ঈদে বিভিন্ন পত্রপত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ ছিল। যদিও এখন বেশির ভাগ দৈনিক পত্রিকা অনলাইন সংস্করণ চালু করেছে। সেখানে মোটামুটি হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়। আছে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল। এসব চ্যানেলেও নিয়মিত সংবাদ-আপডেট পাওয়া যায়। এর বাইরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও নিয়মিত খবর পাওয়া যায়। তাতে করে এখন সংবাদপত্র বন্ধ থাকলেও সংবাদের ঘাটতি খুব একটা টের পাওয়া যায় না।
আসলে এখন ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যম খবরের দুনিয়াকে বদলে দিয়েছে। আর শুধু খবর নয়, মতামত প্রদানের পরিসরও অবারিত হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে জন্ম হচ্ছে নন-স্টপ ওপিনিয়ন মেশিনের। এখন যে কোনো বিষয়ে, যে কোনো সময়, যে কোনো স্তরের মানুষ অবিরত মতামত তথা ওপিনিয়ন দিতে পারেন এবং দেনও। সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোর কাছে এটা ব্যবসা বৃদ্ধির সুযোগ। আর ব্যবহারকারীদের কাছে নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা তথা যে কোনো ইস্যুতে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মঞ্চ।
ইন্টারনেট কিংবা অডিও ভিস্যুয়াল আসার আগের যুগে সাধারণত দেখা যেত, মানুষ সকালে সংবাদপত্র পড়ছেন। হয়তো কর্মস্থলে যাওয়ার তাড়নায় সকালে প্রতিটি সংবাদ খুঁটিয়ে পড়া হলো না। তারা রাতে বাড়ি ফিরে আবার সেই সংবাদপত্র পড়তেন অনেক বিস্তারিতভাবে। আজ সকালে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ আগামীকাল সকালে সংবাদপত্রে পড়া হতো। আর তার আগে রেডিও কিংবা টিভির সংবাদে কিছুটা জানা হয়ে যেত। তবে বিস্তারিত এবং পূর্ণাঙ্গ বিবরণের জন্য পরদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হয়েছে। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ওই যে সকালে সংবাদপত্র পাঠ করে সে কাজে বেরিয়ে গেল, তারপর সারা দিন কিন্তু তার আর কোনো নিউজের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ রইল না। সে জানছে না যে, তার ব্যস্ততার ফাঁকে দেশে-বিদেশে কত কিছু ঘটে যাচ্ছে। সেগুলো জানতে পারা যাবে পরদিন সকালে আবার সংবাদপত্রে। সে সারা দিন ধরে ভাবার সময় পেয়েছে সকালে পড়ে আসা সংবাদগুলোকে।
এই চিত্রটি সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। এখন মোবাইল নামক যন্ত্র চলে আসা এবং ইন্টারনেট নামক একটি উচ্চপ্রযুক্তির কারণে মানুষ সব থেকে বেশি যে জিনিসটি বহন করে চলে, যাপন করে চলে এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে যার সঙ্গে, সেটি হলো, নিউজ, সংবাদ বা তথ্য। মোবাইলের স্ক্রিন খুললে নানাবিধ মাধ্যমে সবথেকে সামনে হাজির হয় নিউজ। শুধুই যে নিউজ পোর্টাল, ওয়েবসাইটের নোটিফিকেশন কিংবা সংবাদমাধ্যমের ওয়েব ভার্সন নিউজ বহন করে নিয়ে আসে মোবাইলে তা নয়। লক্ষ করলে দেখা যাবে যে, প্রতিটি মানুষের মধ্যেই একজন করে সাংবাদিক বাস করছে। অর্থাৎ প্রত্যেকেই সংবাদ দিতে আগ্রহী। তাই ফেইসবুক, টুইটার, হোয়াটস অ্যাপের মতো সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিনিয়ত দুটি বিষয়ই মানুষ জানায়। হয় কোনো না কোনো নিউজ অথবা নিজের ওপিনিয়ন।
কোনো বিখ্যাত মানুষের মৃত্যু হলে কিংবা বাংলাদেশ কোনো খেলায় জয়ী হলে দেখা যায়, কমবেশি সবাই সেই দুঃখ ও আনন্দের সংবাদ নিজের ওয়ালে জানাচ্ছেন, শেয়ার করছেন বন্ধুদের। অথচ সেই সংবাদ সবাই কমবেশি জানতে পারবে একটু পর অথবা ইতিমধ্যেই জেনে ফেলেছে। কিন্তু তার মনে হচ্ছে আমাকেও জানাতে হবে। অর্থাৎ আমার কাছে একটি নিউজ পেয়ে অন্যরা যেন বিস্মিত হয়, ক্রুদ্ধ হয়, আনন্দ পায়। মানুষের প্রতিক্রিয়া বা রিয়াকশন তৈরি হোক আমার মাধ্যমে। তাই পাড়ায়, শহরে, দেশে, বিদেশে কী কী ঘটেছে সেটার অবিরাম ধারাবিবরণী সোশ্যাল মিডিয়ায় দেওয়া হয়। এর অন্যতম সুবিধাজনক দিক হলো, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অন্তহীন নিউজ পাওয়া যায় কোনো আর্থিক ব্যয় না করে। ফেইসবুক গোটা বিশ্বের সবথেকে বড় মিডিয়া কোম্পানি, যাদের নিজেদের কোনো ক্রিয়েশন নেই। অর্থাৎ ফেইসবুক অন্য কোম্পানির তৈরি করা নিউজ শেয়ার করার সুযোগ করে দেয় ইউজারদের। গুগলও তা-ই। নিজের কথা অন্যকে জানানোর এই তাড়না অনুমান করে ২০০৬ সালের পর থেকে ফেইসবুক একের পর এক নতুন ফিচার যুক্ত করে। লাইক, ট্যাগিং ফিচার এবং শেয়ার। দ্রুত ফেইসবুকের মার্কেট শেয়ার প্রভূত বৃদ্ধি পায়।
রাজনীতিক থেকে সাধারণ মানুষ, সবাই নিউজ সংগ্রহ করেন মিডিয়া থেকেই। সেই নিউজ শেয়ার করেন এবং নিজেকে ব্যস্ত রাখেন আলাপ-আলোচনা-আড্ডায়। কিন্তু পাশাপাশি আবার মিডিয়াকেই সবথেকে বেশি সমালোচনা করেন তারা। কেন করেন? কারণ, তার মনের মতো পছন্দসই সংবাদ সেখানে পাওয়া যায়নি অথবা বিপরীত কোনো অভিমত পাওয়া গিয়েছে, তখন তার কাছে সেই মিডিয়া খারাপ হয়। সেটা সোমবার হতে পারে। আবার বুধবার হয়তো সেই মিডিয়াতেই তার পছন্দমতো এবং মনের অবস্থানের সঙ্গে মানানসই একটি সংবাদ পাওয়া গেল। তখন আবার সেই সংবাদটি তিনি শেয়ার করেন। সেদিন সেই মিডিয়া তার কাছে হয়ে উঠছে বিশ্বাসযোগ্য। অর্থাৎ মিডিয়ার প্রতি ক্ষোভ অথবা ভালোবাসা নয়। তার কাছে মাপকাঠি হলো, আমার মন যা চায়, আমার রাজনৈতিক অবস্থান যা দাবি করে এবং আমি যাতে সন্তুষ্ট হই, সেরকম সংবাদ কোথায় পাওয়া যাবে! এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রবণতা। কিন্তু দেখা যায়, বাংলা সংবাদপত্রগুলোতে অসংখ্য সাধারণ জীবনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সংবাদ থাকে। বাসস্ট্যান্ডে শেড নেই, নদীভাঙন, সয়াবিন তেলের আকাশছোঁয়া দাম, কোনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিষেবা বন্ধ দীর্ঘদিন ধরে, রাজধানীতে খেলার মাঠ দখল, রাস্তার বেহাল দশা, বিভিন্ন অফিসের দুর্নীতি ইত্যাদি নানাবিধ সংবাদ থাকে মিডিয়ায়। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় এই নিউজগুলো নিয়ে চর্চা কম হয়। গুরুত্ব কম দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, বিভিন্ন-বিচিত্র বিষয়ে মতামত বা অভিমত প্রদানের প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়। দ্রুত ওপিনিয়ন দেওয়ার বিপদ কী? বিপদ হলো, বিচারবুদ্ধি ব্যবহার না করে কিছু একটা বলে দেওয়া এবং তারপর সেটি ভুল প্রতিপন্ন হওয়া। যেমন গত বছরের শুরুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রাখার বিরুদ্ধে বহু মানুষ গর্জে উঠেছিলেন। অনেকে বলেছিলেন যে, এটা একটা শিক্ষার বিরুদ্ধে চক্রান্ত। এরপর সংক্রমণ আকাশছোঁয়া হয়ে গেল, তখন স্কুল খোলার পক্ষের যুক্তিগুলো আর দেখা যায়নি। আসলে যেকোনো মত বা ওপিনিয়ন দেওয়ার আগে থট প্রসেসের বিশ্লেষণ দরকার, কেন এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে? যে কাজে সমালোচনা করার দরকার, সেটা তো অবশ্যই করা উচিত। কিন্তু কোনটায় করব, কোনটায় করব না, দুটিতেই আগে দরকার ভাবার! ভাবা কমে যাচ্ছে। ওপিনিয়ন বেড়ে যাচ্ছে!
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক সমস্যা যেমন সামনে চলে আসছে, আবার অনেক কিছু দ্রুত হারিয়েও যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খোলার পর এখন গত দুই বছরের লেখাপড়ার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য করণীয়র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তেমন কোনো মত বা আলোচনা চোখে পড়ছে না। দেশে করোনাকালে দেশে জীবিকা হারানোর সংখ্যা বিপুল। গত তিন বছরে অন্তত ১৬ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছে। এই লোকগুলো দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। বিকল্প পেশায় তাদের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি। পুরনো পেশাতেও তারা ফিরতে পারেনি। এর মধ্যে কর্মক্ষেত্রে অনেক নতুন মানুষ যোগ হয়েছে। কিন্তু পুরনো অনেকেই কাজ হারিয়ে বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে কষ্টেসৃষ্টে বেঁচে আছে। প্রতিটি গ্রামে, পাড়া-মহল্লায় এমন মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশে সবথেকে বেশি চাহিদা যে চাকরির অর্থাৎ নিয়ম করে প্রতি মাসে বেতন আসবে, এরকম জীবিকা আমাদের দেশে করানাকালে বিপুলভাবে কমে গিয়েছে। যাকে পরিভাষায় বলা হয় স্যালারিড জব। এই চাকরি ২০১৯ সালে আমাদের দেশে যা ছিল, ২০২২ সালে তার অন্তত ৩ শতাংশ কমেছে। অথচ এ নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই।
করোনাকালে জীবিকা হারানোর পাশাপাশি বিপুলভাবে বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম। শুধু তেলের দামই তো প্রায় ৭২ শতাংশ বেড়েছে। বেড়েছে চাল-ডাল-আটা-তেল-মাংস এবং ওষুধের দাম। ওষুধের দামও গত তিন বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির প্রতিটি সংবাদ তো মিডিয়া মারফত পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু কতটা আন্দোলিত করছে আমাদের?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কতটা চর্চার বিষয় হয়ে উঠছে আমাদের বেঁচে থাকার অনিবার্য উপাদানগুলো নিয়ে? যদি আমরা চর্চা না করি, যদি আমাদের প্রতিদিনের ওপিনিয়ন প্রদান উৎসবে এই ইস্যুগুলো উপস্থিত না হয়, তাহলে কাদের লাভ? লাভ ক্ষমতাসীনদের, রাষ্ট্রের! তাদের আমরা আর কত সুবিধা করে দেব?
লেখক লেখক ও কলামনিস্ট
