়। নির্বাচনে আসা তাদের অধিকার, এটা সুযোগের ব্যাপার নয়। বিএনপি অধিকার প্রয়োগ না করলে তাদের অস্তিত্ব সংকট হবে আর সে ধরনের পরিস্থিতি তারা তৈরি করবে না, এটা আমার বিশ্বাস।’
