রপ্তানিতে উল্লম্ফন

১০ মাসেই পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ

আপডেট : ১০ মে ২০২২, ১২:৩১ এএম

রপ্তানি আয়ে নতুন মাইলফলক অর্জন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের জন্য রপ্তানি আয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা অর্থবছরের ১০ মাসেই (জুলাই-এপ্রিল) পূরণ হয়ে গেছে। মহামারী করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় নিয়ে যে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা দূর করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে প্রধান খাতে বড় অঙ্কের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের দশ মাসে দেশের রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৪ কোটি ৪৩ লাখ ডলার। আর পুরো অর্থবছরের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার।

মূলত তৈরি পোশাকের রপ্তানিতে বড় প্রবৃদ্ধির কারণে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই আয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয়েছে। চলতি অর্থবছরের দশ মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৩৬ শতাংশ। দেশের রপ্তানি আয়ের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক থেকে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে এবার রপ্তানি আয় ৫২ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে রপ্তানি বাণিজ্যে ইতিহাস সৃষ্টি করবে বাংলাদেশ।

গতকাল প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের এপ্রিলে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৪৭৩ কোটি ৮৭ লাখ ডলার আয় হয়েছে, যা আগের বছরের এপ্রিলের চেয়ে ৫১ দশমিক ১৮ শতাংশ বেশি। এই মাসে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি এসেছে ৪০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। এপ্রিল মাসে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ধরা ছিল ৩৩৬ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

আর অর্থবছরের ১০ মাসে রপ্তানি আয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৩৪ কোটি ৪৩ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে যে রপ্তানি আয় হয়েছে, তা গত অর্থবছরের পুরো সময়ের চেয়েও ১২ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় বেশি এসেছে ২০ দশমিক ৫২ শতাংশ। জুলাই-এপ্রিল সময়ে রপ্তানির লক্ষ্য ছিল ৩ হাজার ৫৯৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

একক মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এপ্রিল মাসের এই আয় চতুর্থ সর্বোচ্চ। সবচেয়ে বেশি এসেছিল গত ডিসেম্বরে, ৪৯০ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয় এসেছিল চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে ৪৮৫ কোটি ৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার। ফেব্রুয়ারিতে আয় কিছুটা কমে ৪২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলারে নামলেও মার্চে ৪৭৬ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।

বিশ্বে করোনার প্রভাব কমতে থাকার মধ্যেই ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ শুরু হয়। এর সাময়িক প্রভাবে ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি আয় কিছুটা কমে যায়। যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ববাণিজ্যে পড়ে। এতে শঙ্কা তৈরি হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিশ্ব কিছুটা অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় দেশের রপ্তানি আয়ে উল্লম্ফন অব্যাহত থাকে। যদিও যুদ্ধ নিয়ে খুবই চিন্তিত রপ্তানিকারকরা। কারণ এর প্রভাবে সব কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যে তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অবশ্য এখন পর্যন্ত রপ্তানি আয় বিশেষ করে তৈরি পোশাকের প্রচুর ক্রয়াদেশ রয়েছে বাংলাদেশের। যদিও রাশিয়ায় রপ্তানি ক্ষতির মুখে পড়েছে। 

ইপিবি প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে শুধু তৈরি পোশাক নয়, পাট ছাড়া অন্যসব খাতের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৫৩৬ কোটি ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই খাত থেকে আয় বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের দশ মাসে সবচেয়ে বেশি আয় এসেছে নিট পোশাক থেকে, ১ হাজার ৯২৪ কোটি ২৬ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের জন্য নিট পোশাক থেকে ১ হাজার ৯৫১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার প্রায় ৯৯ শতাংশ ১০ মাসেই এসেছে। এ সময়ে ওভেন গার্মেন্টস থেকে ১ হাজার ৬১২ কোটি ডলার রপ্তানি আয় হয়, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩ শতাংশ বেশি। এ খাতে পুরো অর্থবছরের জন্য রপ্তানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৫৬২ কোটি ৯০ লাখ ডলার।

চলতি অর্থবছরের ১০ মাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় হয়েছে হোম টেক্সটাইল খাত থেকে, ১৩৩ কোটি ১৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৯ শতাংশ বেশি। হোম টেক্সটাইলের রপ্তানিতে পুরো অর্থবছরের জন্য যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তা ১০ মাসে ৯৭ শতাংশ পূরণ হয়েছে। এ সময়ে রপ্তানি আয়ের তৃতীয় সর্বোচ্চ আয় এসেছে কৃষি থেকে, ১০৪ কোটি ১৪ লাখ ডলার। এটি পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৪ শতাংশ।

দশ মাসে বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় এসেছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে। এ সময় এ খাত থেকে ১০১ কোটি ১৭ লাখ ডলারের আয় হয়েছে, যা পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ শতাংশ। আলোচিত সময়ে হিমায়িত মাছ রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৬ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। ওষুধ রপ্তানি থেকে এসেছে ১৬ কোটি ৩৮ লাখ ডলার।

দশ মাসে রপ্তানি আয়ে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বিশেষায়িত টেক্সটাইলে। এই খাতের রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২৭ কোটি ৭১ লাখ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ১৪৫ শতাংশ বেশি এবং চলতি পুরো অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। এ সময় বাইসাইকেল থেকে ১৪ কোটি ডলার, ক্যাপ বা টুপি থেকে ৩০ কোটি ডলার, আসবাবপত্র থেকে ৪৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার ও প্লাস্টিক পণ্য থেকে ১২ কোটি ৮৮ লাখ ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ। একমাত্র পাট খাতে রপ্তানি আয় ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমেছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কম এসেছে ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ।

গত ২০২০-২১ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানি থেকে ৩৮ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার আয় করে বাংলাদেশ, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৬৭ কোটি (৩৩.৬৭ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৭ শতাংশ কম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত